ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা
ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা
ইন্দ্রপ্রস্থের সেই রাজসভা যেন কোনো মর্ত্যের সৃষ্টি নয়, বরং স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক মায়া। মহাস্থপতি ময়া-দানব যখন এটি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি বোধহয় তাঁর সমস্ত জাদুকরী প্রতিভা ঢেলে দিয়েছিলেন এই প্রাসাদে। স্ফটিকের মেঝেগুলো এতই স্বচ্ছ যে মনে হয় শান্ত সরোবর; আবার আসল জলাধারগুলো এমন পালিশ করা মার্বেলের মতো দেখায় যে ভ্রম হয়। মণিমুক্তো খচিত স্তম্ভগুলোর উজ্জ্বলতায় প্রদীপের আলো ছাড়াই গোটা কক্ষটি সর্বদা উদ্ভাসিত হয়ে থাকত। রাজা, ঋষি কিংবা দূরদেশ থেকে আসা বীর যোদ্ধারা যখন সেই সভায় প্রবেশ করতেন, বিস্ময়ে তাঁদের বাক্য সরে যেত না।
এমনই এক শান্ত ও দীপ্তিময় দুপুরে সেখানে পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। পাঁচ পাণ্ডব তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা জানালেন। যুধিষ্ঠির নিজে ঋষির চরণ প্রক্ষালন করে তাঁকে উপযুক্ত আসনে বসালেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, বিনয়ে অবনত হয়ে যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন—
"হে বরেণ্য মহর্ষি, আপনি ত্রিলোকচারী। দেবলোক থেকে শুরু করে ঋষি ও রাজাদের সমস্ত সভা আপনার দেখা। সত্যি করে বলুন তো প্রভু, আমাদের এই সভার মতো ঐশ্বর্য আর কোথাও কি আছে? আপনার চোখে এই সভা কেমন লাগে?"
নারদ মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে একবার গোটা সভাটি দেখে নিয়ে বললেন, "হে ধর্মপুত্র, তোমার এই সভা সত্যিই অপূর্ব। এর শ্রী এবং রাজকীয় গরিমা অতুলনীয়। তবে আমি যম, কুবের, ইন্দ্র, ব্রহ্মা আর বরুণের দিব্য সভাগুলোও দেখেছি। তাদের প্রত্যেকের মহিমা আলাদা, প্রত্যেকের রূপ ভিন্ন।"
নারদের মুখে স্বর্গের সেই সভাগুলোর বর্ণনা শোনার জন্য পাণ্ডবরা উৎসুক হয়ে তাঁর চারপাশে ঘিরে বসলেন, যেন গুরুকে ঘিরে থাকা একদল মনোযোগী শিষ্য। নারদ বর্ণনা করলেন বরুণের নীল আভার জলমগ্ন সভা, যেখানে নাগ আর দৈত্যরা শান্তিতে বাস করে। শোনালেন ব্রহ্মার সেই পরমাত্মিক সভার কথা, যেখানে বেদমন্ত্রের গুঞ্জনে আকাশ বাতাস পবিত্র হয়ে থাকে। ইন্দ্রের সভায় গন্ধর্বদের গান আর অপ্সরাদের নৃত্যের যে মায়াজাল তৈরি হয়, তার বর্ণনা শুনে পাণ্ডবরা বিমোহিত হয়ে পড়লেন।
তবে যুধিষ্ঠিরের মনে একটি প্রশ্ন বিঁধে ছিল। তিনি করজোড়ে জিজ্ঞেস করলেন, "প্রভু, আপনি বললেন ইন্দ্রের সভায় রাজর্ষিদের মধ্যে কেবল রাজা হরিশচন্দ্রই স্থান পেয়েছেন। এমন কী পুণ্য বা তপস্যা করেছিলেন তিনি? আর আমার পিতা পাণ্ডু—পিতৃলোকে তিনি কেমন আছেন? আমাদের জন্য কি কোনো বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি?"
নারদ শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, রাজা হরিশচন্দ্র ছিলেন পরম সত্যবাদী আর অজেয় সম্রাট। তিনি রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁর অঢেল দান আর বীরত্ব তাঁকে ইন্দ্রের সভায় স্থান করে দিয়েছে। আর তোমার পিতা... তাঁকে আমি দেখেছি। তিনি হরিশচন্দ্রের এই সম্মান দেখে চমৎকৃত হয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন— 'তুমি মর্ত্যে গিয়ে আমার পুত্রদের বলো, তারা যেন আমার কল্যাণের জন্য রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করে। যুধিষ্ঠির যদি এই যজ্ঞ পূর্ণ করতে পারে, তবে আমিও পূর্বপুরুষদের সঙ্গে ইন্দ্রের সভায় চিরস্থায়ী স্থান লাভ করব'।"
নারদের কণ্ঠস্বর এবার গম্ভীর হলো। তিনি সতর্ক করে বললেন, "কিন্তু মনে রেখো, রাজসূয় যজ্ঞ সহজ সাধ্য নয়। এমন মহৎ কাজে সহস্র বিঘ্ন আসে। অসুর আর অশুভ শক্তিরা এই যজ্ঞ নষ্ট করার সুযোগ খোঁজে। তাই তোমাকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। প্রজাদের ন্যায়বিচার দিয়ে শাসন করো, ব্রাহ্মণ আর আর্তদের সন্তুষ্ট রাখো। একজন ন্যায়পরায়ণ রাজাই ইহকালে যশ আর পরকালে স্বর্গ লাভ করেন।"
উপদেশ শেষে নারদ দ্বারকার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন। সভাঘরে কিছুক্ষণ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করল। পাণ্ডুরা পাঁচ ভাই তখনো যেন সেই স্বর্গীয় বার্তার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না।
অবশেষে যুধিষ্ঠির তাঁর অনুজদের দিকে তাকালেন। ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেবের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, "মহর্ষি নারদের এই বার্তা আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। এখন আমাদের একটাই লক্ষ্য— রাজসূয় যজ্ঞের প্রস্তুতি নেওয়া।"
ইন্দ্রপ্রস্থের সেই মায়াবী সভায় সেদিন এক মহৎ সংকল্পের বীজ বপন হলো, যা অদূর ভবিষ্যতে গোটা ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে দিতে চলেছিল।

Comments
Post a Comment