রাজসূয় যজ্ঞের অবসান: এক অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস

 


রাজসূয় যজ্ঞের অবসান: এক অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস

মহিমান্বিত রাজসূয় যজ্ঞের সমাপ্তি ঘটল। পবিত্র যজ্ঞাগ্নি শান্ত হয়েছে, আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ ও ঋষিকুল দক্ষিণায় সন্তুষ্ট হয়ে বিদায় নিয়েছেন। এতকাল ধরে যে ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী পৃথিবীর প্রান্ত থেকে আসা অগণিত রাজা, মহারাজা আর চতুরঙ্গ সেনাবাহিনীর কোলাহলে মথিত হয়ে উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। ঠিক যেন বর্ষা শেষে দুকূল প্লাবিত করা নদী আবার তার চেনা খাতের শান্ত জলরেখায় ফিরে যাচ্ছে।

বিদায়ের এই অন্তিম প্রহরে যুধিষ্ঠিরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। কৃচ্ছ্রসাধনে শুষ্কমুখ শিষ্যদের পরিবৃত করে যখন বেদব্যাস এলেন, পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পরম শ্রদ্ধায় তাঁর আসন গ্রহণ করলেন। ব্যাসদেবের সেই চোখে যুগান্তরের সাক্ষী থাকার ক্লান্তি ও প্রজ্ঞা।

তিনি শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বললেন, "রাজন, তুমি এক অসম্ভব কাজ সম্পন্ন করেছ। পৃথিবীতে তোমার এই রাজসূয় যজ্ঞ ধর্মের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। কুরুবংশের কীর্তি আজ তোমার কারণে হিমালয়ের চেয়েও উচ্চ। কিন্তু এবার আমাদের বিদায়ের লগ্ন সমাগত।"

যুধিষ্ঠির করজোড়ে প্রণাম করে বিনীত মুখে বললেন, "আপনাদের সন্তোষই আমার পরম প্রাপ্তি, মহর্ষি। কিন্তু বিদায়ের আগে আমার একটি সংশয় দূর করুন। দেবর্ষি নারদ কিছুকাল আগে আমাকে এক ঘোর সংকটের কথা বলে গিয়েছিলেন—অরাজকতা, ভূমিকম্প আর বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অমঙ্গলের পূর্বাভাস। শিশুপাল বধের পর এই যজ্ঞ সম্পন্ন হলেও আমার মন এক অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে আছে। এই মহাসমারোহই কি কোনো মহাবিনাশের সূত্রপাত?"

ব্যাসদেব কিছুকাল নীরব রইলেন। তারপর তাঁর ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ম্লান, নির্মম সত্যের হাসি। তিনি বললেন, "আজ থেকে ঠিক তেরো বছর পর এই আশঙ্কাই সত্য হয়ে দেখা দেবে, যুধিষ্ঠির। দুর্যোধনকে নিমিত্ত করে নিয়তির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। এক মহাযুদ্ধের আগুনে সমূলে ধ্বংস হবে সমগ্র ক্ষাত্রকুল, কুরুবংশের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে না। ললাটলিখন কেউ মুছতে পারে না, রাজন। তবে এই আগামী বছরগুলোয় তুমি নিজেকে কীভাবে ধরে রাখবে, সেই সংযমটুকু কিন্তু একান্তই তোমার নিজের হাতে।"

ব্যাসদেব উত্তরের কৈলাশ পর্বতের দিকে মিলিয়ে যাওয়ার পর যুধিষ্ঠিরের মনের ভেতর সেই শব্দগুলো পাথরের মতো চেপে বসল। ঝড়ের পরের স্তব্ধতার মতো এক গভীর বিষাদ তাঁকে গ্রাস করল। সেই দিন থেকেই যুধিষ্ঠির আরও সংযত, আরও সতর্ক হয়ে উঠলেন। তিনি ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবকে ডেকে স্পষ্ট বললেন, "ভাইসব, আগামী দিনগুলো বড় কঠিন। আমাদের অত্যন্ত সাবধানে থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে কোনো কলহ নয়, কাউকে কোনো উস্কানি দেওয়া চলবে না। নিয়তি যাই আনুক, আমরা যেন যুদ্ধের কোনো অযাচিত কারণ না হয়ে উঠি।"

মায়ার প্রাসাদ ও অহংকারের পতন

এদিকে কৌরবদের প্রায় সবাই হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেও থেকে গিয়েছিলেন দুর্যোধন আর তাঁর মাতুল, গান্ধাররাজ শকুনি। যাঁর চতুরতা ক্ষুরধার তরবারির চেয়েও বিপজ্জনক।

ইন্দ্রপ্রস্থের মায়াসভায় ঘুরে বেড়ানোর সময় দুর্যোধন এক অদ্ভুত এবং চরম অপমানকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন। দানবশিল্পী ময়ের তৈরি সেই রাজপ্রাসাদ ছিল এক অলীক বিভ্রমের চাদরে ঢাকা। যেখানে মেঝে বলে মনে হয়, সেখানে হয়তো জল; আর যেখানে উন্মুক্ত পথ মনে হয়, সেখানে আসলে নিরেট স্ফটিকের দেয়াল।

এক চমৎকার কক্ষের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্যোধনের মনে হলো সামনে এক মনোরম পদ্মপুকুর। তিনি পরিধেয় বস্ত্র সযত্নে একটু ওপরে তুলে অত্যন্ত সাবধানে পা বাড়ালেন। কিন্তু পায়ের নিচে কোনো জল স্পর্শ করল না। ওটা ছিল স্ফটিকের মেঝের ওপর আলোর এক নিখুঁত কারুকাজ। দুর্যোধন শূন্যে পা ফেলে টাল সামলাতে পারলেন না, তাঁর শরীরটা বোকার মতো সামনে ঝুঁকে পড়ল। আশেপাশে থাকা দাসদাসীরা তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিলেও পাণ্ডব অনুচরদের মুখের চাপা হাসি এড়াল না।

কিছু দূর গিয়ে ঘটল ঠিক তার উল্টো। আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্যোধন এবার পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে পা বাড়ালেন এক স্বচ্ছ মেঝের দিকে। কিন্তু এবার আর কোনো দেয়াল বা মেঝে ছিল না, ওটা ছিল আস্ত এক জলাশয়! মুহূর্তের মধ্যে রাজকীয় পোশাক সহ দুর্যোধন হাবুডুবু খেয়ে সশব্দে জলের নিচে তলিয়ে গেলেন। যখন তিনি জল থেকে উঠলেন, তাঁর সমস্ত অহংকার আর রাজকীয় গাম্ভীর্য তখন জলে ধুয়ে গেছে।

এরপর এক দেয়ালকে দরজা ভেবে তিনি বারবার ধাক্কা দিতে লাগলেন, খিল খোঁজার চেষ্টা করলেন। যখন বুঝলেন ওটা কেবলই মার্বেল পাথরের ওপর আঁকা এক নিখুঁত ছবি, ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

এই ঘটনাগুলো হয়তো স্রেফ এক অচেনা জায়গার কৌতুক হতে পারত, কিন্তু দুর্যোধনের কাছে তা হলো না। তাঁর মনে হতে লাগল, প্রাসাদের প্রতিটি কোণ থেকে এক উপহাসের হাসি তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভীমের সেই চওড়া, অসংবৃত হাসি আর দাসদের চোখের কোণের চাউনি তাঁর চামড়ায় এসে তপ্ত শলাকার মতো বিঁধছিল। হস্তিনাপুরের দিকে যখন তাঁর রথ ঘুরল, তখন দুর্যোধনের মুখাবয়ব ক্রোধ আর অপমানে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

শকুনির পাশাখেলা ও বিনাশের বীজ

হস্তিনাপুরে ফেরার পথে বা তার কিছু পরেই, দুর্যোধন একান্তে শকুনিকে গিয়ে ধরলেন। শকুনির চোখের সামনে তখন এক আহত, হিংস্র বাঘের মতো ফুঁসছেন ধৃতরাষ্ট্র-পুত্র।

"মাতুল," দুর্যোধন আর্তনাদের মতো স্বরে বললেন, "পাণ্ডবদের ওই বৈভব আপনি দেখেছেন? ওদের ওই ঐশ্বর্য মানুষের কল্পনার অতীত। যেসব রাজারা একদিন আমাদের সভায় মাথা নত করত, তারা আজ যুধিষ্ঠিরের পায়ে উপঢৌকন দিচ্ছে। আমি কতবার ওদের শেষ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছি। আর এই যজ্ঞে স্বয়ং কৃষ্ণ সমস্ত রাজন্যবর্গের সামনে শিশুপালকে কেটে ফেললেন, অথচ কেউ একটা প্রতিবাদ পর্যন্ত করল না! আমি হস্তিনাপুরের যুবরাজ, অথচ ইন্দ্রপ্রস্থে আমাকে এক জোকারের মতো অপদস্থ হতে হলো। এই অপমানের পর আমার আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না। পিতাকে বলবেন, আমার অধ্যায় এখানেই শেষ।"

শকুনি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ভাগনেকে শুনলেন। তারপর তাঁর সেই চিরপরিচিত কুটিল ও ধীর স্বরে বললেন, "দুর্যোধন, এই বালখিল্য ঈর্ষা ত্যাগ করো। ভাগ্য এখন পাণ্ডবদের সহায়, কিন্তু ভাগ্য তো চিরকাল এক জায়গায় স্থির থাকে না। আর তুমি নিজেকে একা ভাবছ কেন? তোমার পাশে দ্রোণাচার্য আছেন, তাঁর মহাবীর পুত্র অশ্বত্থামা আছে। আর আছে কর্ণ, যার ধনুর্বিদ্যা অর্জুনের সমকক্ষ এবং যার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। সোমদত্ত আর তার তিন পুত্র তোমার পক্ষে। এই শক্তি নিয়ে তুমি চাইলে বিশ্বজয় করতে পারো।"

দুর্যোধন গর্জে উঠলেন, "তাহলে আমাকে যুদ্ধ করতে দিন, মাতুল! রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আমি এই অপমানের প্রতিশোধ নেব।"

শকুনি মৃদু মাথা নাড়লেন, "না, এখন নয়। ওভাবে নয়। কৃষ্ণ, দ্রুপদ আর ধৃষ্টদ্যুম্নের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে জেতা অসম্ভব। স্বয়ং দেবতারাও অস্ত্রের জোরে ওদের হারাতে পারবে না।" শকুনি একটু থামলেন, তাঁর ঠোঁটের কোণে এক ধূর্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। "কিন্তু অন্য একটা পথ আছে। যুধিষ্ঠির পাশাখেলা বড় ভালোবাসে। ওটা তার এক চরম দুর্বলতা, ডাকলেই সে না এসে পারবে না। অথচ খেলার কৌশল সে বিন্দুমাত্র জানে না। সে খেলে হৃদয় দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে নয়। আর এই শকুনি পাশার ছক নিয়ে যা করতে পারে, তা যুধিষ্ঠিরের কল্পনারও বাইরে। তাকে স্রেফ একবার খেলার টেবিলে নিয়ে এসো, ক্ষত্রিয় ধর্মের দোহাই দিলে সে আমন্ত্রণ ফেরাতে পারবে না। তারপর দেখবে, অক্ষক্রীড়ার ছকে তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে আমি তাকে এক নিঃস্ব ভিখারি বানিয়ে ছাড়ব।"

দুর্যোধন অপলক দৃষ্টিতে তাঁর মাতুলের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখের ভেতরের অন্ধকার এবার এক নতুন হিংস্রতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তিনি বললেন, "তাহলে পিতার সঙ্গে কথা বলুন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে রাজি করানোর দায়িত্ব আপনার।"

শকুনি মৃদু হাসলেন। বিনাশের বীজটি নিখুঁতভাবে রোপণ করা হয়ে গেছে। আর এই বীজ থেকেই আগামী দিনে যে মহীরুহ জন্ম নেবে, তার ছায়ায় অন্ধকার হয়ে যাবে আর্যাবর্তের সমস্ত আকাশ।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া