কুরুসভার অন্ধকার: দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা
l
কুরুসভার অন্ধকার: দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা
পাশার দান শেষবারের মতো পড়ল, আর যুধিষ্ঠির হারলেন তাঁর শেষ সম্বলটুকুও।
সাম্রাজ্য গেছে। ভাইরা গেছে। এমনকি নিজের স্বাধীনতাটুকুও তিনি খুইয়েছেন ওই কাঠের ছকের ওপর একটা নগণ্য ঘুঁটির মতো। কিন্তু সর্বনাশের এখানেই শেষ নয়; এক চরম ও আত্মঘাতী উন্মাদনায় তিনি বাজি রাখলেন তাঁর শেষ আশ্রয়কে—দ্রুপদ-নন্দিনী দ্রৌপদী। সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে মহিমান্বিত নারী, পাঁচ পাণ্ডবের গৌরব, তিনিও এখন কুরুপক্ষের জয়ের খেরোখাতায় একটা মামুলি বন্ধকী বস্তু। এবং তিনিও হাতছাড়া হয়ে গেলেন।
দুর্যোধন এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইলেন না। কুরুসভার সবচেয়ে প্রাজ্ঞ পুরুষ বিদুরের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, "যাও বিদুর, যাজ্ঞসেনীকে এখানে নিয়ে এসো। সে এখন আমাদের দাসী। আমাদের দাসীদের সঙ্গে থেকে সে এখন রাজপ্রাসাদের মেঝে ঝাঁট দেবে।"
বিদুর স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দুর্যোধনের দিকে চেয়ে রইলেন। যখন কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মৃদু, কিন্তু তাতে মিশে ছিল এক অমোঘ ভবিষ্যৎদ্রষ্টার সাবধানবাণী: "দুর্যোধন, তুমি ঘুমন্ত সিংহের গায়ে হাত দিচ্ছ। তোমার মাথার ওপর কালনাগিনীর ফণা দুলছে, আর তুমি তাকে খেপিয়ে তুলছ। ধর্মের নিয়মে যুধিষ্ঠিরের কোনো অধিকার ছিল না দ্রৌপদীকে বাজি রাখার। যে মানুষ নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলেছে, অন্যের ওপর তার আর কোনো মালিকানা থাকে না। এই পাপ থেকে সরে এসো। এতে তোমার গৌরব হবে না, রাজবংশে এমন এক গৃহবিবাদ ডেকে আনবে যা কাউকে আস্ত রাখবে না।"
কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ দুর্যোধন বিদুরের কথাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন। তিনি এক প্রাতিহারীকে (দ্বারপাল) ডেকে আদেশ দিলেন, পাণ্ডবদের তোয়াক্কা না করে দ্রৌপদীকে যেন তখনই রাজসভায় হাজির করা হয়।
বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা নিয়ে দ্বারপাল পাণ্ডবদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করল। সেখানে দ্রৌপদী তখনও নিজের সহজাত গাম্ভীর্য আর রাজকীয় মর্যাদায় স্থির হয়ে বসে আছেন।
দ্বারপাল আমতা আমতা করে সব জানাল। যুধিষ্ঠির কীভাবে একে একে ভাইদের, নিজেকে এবং সবশেষে তাঁকে জুয়াখেলায় হেরে বসে আছেন—সে কথাও বলতে বাধ্য হলো। কৌরবদের চোখে দ্রৌপদী এখন তাদের সম্পত্তি।
এই চরম দুঃসংবাদ শুনেও দ্রৌপদী ভেঙে পড়লেন না। তাঁর আয়ত চোখ দুটি স্থির রেখে দ্বারপালকে বললেন, "তুমি এখনই ওই সভায় ফিরে যাও। সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কাছে আমার একটা প্রশ্ন রাখো: আমার স্বামী নিজেকে হারানোর আগে আমাকে বাজি রেখেছিলেন, নাকি নিজেকে হারানোর পরে? সবাই যেন ভেবেচিন্তে এই প্রশ্নের উত্তর দেন। যাও, তাঁদের উত্তর শুনে এসে আমাকে জানাও।"
দ্বারপাল কুরুসভায় ফিরে এসে দ্রৌপদীর প্রশ্নটি নিবেদন করল। সেই প্রশ্নটি স্রেফ কোনো প্রশ্ন ছিল না, তা ছিল এক ধারালো তলোয়ার যা সভার প্রতিটি মানুষের বিবেককে এক লহমায় এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল।
কিন্তু গোটা সভা নিস্পন্দ, নির্বাক।
যাঁরা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ বীর, পরম ধার্মিক রাজা, পূজনীয় শিক্ষক কিংবা পরম গুরু—তাঁরা সবাই মাথা নিচু করে রইলেন। একটি শব্দও কারও মুখ থেকে সরল না। পাণ্ডবরা ধর্মের এক জটিল ও অদৃশ্য জালে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে ছিলেন যে, লজ্জায় ও গ্লানিতে তাঁদের মাথা হেঁট হয়ে রইল। কোনো উত্তর এল না।
দুর্যোধন ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন। দ্বারপালকে আবার পাঠাতে চাইলেন, কিন্তু দ্রৌপদীর ন্যায়সঙ্গত ক্রোধের সামনে যাওয়ার সাহস সেই সাধারণ কর্মচারীর আর ছিল না। বিরক্ত হয়ে দুর্যোধন তাঁর অনুজ দুঃশাসনকে বললেন, "দ্বারপালটা ভীমের ভয়ে কাঁপছে। দুঃশাসন, তুমি যাও। ওকে ধরে নিয়ে এসো। পাণ্ডবদের এখন আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই।"
দুঃশাসন আর কালবিলম্ব করল না।
উন্মত্ত অহংকারে চোখ দুটো লাল করে সে অন্তঃপুরে গিয়ে ঢুকল। দ্রৌপদীর সামনে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল, "এসো, তোমাকে আমরা জিতে নিয়েছি। তুমি এখন আমাদের সম্পত্তি। লোকলজ্জা ভুলে কুরুসভায় চলো—তুমি এখন দুর্যোধনের দাসী।"
দ্রৌপদী তার দিকে পিছন ফিরে ধৃতরাষ্ট্রের মহিষীদের কক্ষের দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে যেতে চাইলেন, যদি কোনো প্রবীণা নারী এই পশুতুল্য পুরুষের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু দুঃশাসন দ্বিধা করল না। সে পেছন থেকে দ্রৌপদীর দীর্ঘ, মসৃণ চুল মুঠো করে ধরল।
এবং টানতে শুরু করল।
একটি রাজবংশের কুলবধূকে, পাঁচজন মহাবীরের ঘরণীকে সে রাজপথ আর অলিন্দের মধ্য দিয়ে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে চলল যেন কোনো অবলা পশুকে হাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
যখন দ্রৌপদীকে কুরুসভায় এনে আছাড় মারা হলো, তাঁর চুলগুলো ছিল আলুলায়িত, পরনের একক বস্ত্রখানি আলুথালু। তিনি তখন ঋতুমতী—যে সময়ে শাস্ত্র ও সমাজ মেনে প্রতিটি নারীকে অন্তরালে, পরম যত্নে রাখার কথা। শত শত ক্ষমতাশালী পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ আর অপমানে ফেটে পড়লেন দ্রৌপদী: "আমি একবস্ত্রা, ঋতুমতী। এই অবস্থায় আমাকে এই ভরা রাজসভায় টেনে আনা হলো? এই বংশের গুরুজনদের সামনে?"
দুঃশাসন অট্টহাসি হেসে উঠল, "দাসী! কৌরবদের কেনা দাসী!" পাণ্ডবদের দিকে তাকিয়ে সে বারবার ব্যঙ্গ করতে লাগল।
কর্ণ হাসলেন। শকুনি হাসলেন। দুর্যোধনের মুখ জয়ের পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর বাকি রাজন্যবর্গ? যাঁরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন, যাঁরা ন্যায়-অন্যায় বুঝতেন, তাঁরা কেবল জড়বস্তুর মতো তাকিয়ে রইলেন।
অপমানের তীব্র দহন সত্ত্বেও দ্রৌপদীর কণ্ঠস্বর সেই সভাগৃহে এক অপার্থিব ঘণ্টার মতো বেজে উঠল:
"এখানে উপস্থিত এই ভণ্ড পুরুষরা যুধিষ্ঠিরকে এক সুপরিকল্পিত চক্রান্তের জালে জড়িয়ে ধ্বংস করেছে। এরা কাপট্য করেছে। আমার স্বামী প্রথমে তাঁর ভাইদের হারালেন, তারপর নিজেকে। যখন তিনি নিজেই স্বাধীন নন, যখন তিনি কৌরবদের দাস—তখন কোন অধিকারে তিনি আমাকে বাজি রাখেন? একজন দাস কি অন্য কোনো মুক্ত মানুষের স্বাধীনতা হরণ করতে পারে? এই সভায় প্রাজ্ঞরা আছেন, গুরুজনরা আছেন, পিতামহ আছেন। আমাকে উত্তর দিন!"
ধর্মের এমন সূক্ষ্ম ও অমোঘ প্রশ্ন শুনে উপস্থিত পণ্ডিতদের মেরুদণ্ড কেঁপে উঠল। কিন্তু কেউ মুখ খুললেন না।
ঠিক তখনই উঠে দাঁড়ালেন বিকর্ণ। তিনি ধৃতরাষ্ট্রেরই এক তরুণ পুত্র, দুর্যোধনের ভাই। ক্ষমতার কোনো বড় অহংকার তাঁর ছিল না, কিন্তু যেখানে মহারথীরা কাপুরুষের মতো নীরব, সেখানে এই তরুণ গর্জে উঠলেন।
"আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে," বিকর্ণ বললেন, "আমরা যদি আজ চুপ করে থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। পিতামহ ভীষ্ম কোথায়? আমার পিতা ধৃতরাষ্ট্র কোথায়? প্রাজ্ঞ বিদুর, আচার্য দ্রোণ আর কৃপ—তাঁরা কেন মৌন? ভারতবর্ষের এত এত রাজা চোখের সামনে এক নারীর এই অপমান দেখেও কীভাবে বোবা হয়ে বসে আছেন?"
তিনি থামলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। বিকর্ণ আবার বলতে লাগলেন, "তাহলে আমিই বলছি যা সত্য। শাস্ত্রে পুরুষদের চার প্রকার ব্যসনের কথা বলা হয়েছে—মৃগয়া, মদ্যপান, দ্যুতক্রীড়া আর নারীসঙ্গ। এর যেকোনো একটিতে মত্ত হলে মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। যুধিষ্ঠির জুয়ার নেশায় অন্ধ হয়ে এই কাজ করেছেন। আর দ্রৌপদী তো কেবল তাঁর একার স্ত্রী নন, তিনি পাঁচ ভাইয়ের ঘরণী। একার সিদ্ধান্তে তাঁকে বাজি রাখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে হারানোর পর তাঁর আর বাজি রাখার কোনো আইনি অধিকারই ছিল না। আমি মনে করি, দ্রৌপদীকে ধর্মের নিয়মে জেতা হয়নি।"
মুহূর্তের মধ্যে কুরুসভা উল্লাসে ফেটে পড়ল। আমন্ত্রিত রাজারা বিকর্ণের ন্যায়বিচারের প্রশংসা করে হাততালি দিয়ে উঠলেন।
কিন্তু সেই উল্লাস স্তব্ধ করে দিলেন কর্ণ।
তিনি বিকর্ণের হাত চেপে ধরে তীব্র ঘৃণায় বললেন, "তুমি তো এক অবোধ বালক, অথচ কথা বলছ যেন মস্ত এক ঋষি! তোমার এই সভার নিয়মকানুন জানা নেই। ভালো করে চেয়ে দ্যাখো, অন্য কেউ কিন্তু দ্রৌপদীর প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কেন দেয়নি জানো? কারণ সবাই বোঝে যা হয়েছে তা আইনসম্মত। যুধিষ্ঠির নিজে ধর্মের জ্ঞাতা হয়ে এই বাজি ধরেছেন। পাঁচ পাণ্ডব তাতে সায় দিয়েছেন। আর দ্রৌপদীর কথা বলছ?" কর্ণের গলার স্বর এবার আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল, "যে নারীর পাঁচজন স্বামী, সমাজ তাকে অন্য চোখে দেখে। তাকে একবস্ত্রা অবস্থায় আনা হলো নাকি সম্পূর্ণ নগ্ন করে—তাতে কিছুই আসে যায় না। সে আমাদের বিজিত দাসী। এদের সবার সবকিছুই এখন আমাদের।"
এরপর তিনি দুঃশাসনের দিকে ঘুরে আদেশ দিলেন, "এদের সবার পোশাক কেড়ে নাও।"
এই চরম অপমানজনক আদেশ শুনে পাণ্ডবরা নিজেরাই তাঁদের উত্তরীয় শরীর থেকে সরিয়ে নিলেন—যেন নিয়তির এই নিষ্ঠুর লিখনকে তাঁরা নত মস্তকে স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর দুঃশাসন এগিয়ে গেল দ্রৌপদীর একক বস্ত্রের আঁচল লক্ষ্য করে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দ্রৌপদী মানুষের ওপর সমস্ত আশা ত্যাগ করলেন।
তিনি কুরুসভার কোনো পুরুষের দিকে আর তাকালেন না। মুখ তুলে ডাকলেন তাঁকে, যাঁকে তিনি মহাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভরসা করেন। তাঁর অবরুদ্ধ কণ্ঠ চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে এল: "গোবিন্দ! দ্বারকানাথ! কৃষ্ণ! এরা আমাকে তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে আর তুমি এখানে নেই! আমি অতল সাগরে ডুবে যাচ্ছি, আমাকে রক্ষা করো প্রভূ!"
তিনি দু-হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে অন্তরের সমস্ত আকুলতা দিয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন।
আর দ্বারকা থেকে সেই ডাক শুনলেন শ্রীকৃষ্ণ। বস্ত্রহরণের প্রতিটি টানে, অলৌকিকভাবে, দ্রৌপদীর দেহে নতুন নতুন বস্ত্রের আবরণ তৈরি হতে লাগল। দুঃশাসন কাপড় টেনেই চলল, টেনেই চলল... যতক্ষণ না তার হাত ক্লান্ত হয়ে পড়ল, মুখ লাল হয়ে উঠল এবং পা দুটো অবশ হয়ে এল। কিন্তু দ্রৌপদীর বস্ত্রের শেষ পাওয়া গেল না। রাজসভার মেঝেতে কাপড়ের এক বিশাল পাহাড় তৈরি হয়ে গেল, আর যাজ্ঞসেনী সেখানে অক্ষত, আবৃত ও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
দুঃশাসন এক অতিন্দ্রীয় শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে ক্লান্তিতে মাটিতে বসে পড়ল। গোটা সভা তখন এক অলৌকিক স্তব্ধতায় মোড়া।
সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভীমসেনের কণ্ঠস্বর যেন যুদ্ধের দামামার মতো বেজে উঠল।
তিনি তাঁর বিশাল শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভয়ে নয়, ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্রোধকে ধরে রাখার চেষ্টায় তাঁর হাত দুটো কাঁপছিল। কৌরব ভাইদের দিকে চোখ রেখে তিনি এক ভয়ানক প্রতিজ্ঞা করলেন: "এখানে উপস্থিত সবাই শুনে রাখুন, আমি এক ভীষণ শপথ করছি। যদি আমি এই শপথ পূরণ করতে না পারি, তবে আমার পূর্বপুরুষদের জন্য স্বর্গের দ্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাক। আমি এই দুঃশাসনকে যুদ্ধের ময়দানে বধ করব। নিজের খালি হাতে ওর বুক চিরে রক্তপান করব!"
মুহূর্তের মধ্যে সভাগৃহ হিম হয়ে গেল। দুর্যোধনের মুখের চিলতে হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল। ভীম যা বলেন, তা যে তিনি করতে পারেন—সে বিষয়ে কারও মনে কোনো সংশয় ছিল না।
সভার এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিদুর উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত হতে বললেন। তিনি আবার ধর্মের কথা মনে করিয়ে দিলেন—এক রূঢ়, অকাট্য আইনি সত্য যে, নিজেকে জুয়ায় হারার পর যুধিষ্ঠিরের আর কোনো অধিকার ছিল না অন্য কাউকে বাজি রাখার। এই জুয়াখেলাই অবৈধ।
ঠিক তখনই এক অদ্ভুত অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। রাজসভার বাইরে নয়, যেন রাজপ্রাসাদের দেয়ালের ভেতর থেকেই শেয়ালের দল ডেকে উঠল। ছাদের কার্নিশ থেকে কাকেরা ডাকতে লাগল, কোথা থেকে যেন শকুন এসে আকাশে চক্কর কাটতে শুরু করল। কুরুসভার বাতাস এক অদ্ভুত ভারী আর অশুভ ইঙ্গিতে ভরে উঠল।
অন্তঃপুরে বসে গান্ধারী এই অমঙ্গল টের পেলেন। তিনি দ্রুত ধৃতরাষ্ট্রের কাছে খবর পাঠালেন।
অন্ধ রাজা এতক্ষণে বুঝতে পারলেন তাঁর পুত্ররা কী ভয়ানক অপরাধ করে ফেলেছে। তিনি দুর্যোধনের দিকে ফিরে অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন, "মূর্খ, অহংকারী ছেলে! তোমার এই জেদের জন্য তুমি আজ কুরুবংশকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করালে। ভরা সভায় পাণ্ডব ও দ্রৌপদীকে অপমান করে তুমি যা হারালে, তা আর কোনোদিন ফিরে পাবে না।"
খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ধৃতরাষ্ট্র দ্রৌপদীকে কাছে ডাকলেন। অত্যন্ত অনুতপ্ত গলায় বললেন, "মা আমার, তুমি আমার সব পুত্রবধূদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তুমি পরম সাধ্বী। আজ তোমার সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, তার জন্য আমি লজ্জিত। তুমি আমার কাছে বর চাও। তুমি যা চাইবে, আমি তা-ই দেব।"
দ্রৌপদী তাঁর দিকে তাকালেন। তিনি চাইলে সাম্রাজ্য, প্রতিশোধ বা অপরাধীদের শাস্তি চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি সংযম হারালেন না।
তিনি বললেন, "যদি বর দিতেই হয়, তবে আর্য যুধিষ্ঠিরকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিন। আমি চাই না আমার পুত্র প্রতিবিন্ধ্য বড় হয়ে শুনুক যে তার পিতা একজন কেনা গোলাম ছিলেন।"
"তা-ই হবে মা," ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "তুমি আরও একটি বর চাও। তুমি এর চেয়েও বেশি পাওয়ার যোগ্য।"
"তাহলে ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেবকেও তাদের রথ ও অস্ত্রসহ মুক্তি দিন।"
"তোমার এই ইচ্ছাও পূরণ হলো। এবার তৃতীয় বরটি চাও।"
দ্রৌপদী মাথা নাড়লেন, "না পিতা। শাস্ত্রে আছে অতিরিক্ত লোভ ধ্বংস ডেকে আনে। আমার যা প্রয়োজন, আমি পেয়ে গেছি। আমার স্বামীরা এখন মুক্ত। আর তাঁরা মুক্ত থাকলে নিজেদের বাহুবলে এবং ধর্মের জোরে সবকিছু আবার জয় করে নিতে পারবেন। আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।"
যে কর্ণ এতক্ষণ তাঁর অপমানের সহযোগী ছিলেন, তিনিও দ্রৌপদীর এই সংযম আর বুদ্ধিমত্তা দেখে মনে মনে প্রশংসা না করে পারলেন না। শত্রুর মনেও এক অদ্ভুত সমীহ তৈরি হলো।
মুক্ত হয়েই ভীম যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "জ্যেষ্ঠ, এখনই আদেশ দিন, এদের সবাইকে আমি শেষ করে দিই।"
যুধিষ্ঠির ভীমের হাত ধরে শান্ত করলেন, "এখন নয় ভীম, আজ নয়।"
পাঁচ ভাই মিলে ধৃতরাষ্ট্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। যুধিষ্ঠির চিরকালের মতো তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয় ও শিষ্টাচার বজায় রেখে বললেন, "খুড়ামশাই, আমাদের আদেশ দিন। আমরা সবসময় আপনার ছত্রছায়ায় থাকতে চাই।"
ধৃতরাষ্ট্র সোজা হয়ে বসলেন। এবার তাঁর গলায় এক প্রাজ্ঞ অভিভাবকের সুর শোনা গেল: "অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। তোমরা ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে যাও। তোমাদের রাজ্য, তোমাদের ধনসম্পদ সব ফিরিয়ে নাও। বীরের মতো রাজত্ব করো। আমি এক বৃদ্ধ রাজা, তোমাদের আদেশ দিচ্ছি—আজ যা ঘটেছে তা ভুলে যাও। সৎ মানুষরা অপরের করা অন্যায় মনে পুষে রাখে না। অধমেরা কুৎসিত কথা বলে, সাধারণ মানুষ তার পাল্টা জবাব দেয়, কিন্তু যাঁরা উত্তম, তাঁরা নীরবে ধর্মকে ধরে রাখেন। তোমরা কুরুবংশের গৌরব। এখন শান্তিতে নিজেদের প্রাসাদে ফিরে যাও।"
তিনি একে একে যুধিষ্ঠিরের ধর্ম, অর্জুনের ধৈর্য, ভীমের বীরত্ব এবং নকুল-সহদেবের সেবাপরায়ণতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। যুধিষ্ঠির অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বৃদ্ধ রাজার কথা শিরোধার্য করলেন। সভায় উপস্থিত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে পাঁচ ভাই দ্রৌপদীকে নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কুরুসভার সেই অন্ধকার অধ্যায় পিছনে ফেলে পাণ্ডবেরা আবার আলোর দিকে মুখ ফেরালেন।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি অংশে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সভা পর্বের ১৩তম অংশের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।যেকোনো জিজ্ঞাসার জন্য অনুগ্রহ করে ৯৮৩০০৩০৮৭৩ নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) করতে বা ujjwal.sarkar@gmail.com ঠিকানায় ইমেইল করতে দ্বিধা করবেন না।

Comments
Post a Comment