জরাসন্ধ বধ ও রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প: পাণ্ডবদের জয়যাত্রায় নতুন অধ্যায়
ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় তখন এক মায়াবী স্তব্ধতা। দেবর্ষি নারদ বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলো যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে এক অস্থির আলোড়ন তৈরি করে দিয়ে গেছে। নারদ বলে গেছেন রাজসূয় যজ্ঞের কথা—যে যজ্ঞ কেবল ক্ষমতার আস্ফালন নয়, বরং আর্যাবর্তে ধর্ম ও শান্তি স্থাপনের এক সুকঠিন ব্রত।
যুধিষ্ঠির স্বভাবতই ধীরস্থির, হঠকারিতা তাঁর রক্তে নেই। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি ডাকলেন এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে উপস্থিত চার অনুজ—ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব—আর সঙ্গে কয়েকজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও পুরোহিত।
যুধিষ্ঠির মৃদুম্বরে বললেন, "দেবর্ষি নারদের প্রস্তাবটি তোমরা শুনেছ। কিন্তু রাজসূয় তো সাধারণ কোনো উৎসব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অসীম শক্তি, বিপুল অর্থ আর সমস্ত রাজন্যবর্গের অকুণ্ঠ সমর্থন। তোমাদের মন কী বলে?"
মন্ত্রীরা একবাক্যে সমর্থন জানালেন। প্রজারা সুখী, রাজকোষ পূর্ণ, আর যুধিষ্ঠিরের ন্যায়বিচারে রাজ্য ধন্য—এই যজ্ঞ করার যোগ্যতা তাঁর চেয়ে বেশি আর কার আছে? ভীম নিজের বিশাল বাহুতে একবার চাপড় মেরে গর্জে উঠলেন, "দাদা, দ্বিধা কিসের? ভারতবর্ষের রাজারা আপনার সার্বভৌমত্ব মেনে নিক, এটাই তো স্বাভাবিক।" অর্জুন স্মিতহেসে যোগ করলেন, "আমাদের পাশে যখন কৃষ্ণ আছেন, তখন অসম্ভব বলে কিছু নেই।"
কিন্তু যুধিষ্ঠির তবুও গম্ভীর। তিনি জানেন, এই যজ্ঞের আসল চাবিকাঠি যাঁর হাতে, তিনি তখন দ্বারকায়। তিনি বললেন, "সবার মত শিরোধার্য, কিন্তু মাধবের পরামর্শ ছাড়া আমি এক পা-ও এগোব না।"
বার্তা গেল দ্বারকায়। কয়েক দিন পরই শঙ্খধ্বনি আর পুষ্পবৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে প্রবেশ করলেন কৃষ্ণ। রাজকীয় আতিথ্য আর বিশ্রামের পর বসলো নিভৃত সভা। যুধিষ্ঠির সসম্মানে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মাধব, রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প আমার মনে জেগেছে। কিন্তু তোমার সম্মতি ছাড়া আমি কোনো কাজে হাত দিতে পারি না। তুমি কী বলো?"
কৃষ্ণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, "ধর্মপুত্র, তোমার এই সংকল্প মহৎ। কিন্তু তোমার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মগধরাজ জরাসন্ধ। সে অজেয়, সে ক্রূর। সে অসংখ্য রাজাকে বন্দি করে রেখেছে গিরিব্রজপুরে, এক নৃশংস যজ্ঞে তাঁদের বলি দেবে বলে। জরাসন্ধ জীবিত থাকতে আর্যাবর্তে শান্তি বা একাধিপত্য—দুটোই অসম্ভব।"
কৃষ্ণ বলতে লাগলেন তাঁদের পুরোনো শত্রুতার ইতিহাস। কংসবধের পর তাঁর দুই বিধবা পত্নী—জরাসন্ধের কন্যা অস্তি ও প্রাপ্তির কান্নায় মগধরাজ উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। সতেরো বার তিনি মথুরা আক্রমণ করেছেন। প্রতিবার বলরাম ও কৃষ্ণ তাঁর বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করলেও জরাসন্ধকে সম্পূর্ণ বিনাশ করা সম্ভব হয়নি। শেষে যদুবংশীয়দের প্রাণ বাঁচাতে কৃষ্ণ তাঁদের নিয়ে পাড়ি জমান নিরাপদ দ্বারকায়।
ভীম হেসে উঠলেন, "আর জরাসন্ধ ভাবে আপনি ভয়ে পালিয়েছেন!"
কৃষ্ণ একটু হাসলেন, সে হাসিতে গূঢ় রহস্য। তিনি বললেন, "সময় এসেছে ভীম। জরাসন্ধের প্রবল প্রতাপী দুই বন্ধু হংস ও ডিম্বক এখন মৃত। কংসও নেই। এখন জরাসন্ধকে একা করার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাকে হারানো অসম্ভব। গিরিব্রজ পাঁচ পাহাড় দিয়ে ঘেরা দুর্ভেদ্য দুর্গ। আমাদের অন্য পথে হাঁটতে হবে।"
অর্জুন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কী সেই পথ?"
কৃষ্ণের চোখে ঝিলিক খেলে গেল। "জরাসন্ধ ক্ষত্রিয় দর্পে অন্ধ, কিন্তু সে অতিথি বৎসল। আমরা তিনজন—ভীম, অর্জুন আর আমি—ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মগধে যাব। তাকে দ্বৈরথ যুদ্ধের আহ্বান জানাব। সে কখনও প্রত্যাখ্যান করবে না।"
পরিকল্পনা স্থির হলো। তিন বীর যাত্রা করলেন মগধের পথে। পাহাড়-নদী পেরিয়ে তাঁরা যখন গিরিব্রজপুরে পৌঁছলেন, জরাসন্ধ তাঁদের সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ালো না এই তিন 'ব্রাহ্মণে'র প্রশস্ত স্কন্ধ আর ধনুকের ছিলা ঘষা শক্ত হাতের কবজি।
জরাসন্ধ সরাসরি প্রশ্ন করলেন, "তোমরা সত্য পরিচয় দাও। তোমাদের তেজ তো সাধারণ ব্রাহ্মণের নয়।"
কৃষ্ণ তখন মৃদু হেসে আত্মপ্রকাশ করলেন। জরাসন্ধের অট্টহাসিতে রাজসভা কেঁপে উঠল। তিনি উপহাস করে বললেন, "কৃষ্ণ? যে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিল? তার সঙ্গে আমি লড়ব না। অর্জুন তো শিশু। হ্যাঁ, এই ভীম আমার উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।"
শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মল্লযুদ্ধ। তেরো দিন তেরো রাত ধরে চলল হাড়কাঁপানো লড়াই। কখনও ভীম জরাসন্ধকে শূন্যে তুলে আছাড় মারছেন, কখনও জরাসন্ধের প্রবল মুষ্টির আঘাতে ভীম টলমল করছেন। কিন্তু জরাসন্ধ যেন অপরাজেয়। শরীরের রক্ত ঝরছে, হাঁপিয়ে উঠছেন দুজনেই, কিন্তু মগধরাজকে শেষ করা যাচ্ছে না।
চতুর্দশ দিনে ভীম ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে কৃষ্ণের দিকে চাইলেন। কৃষ্ণ এক টুকরো তৃণ হাতে নিলেন। ভীমের চোখের সামনে তিনি তৃণটিকে মাঝখান থেকে চিরে দু-দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
ভীম এক লহমায় সংকেত বুঝে গেলেন। জরাসন্ধের জন্ম হয়েছিল দুই পৃথক মাংসপিণ্ড হিসেবে, যা জরা নাম্নী এক রাক্ষসী জুড়ে দিয়েছিল। তাই তাকে মারতে হলে দেহকে দ্বিখণ্ডিত করে বিপরীত দিকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে। ভীম হুঙ্কার দিয়ে জরাসন্ধকে জাপটে ধরলেন। তারপর অলৌকিক শক্তিতে তাঁর দেহ মাঝখান থেকে চিরে ফেলে দিলেন দুই বিপরীতে।
জরাসন্ধের অবসান হলো। গিরিব্রজের কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন অসংখ্য রাজা। চোখের জলে তাঁরা কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের কৃতজ্ঞতা জানালেন। জরাসন্ধের ধর্মভীরু পুত্র সহদেবকে মগধের সিংহাসনে বসিয়ে কৃষ্ণ শান্তির বার্তা দিলেন।
মুক্ত রাজারা তাঁদের অঢেল সম্পদ আর সমর্থন উজাড় করে দিলেন যুধিষ্ঠিরকে। জরাসন্ধের সেই দিব্য রথ 'সৌন্দর্যবান'-এ চড়ে বিজয়ী বীররা যখন ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরলেন, তখন সেই নগরী উৎসবের আলোয় ঝলমল করছে। যুধিষ্ঠির পরম মমতায় দুই ভাইকে আলিঙ্গন করলেন। রাজসূয় যজ্ঞের পথ এখন কণ্টকমুক্ত।
কৃষ্ণ কিছুকাল থেকে বিদায় নিলেন দ্বারকার উদ্দেশ্যে। যাবার আগে কুন্তী, দ্রৌপদী ও পাণ্ডবদের আশীর্বাদ নিয়ে গেলেন। জরাসন্ধের পতনে সারা ভারত বুঝে গেল, ধর্মের শাসন আসছে। পাণ্ডবদের গৌরব আকাশে ছড়িয়ে পড়ল, আর যুধিষ্ঠিরের ন্যায়নিষ্ঠ শাসনে প্রজারা নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

Comments
Post a Comment