অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ


অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ

এক

সভাঘরের গুরুভার দরজা দুটো যখন রুদ্ধ হয়ে গেল, এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পাণ্ডবদের চলে যাওয়ার শেষ পদধ্বনি, তখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল যা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র এর আগে কখনও অনুভব করেননি। এ নিস্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা বহন করে আনে না; এ এক অপরাধী মানুষের নিজের কৃতকর্মের মুখোমুখি একা বসে থাকার চরম যন্ত্রণা।

ধৃতরাষ্ট্রের অঙ্গে কোনো বিশ্রাম নেই। আহারে তাঁর রুচি চলে গেছে, চোখে ঘুম নেই, নিজের শয়নকক্ষে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতেও পারছেন না তিনি। তাঁর অবশ মগজের অন্ধ অলিন্দে বারবার ঘুরেফিরে ভেসে উঠছে একটিই দৃশ্য—রাজকীয় বৈভব ছেড়ে গাছের বাকল পরিহিত পাঁচ রাজপুত্র নিঃশব্দে হেঁটে চলে যাচ্ছে নগর ছেড়ে, আর তাদের পেছনে আলুলায়িত চুলে রোদন করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে এক রমণী। এই সর্বনাশের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছেন। নিজের অন্ধ স্নেহের কাছে সমর্পণ করেছেন সমস্ত বিবেক। আর এখন সেই পাপের গুরুভার তাঁর বুকের ওপর কোনো পাথরের মতো চেপে বসেছে।

অসহ্য যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি বিদুরকে ডেকে পাঠালেন।

বিদুর এলেন। যেমন তিনি বরাবর আসেন—শান্ত, আড়ম্বরহীন, চাটুকারিতার লেশমাত্রহীন এক ব্যক্তিত্ব। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সম্মুখে বসে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ধৃতরাষ্ট্র ব্যাকুলভাবে বলে উঠলেন, "বিদুর, আমায় বলো। সমস্ত কিছু সবিস্তারে বলো। পাণ্ডবরা কীভাবে হস্তিনাপুর ত্যাগ করল? যাওয়ার সময় কেমন দেখাত তাদের? এই মুহূর্তে অরণ্যের পথে কেমন আছে তারা? আমি সব জানতে চাই, বিদুর, সব!"

বিদুর দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা না বলে তাঁর অন্ধ অগ্রজের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।

দুই

"মহারাজ," বিদুর বললেন, "প্রথমেই একটা সত্য আমাদের স্বীকার করে নেওয়া ভালো। আপনার পুত্র যুধিষ্ঠিরকে কোনো বীরত্ব বা যুদ্ধকৌশলে পরাজিত করেনি, যা নিয়ে একজন রাজা গর্ব করতে পারেন। সে জিতেছে শকুনি মামার কপট পাশার দানে, এক চরম প্রতারণায়। সেই ছলনায় পাণ্ডবদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অথচ দেখুন, এত বড় অপমানের পর ও যুধিষ্ঠির কিন্তু আপনার পুত্রদের বিরুদ্ধে একটিও কটু কথা বলেননি। রাজ্য, ঐশ্বর্য, স্বাধীনতা, এমনকি সহধর্মিণীর সম্মান হারানোর পরেও তিনি কৌরবদের ভাই বলেই গণ্য করেছেন। কোনো অভিশাপ দেননি, কোনো কটূক্তি করেননি।"

ধৃতরাষ্ট্র নির্বাক, তাঁর জীর্ণ শরীরটা কেবল কাঁপছে। বিদুর বলতে লাগলেন—

"যুধিষ্ঠির যখন সভাঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছিলেন, তখন তিনি দুই হাতের তালু দিয়ে নিজের চোখ দুটো ঢেকে রেখেছিলেন। জানেন কেন? তাঁর দু-চোখে তখন এমন তীব্র ক্রোধের আগুন জ্বলছিল যে, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন—যদি তাঁর সেই দৃষ্টি আপনার কোনো পুত্রের ওপর পড়ে, তবে তারা সেই মুহূর্তেই ভস্ম হয়ে যাবে। এই হলো তাঁর আত্মসংযমের পরিমাপ। নিজের ন্যায়সঙ্গত ক্রোধ যাতে কুলকে ধ্বংস না করে, তাই তিনি নিজের চোখ আড়াল করেছিলেন।"

অন্ধরাজা আসনের ওপর একটু নড়েচড়ে বসলেন। এক অব্যক্ত আশঙ্কায় তাঁর কপাল ঘামতে শুরু করেছে।

"আর ভীম?" বিদুর বলে চললেন, "ভীম তাঁর দুই বিশাল বাহু প্রসারিত করে হেঁটে গেছেন। নিজের শারীরিক শক্তির ওপর তাঁর অগাধ আত্মবিশ্বাস, আর সে বিশ্বাস অমূলক নয়। তিনি যখন সেই হাত দুটো মেলে বাতাসে কী যেন মাপছিলেন, উপস্থিত প্রজারা ঠিকই বুঝেছিল তার অর্থ। মুখে কোনো কথা না বলেও তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন—একদিন এই দুই হাতেই তিনি শত্রুদের বিনাশ করবেন। ওটা কোনো ক্ষণিকের আস্ফালন ছিল না মহারাজ, ওটা ছিল এক অমোঘ ভবিতব্যের ঘোষণা।"

"আর অর্জুন? অর্জুন কী করল?" ধৃতরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

"অর্জুন চলার পথে প্রতি পদক্ষেপে রাস্তা থেকে ধুলো উড়িয়ে যাচ্ছিলেন। অত্যন্ত ছন্দোবদ্ধ, ধীর পদক্ষেপে। এ যেন একজন ধনুর্ধরের বাণ নিক্ষেপের আগের মহড়া। তিনি তাঁর পা দিয়ে মাটিকে যেভাবে চিহ্নিত করছিলেন, তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল—মনে মনে তিনি ইতিমধ্যেই কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য স্থির।"

ধৃতরাষ্ট্র পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে রইলেন।

বিদুর বলতে লাগলেন, "সহদেব যাওয়ার আগে নিজের মুখ ধুলো দিয়ে ঢেকে নিয়েছিলেন। তিনি চাননি এই অপমানের মুহূর্তে কেউ তাঁর মুখ দেখুক। তা তীব্র দুঃখ থেকে নাকি গভীর লড়াকু জেদ থেকে—তা আমি জানি না। তবে তিনি এমনভাবে হস্তিনাপুর ছেড়ে গেলেন, যেন এই পৃথিবীকে নিজের মুখ আর দেখাতে চান না। আর নকুল? তিনি তাঁর সর্বাঙ্গে ধুলো মেখে নিয়েছিলেন। কুরুবংশের সবচেয়ে সুপুরুষ তিনি, কিন্তু এই অপমানের দিনে তিনি চাননি নগরের কোনো নারী তাঁর সেই রূপ দেখে মোহিত হোক। অপমানের চরম সীমানাতেও তিনি নিজের শালীনতা ভোলেননি।"

কক্ষে আবার কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধতা নেমে এল। তারপর বিদুরের কণ্ঠস্বর আরও নিচু, আরও ভারী হয়ে উঠল।

"আর দ্রৌপদী, মহারাজ... যাজ্ঞসেনী কেবল এক টুকরো বস্ত্র পরিধান করে, জট পাকানো মুক্ত চুলে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে গেছেন। তিনি তখন ঋতুমতী ছিলেন। নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় বা ন্যূনতম সম্মানটুকুও তাঁকে দেওয়া হয়নি। আর এই নগরীর রাজপথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি উচ্চকণ্ঠে বলছিলেন—'যে নিষ্ঠুর পুরুষরা আজ আমাদের এই দশা করল, একদিন তাদের ঘরের নারীরাও এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে হস্তিনাপুরে প্রবেশ করবে, যখন তারা তাদের স্বামী-পুত্র-ভাইদের হারাবে।' এ কোনো অভিশাপ ছিল না মহারাজ, এ ছিল এক অলঙ্ঘনীয় সত্য। আর তা শুনে উপস্থিত সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে উঠেছিল।"

তিন

বিদুর এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, "এই যাত্রাদলের একেবারে সামনে ছিলেন পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত ধৌম্য। তাঁর হাতে ছিল কুশ ঘাস, যার অগ্রভাগ ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম মুখী। তিনি যমরাজের স্তোত্র পাঠ করতে করতে এগোচ্ছিলেন। যাঁরা শাস্ত্র জানেন, তাঁরা ভালো করেই বুঝেছেন এর তাৎপর্য। ধৌম্য আসলে কৌরবদের ভাবী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মন্ত্র আগেভাগেই উচ্চারণ করে যাচ্ছিলেন। তিনি নিয়তি আর ইতিহাসকে জানিয়ে দিলেন—আপনাদের পতন এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।"

ধৃতরাষ্ট্রের মুখাবয়ব থমথম করছে। বিদুর থামলেন না।

"পাণ্ডবরা যখন হস্তিনাপুরের সীমানা পার হচ্ছিল, তখন গোটা নগরী কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সাধারণ ব্যবসায়ী, কারিগর, খেটে খাওয়া মানুষ—যাঁরা যুধিষ্ঠিরের শাসনে শান্তিতে ছিলেন, তাঁরা রাজপথে নেমে অঝোরে কেঁদেছেন। তাঁরা বলছিলেন—'আমাদের প্রিয় রাজাদের এভাবে বনে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, আর কুরুবংশের প্রবীণরা লোভ আর দুর্বলতার কারণে সভায় পুতুলের মতো বসে রইলেন! কৌরবদের জন্য আমাদের আর কোনো সহানুভূতি রইল না।' এ কথা কোনো ঋষির নয় মহারাজ, এ কথা আপনার রাজ্যের সাধারণ মানুষের।"

বিদুর এবার সরাসরি ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকালেন, তাঁর কণ্ঠে কোনো মায়া নেই।

"প্রকৃতিও এর প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিয়েছে। পাণ্ডবরা চলে যাওয়ার সাথে সাথে কেঁপে উঠেছে এই ধরিত্রী। অমাবস্যা না হওয়া সত্ত্বেও সূর্যগ্রহণ দেখা গেছে। দক্ষিণের আকাশে উল্কাপাত হয়েছে। চিল, শকুন আর কাকেরা মন্দিরের চূড়ায় এবং প্রাসাদের ছাদে মৃত পশুর মাংসের টুকরো আর হাড় এনে ফেলতে শুরু করেছে। এগুলো কাকতালীয় নয়, মহারাজ। এগুলো কুলনাশের অশুভ লক্ষণ। আর এই বিনাশের মূল উৎস লুকিয়ে আছে আপনার নিজের গৃহেই।"

চার

বিদুরের কথা শেষ হতে না হতেই সেখানে উপস্থিত হলেন দেবর্ষি নারদ। সঙ্গে তাঁর একদল অনুগামী ঋষি। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এই বিষণ্ণ পরিবেশের দিকে তাকিয়ে নারদের কণ্ঠ থেকে নির্গত হলো বজ্রবাণী—

"আজ দুর্যোধন যে পাপ করল, তার ফলশ্রুতিতে আজ থেকে ঠিক চোদ্দো বছর পর কুরুবংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে। ভীম আর অর্জুনের হাতেই ঘটবে এই বংশের বিনাশ।" আর একটি কথাও না বলে, তাঁরা যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই নিঃশব্দে চলে গেলেন।

কক্ষে যে নিস্তব্ধতা পড়ে রইল, তা যেন শ্মশানের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

পাঁচ

এই ঘটনার পর, দুর্যোধন, কর্ণ এবং শকুনি—বিজয়ের উল্লাসের পেছনে যখন ভয়ের চোরাস্রোত বইতে শুরু করে, তখন মানুষ যেমন কোনো আশ্রয়ের খোঁজে ছোটে—ঠিক তেমনি ছুটে গেলেন দ্রোণাচার্যের কাছে। পাণ্ডবদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া সমস্ত রাজ্য ও ঐশ্বর্য তাঁরা আচার্যের চরণে সমর্পণ করে তাঁদের সুরক্ষার প্রার্থনা জানালেন।

দ্রোণাচার্য তাঁদের ফিরিয়ে দিলেন না, তবে একজন খাঁটি ক্ষত্রিয় ও শিক্ষকের মতো নির্মম সত্যটা শুনিয়ে দিলেন।

"ভালো করে শুনে রাখো," দ্রোণ বললেন, "পাণ্ডবরা দেবপুত্র। কোনো সাধারণ শক্তির সাধ্য নেই তাদের ধ্বংস করার। এই দেশের সমস্ত ব্রাহ্মণ এ কথা জানেন। তা সত্ত্বেও তোমরা আমার কাছে শরণাাগত হয়েছ, আর শরণাগতকে ফিরিয়ে দেওয়া আমার ধর্ম নয়। আমি তোমাদের পক্ষে দাঁড়াব, তোমাদের হয়ে যুদ্ধ করব। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার জেনে রাখো—আমি এটা করছি কেবল আমার কর্তব্যের টানে, তোমাদের এই পাপকর্মকে সমর্থন করি বলে নয়।"

একটু থেমে আচার্য আবার বললেন, "ভেবো না পাণ্ডবদের বনে পাঠিয়ে তোমরা খুব সুরক্ষিত হয়ে গেছ। এই রাজ্য এখন ধার করা সময় মাত্র। কয়েকটা দিনের আলো, বড়জোর কয়েক ঘণ্টার খেলা। অহঙ্কার ত্যাগ করো। বড় বড় যজ্ঞ করো, ব্রাহ্মণদের দান-ধ্যান করো। বিনম্র হও। কারণ চোদ্দোতম বছরে এমন এক মহাবিপদ ধেয়ে আসবে, যা থেকে তোমাদের কোনো প্রাচীর রক্ষা করতে পারবে না।"

ছয়

আচার্যের এই বাণী ধৃতরাষ্ট্রের কানে পৌঁছানোর পর তিনি দীর্ঘকাল স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর বিদুরের দিকে ফিরে তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত আর্তি শোনা গেল—যা এতকাল তাঁর কণ্ঠে কখনো ছিল না। এ এক খাঁটি অনুশোচনা।

"বিদুর," ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "আচার্য ঠিকই বলেছেন। তুমি যাও, পাণ্ডবদের ফিরিয়ে আনো। তারা যদি ফিরতে না-ও চায়, তবে অন্তত তাদের অস্ত্র আর সেবকদের তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। অরণ্যেও যাতে তারা কিছুটা মর্যাদা আর স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করো।"

এইটুকু বলে অন্ধরাজা উঠে দাঁড়ালেন এবং প্রাসাদের এক অন্ধকার কোণে গিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে রইলেন।

সাত

সেখানেই তাঁর কাছে এলেন সঞ্জয়। তাঁর সারথি, তাঁর চিরকালের বিশ্বস্ত সহচর, যিনি বোধহয় বিদুরের চেয়েও ধৃতরাষ্ট্রের অন্তরকে বেশি চেনেন।

সঞ্জয় অন্ধরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "মহারাজ, আপনি নিজেই পাণ্ডবদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে বনে পাঠালেন, আর এখন এখানে বসে শোক করছেন? আপনি যা হতে দিয়েছিলেন, তার থেকে আর কী-ই বা আশা করেছিলেন?"

ধৃতরাষ্ট্র এবার আর এড়িয়ে গেলেন না। "সঞ্জয়," তিনি অত্যন্ত কাতরভাবে বললেন, "আমায় সত্যি করে বলো—পাণ্ডবদের মতো বীরদের শত্রু বানিয়ে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষ কি শান্তিতে বাঁচতে পারে? তারা পরাক্রমশালী, তারা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। আমাদের মতো অন্যায় করার পর কি কোনো শান্তির আশা থাকে?"

সঞ্জয় কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর বললেন, "মহারাজ, আপনার বংশ যে ধ্বংস হবে, তা এখন নিশ্চিত। আর তার সাথে বহু নির্দোষ মানুষও মরবে। পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ, জ্ঞানী বিদুর—সবাই দুর্যোধনকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন, বারবার সতর্ক করেছিলেন। অথচ সেই ভরা সভায় দ্রৌপদীকে টেনে এনে অপমান করা হলো। এই অধর্মের মুহূর্ত থেকেই সমস্ত বিনাশের সূত্রপাত। যখন একজন মানুষের কাছে অন্যায়টাই ন্যায় বলে মনে হতে শুরু করে, তখন সে আসলে নিজের ধ্বংসের পথ নিজেই প্রশস্ত করে। আপনার পুত্ররা দ্রৌপদীকে অপমান করে এই মহাযুদ্ধকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একমাত্র দুর্যোধনের পক্ষেই এমন কাজ সম্ভব।"

ধৃতরাষ্ট্র দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর অত্যন্ত ক্ষীঁণ কণ্ঠে বললেন—

"আমিও তা অনুভব করছি, সঞ্জয়। সব বুঝতে পারছি। দ্রৌপদী যদি চাইতেন, তবে তাঁর ক্রোধের আগুনে এই মুহূর্তেই গোটা বিশ্বকে ছাই করে দিতে পারতেন। আমার পুত্ররা তো তাঁর সামনে খড়কুটো মাত্র। যখন সভায় তাঁর বস্ত্রহরণের চেষ্টা হচ্ছিল, প্রাসাদের সমস্ত নারীরা ক্ষোভে গান্ধারীর কাছে ছুটে গিয়েছিল। ব্রাহ্মণরা আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। গোটা নগরীতে হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা এই অপমান ভুলে যাবে না, আর তাদের পেছনে থাকা যাদব ও পাঞ্চাল রাজবংশও শান্ত থাকবে না। আর সবার ওপরে আছেন কৃষ্ণ, যাঁর আশীর্বাদ পাণ্ডব ও দ্রৌপদীর ওপর সদাসর্বদা রয়েছে।"

রাজা একটু থামলেন, তারপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—

"বিদুর বারবার আমায় সঠিক পরামর্শ দিয়েছিলেন, পাণ্ডবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি দুর্যোধনের অন্ধ স্নেহে অন্ধ হয়ে প্রতিবার তাঁর কথা অগ্রাহ্য করেছি। মন্ত্রীর প্রজ্ঞার চেয়ে, নিজের বিবেকের চেয়ে আমি আমার পুত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বড় করে দেখেছি। আর আজ, এই অন্ধকারের কোণে দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমি নিজের হাতে কী ভয়ঙ্কর সর্বনাশ ডেকে এনেছি।"

তিনি আর কিছু বললেন না। বলার মতো আর কিছু অবশিষ্টও ছিল না।

বাইরে তখন হস্তিনাপুর নগরী এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। এক আসন্ন অবসান আর যুগান্তরের আশঙ্কায় গোটা শহর যেন এক অজানা আতঙ্কে নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।

বি: দ্র: এটা সভা পর্বের ১৫তম অংশের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এখানেই সভা পর্বের সমাপ্ত। 

ইতিমধ্যে মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  অংশে সম্পন্ন হয়েছে। এখন সভা পর্বও সমাপ্ত হল। এরপর শুরু হবে বন পর্ব, এই ব্লগে চোখ রাখুন। এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া