রাজসূয় যজ্ঞ: যেদিন ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে উঠেছিল স্বর্গের অমরাবতী
রাজসূয় যজ্ঞ: যেদিন ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে উঠেছিল স্বর্গের অমরাবতী
রাজসূয় যজ্ঞ
দ্বিগ্বিজয় করতে বেরোলেন পাণ্ডবরা।
ভীম গেছেন পূর্বে, অর্জুন উত্তরে, নকুল পশ্চিমে, সহদেব দক্ষিণে — পৃথিবীর চার প্রান্ত থেকে পরাজিত রাজারা মাথা নত করেছেন যুধিষ্ঠিরের সামনে। ভারতবর্ষের বুকে এমন দিন আগে আসেনি। দূরদূরান্তের রাজারা যাঁরা কখনও কারও অধীনতা স্বীকার করেননি, তাঁরাও ইন্দ্রপ্রস্থের মহারাজের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছেন। শান্তি নেমে এসেছে সমগ্র ভূখণ্ডে — গভীর, স্থির, নিশ্চিন্ত শান্তি।
এই সময়ে ইন্দ্রপ্রস্থকে দেখলে মনে হত যেন স্বর্গের অমরাবতী মাটিতে নেমে এসেছে।
যুধিষ্ঠিরের রাজত্বে কেউ কাউকে ঠকাত না। পথে পথে চোরডাকাতের ভয় ছিল না। দুর্বলকে কেউ পীড়ন করত না। বর্ষা আসত ঠিক সময়ে, ফসল উঠত মাঠে মাঠে, নদীরা বয়ে যেত নিজের গতিতে। বণিকরা দূরদেশে যাতায়াত করতেন নিশ্চিন্তে। প্রজারা কর দিতেন ভয়ে নয়, ভালোবাসায় — যেভাবে সন্তান বাবার হাতে কিছু তুলে দেয়।
এই সুখের দিনগুলোতেই একদিন খবর এল — দ্বারকা থেকে কৃষ্ণ আসছেন।
ব্যস, আর পায় কে। সারা শহর যেন জেগে উঠল এক মুহূর্তে। রাস্তায় সুগন্ধি জল ছিটানো হল, ফুল দিয়ে সাজানো হল পথ, সোনার তোরণে উড়তে লাগল রঙিন পতাকা। শঙ্খ বাজল, ঢাক বাজল। নগরের মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল রাস্তায় — শুধু একটু দেখবে বলে, মায়াদানবের তৈরি সেই অদ্ভুত সভাগৃহে কৃষ্ণ প্রবেশ করছেন সেই দৃশ্যটুকু চোখে ভরে নেবে বলে।
যুধিষ্ঠির সংবাদ পেয়ে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব — পাঁচ ভাই মিলে স্বয়ং এগিয়ে গেলেন অভ্যর্থনা করতে। কৃষ্ণকে প্রণাম করলেন গভীর ভক্তিতে, আলিঙ্গন করলেন উষ্ণ মমতায়, তারপর সম্মানের সঙ্গে প্রাসাদে নিয়ে এলেন।
কৃষ্ণ বিশ্রাম নিলে যুধিষ্ঠির এলেন তাঁর কাছে, হাত জোড় করে।
বললেন — "মাধব, তোমার কৃপায় আমাদের রাজ্য সমৃদ্ধ, পৃথিবীর রাজারা আমাদের বন্ধু। কিন্তু আমি ক্ষমতা চাই না, যশ চাই না। আমি চাই রাজসূয় যজ্ঞ করতে — যাতে পৃথিবীতে ধর্ম বাড়ে, মানুষের মধ্যে শান্তি আসে। তোমার অনুমতি ছাড়া এই পবিত্র কাজে হাত দিতে আমার সাহস নেই।"
কৃষ্ণ তাকালেন ধর্মপুত্রের দিকে। সেই চোখে ভালোবাসা, সেই মুখে মৃদু হাসি।
বললেন — "রাজন, রাজসূয় যজ্ঞের অধিকার তোমার আছে। রাজ্য জয় করোনি শুধু — মানুষের হৃদয় জয় করেছ সত্য দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে, ধর্ম দিয়ে। ভাইদের বলে আর ভাগ্যের সহায়তায় তুমি আজ ভারতের সম্রাট। সময় এসেছে। এই যজ্ঞে তোমার পূর্বপুরুষরা সম্মানিত হবেন, প্রজারা সুখী হবেন, বংশের গৌরব অমর হবে।"
যুধিষ্ঠিরের বুকের ভেতর যেন কী একটা হালকা হয়ে গেল।
বললেন — "তুমি পাশে থাকলে যজ্ঞ সম্পন্ন হবেই।"
এরপর ইন্দ্রপ্রস্থ জুড়ে শুরু হল প্রস্তুতির তোড়জোড়। দূত ছুটল চারদিকে। পুরোহিতরা ডুবে গেলেন শাস্ত্রগ্রন্থে। কারিগররা রাত জেগে কাজ করতে লাগলেন। রাজপুরোহিত ধৌম্য সকলকে বিধিমতো নির্দেশ দিলেন। সহদেব সামলালেন গোটা আয়োজন — এত বড় দায়িত্ব, অথচ তাঁর মুখে একটুও অস্থিরতা নেই।
বেদের নিয়ম মেনে তৈরি হল বিশাল যজ্ঞভূমি। মাপজোক করে উঠল পবিত্র বেদি। সোনার পাত্র, শস্যের স্তূপ, ঘি, চন্দন, সুগন্ধি, দামি বস্ত্র, মণিরত্ন — সব জমা হতে লাগল একে একে। অতিথিদের সেবার জন্য নিযুক্ত হলেন হাজার হাজার পরিচারক।
একদিন যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন সহদেবকে — সব ঠিকঠাক হয়েছে তো?
সহদেব মাথা নত করে বললেন — "মহারাজ, ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতদের নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।"
ধীরে ধীরে পুণ্যনগরী ভরে উঠল ঋষি আর সন্ন্যাসীদের ভিড়ে। স্বয়ং কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস এলেন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের নিয়ে। যজ্ঞের মাঠ দেখলে মনে হত যেন পৃথিবীর এক কোণে স্বর্গ নেমে বসেছে — পবিত্র অগ্নি জ্বলছে, বেদমন্ত্র ভাসছে হাওয়ায়, তপস্বীদের তেজে চারপাশ আলোকিত।
কৃষ্ণ নিজে যজ্ঞের ভার নিলেন। তাঁর শান্ত পরিচালনায় শুভ মুহূর্তে শুরু হল পবিত্র অনুষ্ঠান।
এদিকে নকুলকে পাঠানো হল হস্তিনাপুর ও অন্যান্য রাজ্যে নিমন্ত্রণ করতে। ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধন, পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ, অশ্বত্থামা, কৃপ, বিদুর — সকলকে যথোচিত সম্মানে আমন্ত্রণ জানানো হল। দূরদূরান্তের রাজারাও নিমন্ত্রণ পেলেন।
তাঁরা এলেন। রথ এল, হাতি এল, ঘোড়া এল, সৈন্যদল এল। ইন্দ্রপ্রস্থের রাস্তা ভরে গেল মালা আর পতাকায়, রত্ন আর দীপালোকে। এই ভিড়ের মধ্যে যুধিষ্ঠির নিজে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রতিটি অতিথিকে আপন হাতে অভ্যর্থনা জানাতে — বয়স, মর্যাদা আর আত্মীয়তা বুঝে যথাযোগ্য সম্মান দিলেন প্রত্যেককে। রাজাদের জন্য প্রাসাদ, ঋষিদের জন্য আশ্রম, যোদ্ধাদের জন্য কক্ষ — আগে থেকেই সব প্রস্তুত ছিল। পরিচারকরা দিনরাত সেবায় নিয়োজিত।
ভীষ্ম মুগ্ধ হলেন যুধিষ্ঠিরের বিনয় দেখে। দ্রোণ অবাক হলেন এই সুশৃঙ্খল সমৃদ্ধ রাজ্য দেখে। আর বিদুর? তিনি কিছু বললেন না, শুধু ভেতরে ভেতরে প্রশান্তি অনুভব করলেন — পাণ্ডুর পুত্রেরা ধর্মের পথে আছে।
দায়িত্ব ভাগ হল সকলের মধ্যে। দুর্যোধনকে দেওয়া হল অতিথিদের আহার ও আপ্যায়নের ভার। অশ্বত্থামা দেখবেন ব্রাহ্মণদের। সঞ্জয় সামলাবেন রাজাদের সেবা। কৃপাচার্যের হাতে রইল রত্নভাণ্ডার ও উপঢৌকনের তদারকি।
আর কৃষ্ণ?
যিনি স্বয়ং জগতের পূজনীয়, যাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েন দেবতারাও — তিনি নিজে নিলেন যজ্ঞে আসা ব্রাহ্মণদের পা ধোয়ার কাজ।
এই দৃশ্য দেখে রাজারা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মহত্ত্ব কাকে বলে, সেদিন তাঁরা বুঝলেন।
দিনের পর দিন উপহার বইতে লাগল ইন্দ্রপ্রস্থে। সমুদ্রের মুক্তো এল, দক্ষিণের চন্দনকাঠ এল, গন্ধার থেকে এল সুদর্শন ঘোড়া, পূর্বের রাজ্য থেকে এল মহাকায় হাতি, পাহাড়ের দেশ থেকে এল দুর্লভ রত্নপাথর। হাজার হাজার ব্রাহ্মণ প্রতিদিন সেরা খাবার পেলেন। সোনা, গরু, অলঙ্কার, বস্ত্র বিতরণ হল দরিদ্র আর জ্ঞানীদের মধ্যে।
যজ্ঞভূমিতে বেদমন্ত্র ভাসছে, শঙ্খধ্বনি উঠছে, বাদ্য বাজছে — সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।
এই অভূতপূর্ব মহাসমাবেশের কেন্দ্রে ছিলেন যুধিষ্ঠির — শান্ত, নিরহঙ্কার, ধর্মের পথে অবিচল। ভারতের সম্রাট হয়েছেন, কিন্তু মুখে গর্বের লেশমাত্র নেই। নিজেকে ভাবতেন শুধু ধর্মের সেবক, প্রজার রক্ষক।
কৃষ্ণের আশীর্বাদে, মুনি-ঋষি আর বয়োজ্যেষ্ঠদের শুভকামনায় ইন্দ্রপ্রস্থে শুরু হল যুধিষ্ঠিরের সেই মহাযজ্ঞ — যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর কখনও হয়নি, হয়তো হবেও না।

Comments
Post a Comment