ইন্দ্রপ্রস্থের বিদায়বেলা রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হয়েছে।
ইন্দ্রপ্রস্থের বিদায়বেলা রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হয়েছে।
যজ্ঞশেষে অবভৃথ স্নান সেরে যুধিষ্ঠির যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর অবয়বে এক অলৌকিক প্রশান্তি। রাজসিক আড়ম্বর নয়, বরং এক গভীর শুদ্ধতা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। এই মুহূর্ত থেকে তিনি কেবল পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ নন, তিনি আর্যাবর্তের অধীশ্বর, ধর্মরাজ।
ভারতবর্ষের প্রান্ত থেকে প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রাজন্যবর্গ একে একে বিদায় নিতে এলেন। গত কদিন তাঁরা ইন্দ্রপ্রস্থের যে আতিথেয়তা পেয়েছেন, যে মায়া আর সম্মানে জারিত হয়েছেন, তা আগে কখনো ঘটেনি। তাঁদের রথ প্রস্তুত, অশ্বেরা অধীর, অনুচরেরা যাত্রার অপেক্ষায়। যুধিষ্ঠিরের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা একস্বরে বললেন, “হে ধর্মরাজ, আপনার এই মহাযজ্ঞে উপস্থিত থাকতে পেরে আমরা ধন্য। অজমীঢ় বংশের গৌরব আপনি অমলিন করলেন। আপনার ভ্রাতাদের সেবা আর বিনয় আমাদের মুগ্ধ করেছে। আতিথেয়তায় তিলমাত্র ত্রুটি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এবার আমাদের নিজ নিজ রাজ্যে ফেরার অনুমতি দিন।”
যুধিষ্ঠির শান্ত চোখে তাঁদের কথা শুনলেন। প্রতিটি শব্দের ওজন অনুভব করলেন তিনি। তারপর ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেবকে ডেকে বললেন, “ভাইসব, অতিথিদের যোগ্য সম্মানে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসো। ইন্দ্রপ্রস্থের আতিথেয়তা যেন পথের শেষ ধুলোবালি পর্যন্ত অটুট থাকে।” পাণ্ডবরা নতশিরে সেই আজ্ঞা পালন করলেন। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপথ তখন হস্তী, অশ্ব আর রথযাত্রীদের ভিড়ে মুখর। ধুলোর চাদর উড়িয়ে একে একে বিদায় নিলেন রাজারা।
সবাই যখন চলে গেছেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ এলেন যুধিষ্ঠিরের সামনে। তাঁর মুখে সেই চিরচেনা হাসি—যার গভীরতা মাপা যায় না। সেই হাসির আড়ালে লুকানো বিষাদটুকু যুধিষ্ঠির পড়তে পারলেন। কৃষ্ণ মৃদুস্বরে বললেন, “যুধিষ্ঠির, তোমার মহৎ উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। যজ্ঞ সুসম্পন্ন, জগত তোমাকে সম্রাট হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। এবার আমার ফেরার পালা। আমাকে দ্বারকায় যাওয়ার অনুমতি দাও।”
যুধিষ্ঠির ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে রইলেন। মনের গহীনে এক গভীর শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি আবেগহীন কণ্ঠে বললেন, “কৃষ্ণ, তুমি ছাড়া কি এই যজ্ঞ সম্ভব হতো? এই যে ঐশ্বর্য, এই যে রাজ্যভার—সবই তো তোমার দান। তোমাকে আটকে রাখার অধিকার আমার নেই, কিন্তু এটুকু জেনে রেখো, এই সিংহাসন আমার যতখানি, তোমারও ঠিক ততখানিই।”
কৃষ্ণ ম্লান হাসলেন। তারপর গেলেন পিসিমা কুন্তীর কাছে। কুন্তী—যিনি সারাটা জীবন দুঃখের কন্টকাকীর্ণ পথ হেঁটেছেন, আজ তাঁর সন্তানদের এই সুদিন দেখে দুচোখে তৃপ্তি। কৃষ্ণ তাঁর পায়ে হাত দিয়ে বললেন, “পিসিমা, তোমার পুত্র এখন বিশ্বসম্রাট। সমস্ত রত্নভাণ্ডার এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। এবার আমায় আশীর্বাদ করো, আমি দ্বারকায় ফিরি।” কুন্তী তাঁর প্রিয় ভাগ্নেটির মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর মনে হলো, এই ছেলেটি কেবল আত্মীয় নয়, সে এক পরম আশ্রয়।
দ্রৌপদী এবং সুভদ্রার কাছ থেকেও বিদায় নিলেন কৃষ্ণ। বাইরে রথ প্রস্তুত। সারথি দারুক অতি যত্নে রথ সাজিয়েছেন। শ্বেতশুভ্র অশ্বেরা যেন মেঘের টুকরো। রথে ওঠার আগে কৃষ্ণ একবার প্রথামতো রথটিকে প্রদক্ষিণ করলেন। তারপর ধীর পায়ে উঠে বসলেন আসনে।
পাণ্ডবরা তখনো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণ তাঁদের দিকে শেষবারের মতো হাত তুললেন—এক নিভৃত আশিস। দারুক চাবুক হাঁকালেন। রথের চাকা ঘুরল পশ্চিমের দিকে। সূর্যের তেরছা আলোয় রথের চূড়াটি ক্রমশ ছোট হতে হতে একসময় দিগন্তের ধুলোয় মিশে গেল।
যজ্ঞের আগুন নিভেছে অনেক আগে। শঙ্খধ্বনিও আর শোনা যাচ্ছে না। উৎসব শেষে ইন্দ্রপ্রস্থে এখন বিকেলের নিঝুম স্তব্ধতা। পৃথিবীর সম্রাট পাঁচ ভাই সেই জনশূন্য পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কৃষ্ণ চলে গেছেন, কিন্তু ফেলে রেখে গেছেন এক বিপুল দায়িত্ব আর এক অজানা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।

Comments
Post a Comment