রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প ও কৃষ্ণের আগমন


রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প ও কৃষ্ণের আগমন

নারদ বিদায় নিয়েছেন অনেকক্ষণ, কিন্তু তাঁর কথাগুলো তখনও যুধিষ্ঠিরের কানে গুঞ্জরিত হচ্ছিল। রাজসূয় যজ্ঞ। এক বিশাল আয়োজন, এক কঠিন সংকল্প। যুধিষ্ঠির একা বসে ভাবছিলেন। এই যজ্ঞ কেবল ক্ষমতার আস্ফালন নয়, এ হলো ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তিনি কি সত্যিই এর যোগ্য? যে যজ্ঞের শেষে একজন রাজা সমগ্র আর্যাবর্তের অধীশ্বর হিসেবে স্বীকৃত হন, তার ভার বহন করার শক্তি কি তাঁর আছে?

ইন্দ্রপ্রস্থ তখন যৌবনের দীপ্তিতে ভাস্বর। সেখানে অন্যায় নেই, হাহাকার নেই। প্রজারা রাজাকে ভালোবেসে কর দেয়, ভয়ে নয়। প্রকৃতিও যেন যুধিষ্ঠিরের ন্যায়ের শাসনে তুষ্ট। ঠিক সময়ে বৃষ্টি নামে, মাঠ ভরে ওঠে সোনার ফসলে, আর গোয়ালে বাড়ে গাভীর সংখ্যা। দারিদ্র্য শব্দটা ইন্দ্রপ্রস্থের অভিধান থেকে মুছে গেছে বললেই চলে।

পাঁচ ভাই যেন এক হাতের পাঁচটি আঙুল। ভীম রাজ্যের সীমানা আগলে রেখেছেন যমের মতো, কার সাধ্য সেই গণ্ডি পেরোয়? অর্জুন নতুন নতুন দিব্যাস্ত্র আর বীরত্বে ইন্দ্রপ্রস্থের যশকে নিয়ে গেছেন দিগন্তের ওপারে। সহদেব সুক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি দিয়ে আগলে রাখেন রাজ্যের ধর্ম আর নিয়ম-কানুন, আর নকুলের বিনয় আর অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ আপামর প্রজাসাধারণ।

একদিন রাজসভায় আলোচনার ডাক দিলেন যুধিষ্ঠির। ভাইরা, মন্ত্রীরা আর ঋষিরা সবাই উপস্থিত। রাজসূয় যজ্ঞের প্রস্তাব উঠতেই চারদিক থেকে সায় এল। মন্ত্রীরা বললেন, "মহারাজ, আপনার প্রতাপ এখন গগনচুম্বী। আপনিই পারেন এই যজ্ঞ সম্পন্ন করে পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট হতে।" পাণ্ডব ভাইয়েরাও তাতে সানন্দে সম্মতি দিলেন।

কিন্তু যুধিষ্ঠির শান্ত। সবার কথা শুনেও তাঁর মনের সংশয় পুরোপুরি কাটল না। তিনি ধীরস্বরে বললেন, "তোমাদের সবার কথা শিরোধার্য। কিন্তু একজন মানুষের পরামর্শ ছাড়া আমি এক পা-ও এগোতে চাই না। তিনি পরম বিজ্ঞ, তিনি বিপদের পরম বন্ধু। আমি কৃষ্ণের কথা বলছি। দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ অনুমোদন না দিলে এই যজ্ঞে নামা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"

তৎক্ষণাৎ দ্রুতগামী দূত চলল দ্বারকায়। সংবাদ পেয়েই কৃষ্ণ বুঝলেন, সময় সমাগত। তিনি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে রথে চেপে রওনা হলেন ইন্দ্রপ্রস্থের উদ্দেশ্যে।

কৃষ্ণ যখন পৌঁছালেন, ইন্দ্রপ্রস্থে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল। যুধিষ্ঠির আর ভীম তাঁকে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালেন। কৃষ্ণ প্রথমে দেখা করলেন পিসি কুন্তীর সঙ্গে। কুন্তীর কাছে কৃষ্ণ কেবল যদুপতি নন, তিনি তাঁর নিজের সন্তানের মতোই আদরের। পরম মমতায় তিনি কৃষ্ণকে বুকে টেনে নিলেন।

কয়েকটা দিন কাটল হাসি-গল্পে আর আত্মীয়তায়। তারপর একদিন নিভৃতে কৃষ্ণকে পেলেন যুধিষ্ঠির। দুহাত জোড় করে অত্যন্ত বিনম্র স্বরে বললেন, "কৃষ্ণ, তুমি তো সব জানো। আমার মনে রাজসূয় যজ্ঞের ইচ্ছা জেগেছে। সুহৃদরা সবাই বলছে আমি যোগ্য। কিন্তু আমার মন বলছে, চূড়ান্ত কথাটি আসবে তোমার মুখ থেকে। বল সখা, আমি কি সত্যিই এই মহৎ যজ্ঞের স্পর্ধা রাখতে পারি? তুমি যদি অনুমতি দাও, তবেই আমি এগোব। আমার সবটুকু নির্ভরতা আজ তোমারই ওপর।"

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া