দ্যুতি ও দ্যুত: পাণ্ডবদের সর্বস্বান্ত হওয়ার আখ্যান
দ্যুতি ও দ্যুত: পাণ্ডবদের সর্বস্বান্ত হওয়ার আখ্যান
তোরণ স্ফটিকের সেই মহাসভা যখন মণি-মাণিক্যের আলোয় এবং বিচিত্র কারুকার্যে সেজেগুজে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলো, তখন কৌরবদের অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পরমহীতৈষী বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বিদুরকে ডেকে পাঠালেন।
ধৃতরাষ্ট্রের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত, চপল উত্তেজনা। তিনি বললেন, "বিদুর, তুমি অবিলম্বে ইন্দ্রপ্রস্থে যাও। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর অনুজদের সপরিবারে এখানে আসার আমন্ত্রণ জানাও। তাদের বলো, হস্তিনাপুরে আমি এক পরম রমণীয়, সর্বসুখদায়ক সভা নির্মাণ করেছি। তারা আসুক, কিছুদিন আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করুক, আর দুই পক্ষে মিলে একটু পাশা খেলার আমোদ প্রমোদ করা যাক।"
Ne ws
বিদুর তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অশুভ আশঙ্কায় মুচড়ে উঠল। যখন তিনি কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর এবং সংযত—যেমনটা তিনি গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বরাবর বলে থাকেন।
"মহারাজ," বিদুর বললেন, "এই পাশা খেলার আয়োজনের মধ্যে আমি কুরুবংশের বিন্দুমাত্র কল্যাণ দেখতে পাচ্ছি না। দুই ভাইয়ের দলের এই দ্যুতক্রীড়া আসলে এক পরম তিক্ততার বীজ রোপণ করবে, যা পরবর্তীকালে কেউ আর উপড়ে ফেলতে পারবে না। কিন্তু আপনি আমার রাজা, আমার জ্যেষ্ঠ। আপনার আদেশ শিরোধার্য। আপনি যখন জেদ ধরেছেন, আমি যাব।"
বিদুর রথে চড়ে ইন্দ্রপ্রস্থের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভাইয়েরা বিদুরকে তাঁদের চিরকালীন শ্রদ্ধা ও উষ্ণতায় বরণ করে নিলেন। কুশল বিনিময়ের পর বিদুর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ধৃতরাষ্ট্রের বার্তা পৌঁছে দিলেন।
বার্তাটুকু শুনে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তাঁর আয়ত চোখে একটা বিষণ্ন ছায়া পড়ল। তিনি বললেন, "কাকামশাই, পাশা খেলা তো আসলে এক প্রকার জুয়া। আর এই জুয়া মানুষের মনে যে কী তীব্র বিদ্বেষ আর তিক্ততার জন্ম দেয়, তা কারোর অজানা নয়। এই খেলার প্রতি আমার কোনো অনুরাগ নেই। কিন্তু জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র আমাদের গুরুজন, আমাদের সম্রাট। তাঁর আমন্ত্রণ একজন রাজপুত্রের পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা অধর্ম। আমরা আগামীকাল সকালেই হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব।"
পরদিন প্রত্যুষে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই পাণ্ডবরা যাত্রা শুরু করলেন। যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই, রাজমাতা কুন্তী, দ্রৌপদী এবং তাঁদের অনুগামী দলবল রাজকীয় সমারোহে হস্তিনাপুরে এসে পৌঁছালেন। কৌরবরা বাইরে অত্যন্ত উল্লাস ও আনন্দের ভান করে তাঁদের স্বাগত জানাল। ধৃতরাষ্ট্র তাঁদের থাকার জন্য রত্নখচিত এক সুরম্য প্রাসাদ ছেড়ে দিলেন। দ্রৌপদী এবং অন্যান্য নারীদের অন্তপুরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেই প্রথম সন্ধ্যাটি বেশ মনোরমই কেটেছিল—পরিবারের পুনর্মিলনের এক সহজ আতিথেয়তা ও সৌজন্যের আবহে। যদিও সেই আপাত উষ্ণতার আড়ালে দুই পক্ষের কেউই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না।
পরদিন সকালে, নিত্যদিনের আহ্নিক ও পূজানুষ্ঠান শেষ করে ধৃতরাষ্ট্র নতুন সভাগৃহে প্রবেশ করলেন। সমবেত অতিথিরা সমস্বরে তাঁর জয়ধ্বনি করে উঠলেন। তার কিছুক্ষণ পরেই পাণ্ডবরা সভায় এসে নিজেদের আসন গ্রহণ করলেন এবং উপস্থিত সকলের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলেন। চারদিকের রত্নখচিত স্তম্ভ আর স্ফটিকের দেওয়াল থেকে আলো ঠিকরে পড়ছিল। ক্ষণিকের জন্য মনে হচ্ছিল, এ যেন কোনো ষড়যন্ত্রের মঞ্চ নয়, বরং পরমাত্মীয়দের এক আনন্দমেলা।
ঠিক তখনই শকুনি একটু ঝুঁকে বসলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে কুটিল, পিছল এক হাসি। তিনি মসৃণ গলায় বললেন, "ধর্মরাজ, এই সভাগৃহ তো আপনারই আগমনের অপেক্ষায় ছিল। তা হলে পাশা খেলাটা শুরু করা যাক?"
যুধিষ্ঠির শকুনির দিকে স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
"শকুনি মামা," যুধিষ্ঠির বললেন, "পাশা খেলা মানেই তো অধর্মের দুয়ার খুলে দেওয়া। এ খেলা মানুষের বিবেককে গ্রাস করে, জন্ম দেয় চিরস্থায়ী শত্রুতার। কোনো সৎ মানুষ এই জুয়া খেলার মাধ্যমে নিজের শৌর্য বা যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন না। ধার্মিকেরা এই খেলাকে কখনো সমর্থন করেন না। তবে আপনি কেন এত অধীর হয়ে আমাদের এমন একটা খেলায় টানছেন, যার মধ্যে কোনো গৌরব নেই? ছলনা করে যা জয় করা হয়, তা তো প্রকৃত জয় নয়।"
শকুনি মৃদু হাসলেন, যেন যুধিষ্ঠিরের সরলতায় তিনি বেশ আমোদ পেয়েছেন।
"যুধিষ্ঠির, রাজনীতি আর যুদ্ধক্ষেত্রে বলবান রাজারা তো সব সময়ই কৌশল করে দুর্বলদের পরাস্ত করেন। চতুরতাও তো একটা অস্ত্র। যে পাশা খেলায় দক্ষ, সে তো তার দক্ষতার প্রয়োগ করবেই। একে অন্য যেকোনো প্রতিযোগিতার মতোই ভাবুন না কেন! আপনাকে আহ্বান করা হয়েছে। এখন বলুন, আপনি খেলবেন, নাকি পিছিয়ে যাবেন?"
যুধিষ্ঠির একবার সভাগৃহের চারদিকে চোখ বোলালেন। পিতামহ ভীষ্ম নিস্পৃহ, স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন; দ্রোণাচার্য আর কৃপাচার্যের মুখাবয়ব অত্যন্ত নিরপেক্ষ, যেন সেখানে কোনো ভাবান্তর নেই। উপস্থিত অন্যান্য রাজন্যবর্গ উৎসুক, তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে।
যুধিষ্ঠির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বেশ, তাই হোক। বলুন, কার বিরুদ্ধে আমাকে লড়তে হবে এবং বাজি কী? খেলা শুরু হোক।"
দুর্যোধন চটপট বলে উঠলেন, "পণ যা রাখার, তা আমিই রাখব। কিন্তু আমার হয়ে পাশার ঘুঁটি ছুঁড়বেন আমার মামা শকুনি।"
খেলা শুরু হলো। একপাশে বসে আছেন যুধিষ্ঠির—একাকী, নিঃসঙ্গ, একজন সরল মানুষের সৎ বিশ্বাস নিয়ে, যিনি কোনোদিন কপটতার আশ্রয় নেননি। আর অন্যপাশে বসে আছেন শকুনি, যাঁর আঙুলগুলো পাশার ঘুঁটিগুলোকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ওই ঘুঁটিগুলোর ভাগ্য ইতিমধ্যেই তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দী।
যুধিষ্ঠির আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রথম চাল দিলেন। রাজসূয় যজ্ঞের সময় সমুদ্রের অতল থেকে পাওয়া তাঁর পরম মূল্যবান, রত্নখচিত অলঙ্কারটি তিনি বাজি রাখলেন।
দুর্যোধন হাত নাড়িয়ে উচ্ছিলের মতো বললেন, "আমার ধনরত্ন আর বৈভবের কোনো শেষ নেই। সেসবের তালিকা দিয়ে অহংকার করতে চাই না। আপনি আগে এই চালটা জিতুন, তারপর দেখা যাবে।"
শকুনি পাশার ঘুঁটি দুটো হাতে নিয়ে ঝাঁকালেন, তারপর বোর্ডের ওপর ছুঁড়ে দিলেন। ঘুঁটি পড়তে না পড়তেই তিনি চড়া গলায় বললেন, "এই জিতলাম!"—আমি জিতে গেছি।
যুধিষ্ঠির বিচলিত হলেন না। তিনি পণ আরও বাড়ালেন। এবার বাজি রাখলেন এক লক্ষ আঠারো হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং বিপুল পরিমাণ সোনা। শকুনি আবার ঘুঁটি চাললেন। আবারও জয়ী হলেন শকুনি।
এবার যুধিষ্ঠির তাঁর রাজকোষ থেকে চারশোটি লোহা ও তামার সিন্দুক বাজি রাখলেন, যার প্রতিটিতে পাঁচ দ্রোণ পরিমাণ সোনা ছিল। শকুনি ঘুঁটি ছুঁড়লেন। আবারও কৌরবদের জয়।
খেলা এক ভয়ঙ্কর, অদম্য গতিতে এগিয়ে চলল। যুধিষ্ঠির যতবারই এক একটি মূল্যবান পণ ঘোষণা করছিলেন, শকুনি ততবারই নির্বিকার চিত্তে, অত্যন্ত ধীরেসুস্থে ঘুঁটি তুলছিলেন, মুখে সেই একই সংক্ষিপ্ত শব্দ—"এই জিতলাম!"। পুরো সভাগৃহ নিথর, নিস্তব্ধ। শুধু মাঝে মাঝে বোর্ডের ওপর কাঠের ঘুঁটি পড়ার খটখট শব্দ আর দর্শকদের রুদ্ধশ্বাস নড়াচড়ার খসখস আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
বিদুর নিজের আসনে বসে এই দৃশ্য দেখছিলেন। প্রতি পালের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখের রেখাগুলো শক্ত হয়ে উঠছিল। অবশেষে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের দিকে ফিরলেন। তিনি জানতেন, তাঁর এই সত্য ভাষণ এই মুহূর্তে রাজার কানে বিষের মতো লাগবে, তাও তিনি বলতে বাধ্য হলেন।
"মহারাজ," বিদুর বললেন, "মুহূর্ষু রোগী যেমন তিতকুটে ওষুধের স্বাদ সহ্য করতে না পেরে তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের চেনা রোগটাকেই আঁকড়ে ধরে থাকে, আপনিও আমার কথা ঠিক সেইভাবেই নেবেন, আমি জানি। তাও হাত জোড় করে বলছি, আমার কথাটা একবার শুনুন।"
ধৃতরাষ্ট্র কোনো উত্তর দিলেন না। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ মনে করে বিদুর বলতে লাগলেন।
"দুর্যোধন যখন জন্মেছিল, তখন সে গাধার মতো ডাক ছেড়ে কেঁদেছিল। আমি তখনই সতর্ক করেছিলাম যে, এই সন্তান একদিন কুরুবংশের ধ্বংস ডেকে আনবে। ও আপনার ছত্রছায়ায় বড় হয়েছে, আপনি চোখের সামনে ওকে বড় হতে দেখেছেন, অথচ ওর ভেতরের আসল রূপটা আপনি চিনতে পারলেন না। একজন মদ্যপ ব্যক্তি যখন আকণ্ঠ মদ গিলে মাতাল হয়ে যায়, সে তখন বুঝতে পারে না সে শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে নাকি কোনো চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। দুর্যোধন এখন অন্ধ—ঈর্ষা আর প্রতিহিংসার মদ খেয়ে ও মাতাল হয়ে গেছে। পাণ্ডবদের সঙ্গে এই শত্রুতার মূল্য ও নিজেকে এবং আমাদের সবাইকে কীভাবে চকাতে হবে, তা ও দেখতে পাচ্ছে না।"
বিদুর একটু থামলেন, তাঁর কথাগুলো সভার বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলতে লাগল।
"একদা ভোজবংশের এক রাজা নিজের প্রজাদের কল্যাণের স্বার্থে নিজের দুর্মতি পুত্রকে ত্যাগ করেছিলেন। আর স্বয়ং যাদবরা যখন অত্যাচারী কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তখন তারা কংসকে পরিত্যাগ করেছিল। অবশেষে কৃষ্ণ যখন কংসকে বধ করলেন, তখন সমগ্র সমাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। মহারাজ, আপনি অর্জুনকে আদেশ করুন এই দুর্যোধনের ঔদ্ধত্য দমন করতে। দুর্যোধনকে যদি এই পাপের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবেই কুরুবংশ টিকে থাকবে, সমৃদ্ধ হবে। কাক আর গাধার মোহে সিংহ আর ময়ূরকে অবহেলা করবেন না। শাস্ত্রে তো স্পষ্টই বলা আছে—কুলের স্বার্থে একজনকে ত্যাগ করো; গ্রামের স্বার্থে একটি কুলকে ত্যাগ করো; দেশের স্বার্থে একটি গ্রামকে ত্যাগ করো; আর আত্মার স্বার্থে সমগ্র পৃথিবীকেও ত্যাগ করা যায়।"
বিদুর এবার নিজের কণ্ঠস্বর কিছুটা চড়ালেন, যাতে সভায় উপস্থিত প্রতিটি মানুষ তাঁর কথা স্পষ্ট শুনতে পায়।
"মহর্ষি শুক্রাচার্য এই পরম সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন এবং দানব জম্ভকে পরিত্যাগ করার সময় তিনি একটি গল্প বলেছিলেন। সেই গল্পটি আপনাদের শোনাই।"
সমগ্র সভাগৃহ তখন পিনপতন নীরব।
"এক গভীর অরণ্যে," বিদুর বলতে লাগলেন, "এক আশ্চর্য পাখির ঝাঁক বাস করত। তারা কোনো সাধারণ পাখি ছিল না—প্রতিদিন নিয়ম করে তারা একটি করে খাঁটি সোনার ডিম পাড়ত। সেই দেশের রাজা যখন এই পাখিদের কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি প্রতিদিন একটা একটা করে সোনার ডিম সংগ্রহ করে পরম শান্তিতে দিন কাটাতে লাগলেন। অল্প দিনেই তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা হয়ে উঠলেন।
"কিন্তু মানুষের লোভ তো কোনো সীমারেখা মানে না। রাজার মনে একদিন এক কুটিল চিন্তা এল—তিনি ভাবলেন, প্রতিদিন একটা একটা করে ডিমের জন্য অপেক্ষা করার কী দরকার? এই পাখিদের পেটের ভেতর তো নিশ্চয়ই অফুরন্ত সোনা ঠাসা আছে। আজ রাতেই যদি এদের সবাইকে মেরে ফেলি, তবে সব সোনা আমি একবারে পেয়ে যাব। এদের ভবিষ্যৎ জীবনের সব ডিম এক রাতেই আমার হয়ে যাবে।
"লোভে অন্ধ হয়ে রাজা সেই রাতেই তাঁর অনুচরদের নিয়ে বনে গেলেন এবং পাখিরা যখন গাছের ডালে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল, তখন তাদের প্রত্যেককে নির্মমভাবে হত্যা করলেন।
"পরদিন সকালে যখন তিনি সোনা খুঁজতে গেলেন, দেখলেন—কিচ্ছু নেই! পাখি তো পাখিই, তাদের পেটের ভেতর কোনো সোনার খনি ছিল না। একটা ডিমও অবশিষ্ট রইল না। যে পাখিরা আগামী দিনে, বছরের পর বছর সোনা দিয়ে রাজাকে পৃথিবীর সেরা ধনী করে রাখতে পারত, এক রাতের অধৈর্য আর লোভে রাজা তাদের চিরতরে শেষ করে দিলেন।"
বিদুর সভার নীরবতাকে আরও একটু ঘনীভূত হতে দিলেন, তারপর সরাসরি ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে বললেন:
"মহারাজ, আপনিও আজ এই সভায় ঠিক একই কাজ করছেন। পাণ্ডবরা হলো আপনার সেই সোনার ডিম দেওয়া পাখি। একবারে সব গিলে ফেলার লোভে ওদের ধ্বংস করবেন না। একজন মালী যখন বাগানের পরিচর্যা করে, সে ফলের লোভে গাছটাকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে না—সে জল দেয়, যত্ন করে এবং সময়মতো গাছের ফল ভোগ করে। পাণ্ডবদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখুন। ওদের সমৃদ্ধি মানেই তো আপনার সমৃদ্ধি। কিন্তু ওদের ধ্বংস করলে, আপনি নিজেকেও সপরিবারে ধ্বংস করবেন।
"খুব স্পষ্ট করে শুনে রাখুন—পাঁচ পাণ্ডব যদি একসাথে অস্ত্র ধরে দাঁড়ায়, তবে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রও ওদের পরাস্ত করতে পারবেন না। এই পাশা খেলার আসর কোনো গৌরবের জায়গা নয় মহারাজ, এ হলো এক মহাশ্মশানের প্রবেশদ্বার। দুর্যোধন চোখ খুলে নিজের বিনাশের দিকে হেঁটে যাচ্ছে এবং সাথে পুরো কুরুবংশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতীপ, শান্তনু, বাহ্লীকের এই পবিত্র বংশ এই পাশার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড় যেমন অন্ধের মতো দেওয়ালের দিকে তেড়ে গিয়ে নিজের শিং দুটোই ভেঙে ফেলে, দুর্যোধন নিজের এবং আমাদের সবার ঠিক সেই সর্বনাশের পথটাই তৈরি করছে।"
বিদুর শেষবারের মতো ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন।
"এই খেলা শুরু হওয়ার আগে আপনি তো কোনো দরিদ্র মানুষ ছিলেন না, মহারাজ। আপনার সম্পদ ছিল, মর্যাদা ছিল, পৃথিবীর সমস্ত রাজার সম্মান ছিল আপনার চরণে। তবে কেন যুধিষ্ঠিরের ঘরের সম্পদের ওপর আপনার এত লোভ? আর আজ যদি আপনারা ওর সব কেড়েও নেন—তাতে আপনাদের প্রকৃত কী লাভ হবে? শকুনিকে বলুন গন্ধারে ফিরে যেতে, যেখান থেকে ও এসেছে। পাণ্ডবদের নিজের সন্তান বলে বুকে টেনে নিন। যা ওদের, তা তো সময়ের নিয়মে আপনারই।"
দুর্যোধন এতক্ষণ ধরে অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে বিদুরের কথা শুনছিলেন। এবার তিনি তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেন।
"তোমার সমস্যাটা কী, বিদুর?" দুর্যোধন চিৎকার করে উঠলেন, "তুমি কোনো সুযোগই হাতছাড়া করো না আমাদের শত্রুদের দালালি করার আর নিজের অন্নদাতাকে অপমান করার! যে নুন খাচ্ছ, তার গুণ না গেয়ে এভাবে নিজের বংশের বিরুদ্ধে কথা বলতে তোমার লজ্জা করে না?"
বিদুর আর একটি কথাও বললেন না। তাঁর যা বলার, তিনি সম্পূর্ণ এবং নিঃসংকোচে বলে দিয়েছেন। সভাগৃহের প্রত্যেকে তা শুনেছে। কিন্তু নিয়তির লিখন বোধহয় এমনই ছিল—পাশা খেলা বন্ধ হলো না।
এরপর যা ঘটল তা অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্মম। যুধিষ্ঠির যেন এক তীব্র চোরাস্রোতের টানে ভেসে গেলেন, যা প্রতিহত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তিনি নকুলকে বাজি রাখলেন এবং হারলেন। সহদেবকে বাজি রাখলেন, হারলেন। অর্জুনকে বাজি রাখলেন, হারলেন। মহাবলী ভীমকেও বাজি রেখে শকুনি মামার চাতুরীর কাছে হেরে গেলেন। প্রতিবারই শকুনি একই শান্ত, কুটিল ভঙ্গিতে ঘুঁটি চাললেন, আর মুখে বললেন—"এই জিতলাম!"।
এবং সবশেষে, নিজের ভাইদের হারানোর পর, যুধিষ্ঠির নিজেকেই বাজি রাখলেন। এবং তাও হারলেন।
সমগ্র সভাগৃহ তখন এক শ্মশানের স্তব্ধতায় ডুবে গেছে।
দুর্যোধনের কণ্ঠস্বর এবার শোনা গেল—তাতে কোনো চিৎকার ছিল না, ছিল এক ধরণের ক্রূর, মসৃণ অহংকার।
"ধর্মরাজ, আপনি তো আপনার সর্বস্ব হেরে গেছেন। আপনার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই—শুধু একটি রত্ন ছাড়া। আপনার কাছে এখনও যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী আছেন। একমাত্র তিনিই এখনও আপনার বন্ধনমুক্ত। তাঁকে বাজি রাখুন, আর আসুন—শেষ একটা চাল হয়ে যাক।"
যুধিষ্ঠির দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কোনো কথা তাঁর মুখ থেকে বেরোচ্ছিল না। সভার নীরবতা তখন যেন এক পাথরের মতো ভারী।
"দ্রৌপদী..." যুধিষ্ঠির অত্যন্ত মৃদু, ভগ্ন কণ্ঠে বললেন, "ও তো শুধু স্ত্রী নয়, ও পরম সাধ্বী। আমাদের সবার আগে ও জেগে ওঠে, আর সবার শেষে ও ঘুমাতে যায়। সভার পরিচারক থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ আহার করেছে কিনা, তা নিশ্চিত না করে ও মুখে অন্ন তোলে না। এমন রমণী কোনো পাশার বোর্ডের ঘুঁটি বা অলঙ্কার হওয়ার যোগ্য নয়। কিন্তু... যেহেতু আপনি আমাকে বাধ্য করছেন, আমি দ্রৌপদীকে বাজি রাখলাম।"
সভাজুড়ে একটা অস্ফুট গুঞ্জন আছড়ে পড়ল—তাতে কোনো উল্লাস ছিল না, প্রতিবাদও ছিল না; ছিল এক গভীর, গ্লানিময় অস্বস্তি। মানুষ যখন চোখের সামনে একটা চরম অধর্ম হতে দেখেও কাপরুষের মতো নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন মনের ভেতর যে গ্লানি জন্মায়—এ ছিল ঠিক তাই। পিতামহ ভীষ্ম শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দ্রোণাচার্য মাটির দিকে চেয়ে রইলেন। কৃপাচার্য পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে রইলেন।
শকুনি পরম তৃপ্তিতে পাশার ঘুঁটি দুটো হাতে তুলে নিলেন। বাতাসে ঘুঁটি দুটো ঝনঝন করে উঠল। তিনি বোর্ডে ছুঁড়ে দিলেন।
"এই জিতলাম!"—শকুনি হাসলেন।
দ্রৌপদী তখন কৌরবদের দাসী। পাণ্ডবরা তাঁদের সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত।

Comments
Post a Comment