মগধ-মদমর্দন: রাজসূয় যজ্ঞের অন্তরায় ও জরাসন্ধ-বধের সংকল্প
মগধ-মদমর্দন: রাজসূয় যজ্ঞের অন্তরায় ও জরাসন্ধ-বধের সংকল্প
ইন্দ্রপ্রস্থের সেই মায়াসভায় তখন শরতের শান্ত বিকেল নেমে এসেছে। পাণ্ডবদের প্রতাপ এখন দিগ্বিদিক প্রসারিত, কিন্তু ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনে এক গভীর সংশয়। সেই সংশয় নিরসনের জন্যই যদুকুলতিলক শ্রীকৃষ্ণের আগমন। মথুরা থেকে দূত পাঠিয়ে তাঁকে আনিয়েছেন যুধিষ্ঠির। কৃষ্ণের রথ যখন ইন্দ্রপ্রস্থের সিংহদুয়ারে পৌঁছাল, তখন শঙ্খধ্বনি আর তূর্যনিনাদে আকাশ-বাতাস মুখরিত। সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় ‘মাধব’কে দু’চোখ ভরে দেখার জন্য পথে ভেঙে পড়ল।
কৃষ্ণকে পেয়ে পাণ্ডবদের আনন্দ আর ধরে না। যুধিষ্ঠির পরম শ্রদ্ধায় তাঁর পা ধুইয়ে দিলেন, ভাইরা তাঁকে আলিঙ্গন করলেন নিবিড় প্রেমে। কয়েকটা দিন যেন উৎসবের আমেজে কেটে গেল রাজপ্রাসাদে।
একদিন রাজকার্য শেষে যখন সভাঘর নির্জন হয়েছে, যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের পাশে এসে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ। ধীর স্বরে তিনি বললেন, "মাধব, তোমার কৃপায় আজ আমাদের এই ঐশ্বর্য। মহর্ষি নারদ আমাকে রাজসূয় যজ্ঞ করার পরামর্শ দিয়েছেন। আমার ভাইরা উন্মুখ, প্রজারাও খুশি। কিন্তু তোমার সম্মতি ছাড়া আমি এক পা-ও এগোতে চাই না। তুমি বলো, এই যজ্ঞ করা কি আমার পক্ষে সঙ্গত হবে?"
কৃষ্ণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের সেই চিরচেনা স্মিত হাসিটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। এক গম্ভীর প্রশান্তি নেমে এল তাঁর মুখে। যেন সারা বিশ্ব চরাচর সেই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
এরপর কৃষ্ণ অতি মন্থর স্বরে বলতে শুরু করলেন, "ধর্মপুত্র, তোমার বাসনা ন্যায়সঙ্গত। একজন সার্বভৌম সম্রাটের সব গুণই তোমার মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু রাজসূয় যজ্ঞের পথে এক মস্ত বড় বাধা দাঁড়িয়ে আছে।"
যুধিষ্ঠির উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কে সেই বাধা?"
কৃষ্ণের উত্তর এল ক্ষুরধার অস্ত্রের মতো— "মগধরাজ জরাসন্ধ।"
জরাসন্ধের নাম শুনতেই সভায় উপস্থিত বীরদের চোখেমুখে একটা অস্বস্তির ছায়া পড়ল। জরাসন্ধ মানেই এক আতঙ্কের নাম, এক অপরাজেয় শক্তি। যুধিষ্ঠির বিনীতভাবে জানতে চাইলেন জরাসন্ধের সেই অজেয় হওয়ার কাহিনী।
কৃষ্ণ বলতে শুরু করলেন এক অদ্ভুত ও রোমহর্ষক আখ্যান:
"অনেক কাল আগে মগধে বৃহদ্রথ নামে এক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। ধন-সম্পদ, বীরত্ব— সব থাকলেও তাঁর মনে ছিল এক গভীর ক্ষত। কোনো সন্তান ছিল না তাঁর। সেই দুঃখ ঘোচাতে তিনি ঋষি চণ্ডকৌশিকের সেবা করেন। ঋষি খুশি হয়ে তাঁকে একটি দিব্য আম ফল দেন। কিন্তু বৃহদ্রথের দুই রানি, দুজনেই কাশীরাজের কন্যা। রাজা কাউকে ছোট করতে পারলেন না। তিনি ফলটিকে সমান দু’ভাগে কেটে দুই রানিকে খাওয়ালেন।"
পাণ্ডবরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন।
"সময় হলে দুই রানিই সন্তান প্রসব করলেন। কিন্তু সে কী বিভৎস দৃশ্য! পূর্ণাঙ্গ শিশু নয়, প্রত্যেকে জন্ম দিলেন একটি শিশুর অর্ধেক অংশ। আতঙ্কে ও ঘৃণায় দাসীরা সেই মাংসপিণ্ড দুটি কাপড়ে জড়িয়ে বনের মধ্যে ফেলে দিয়ে এল।"
কৃষ্ণ বলে চললেন, "সেই বনে জরা নামে এক রাক্ষসী থাকত। সে মাংসপিণ্ড দুটি কুড়িয়ে নিয়ে কৌতূহলবশত পাশাপাশি জুড়ল। আর অলৌকিকভাবে সেই দুই খণ্ড মিলে গিয়ে এক জীবন্ত শিশুর রূপ নিল। শিশুটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। রাক্ষসী মায়াগ্রস্ত হয়ে সেই শিশুকে রাজা বৃহদ্রথের হাতে তুলে দিল। জরা রাক্ষসী তাকে সন্ধান (যুক্ত) করেছিল বলেই তার নাম হলো জরাসন্ধ।"
একটু থেমে কৃষ্ণ আবার বললেন, "সেই জরাসন্ধ এখন মদমত্ত। সে অসংখ্য রাজাকে বন্দি করে পাহাড়ের গুহায় দাসের মতো আটকে রেখেছে। তার দাপটে শিশুপাল, ভগদত্তের মতো বীররাও আজ নতজানু। এমনকি আমার শ্বশুর ভীষ্মকও তার প্রভাবে থরথর করে কাঁপেন।"
"মনে রেখো যুধিষ্ঠির, কংসকে বধ করার পর জরাসন্ধের আক্রোশ আমার ওপর কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সে সতেরো বার মথুরা আক্রমণ করেছে। আমি প্রতিবার তাকে পরাজিত করেছি ঠিকই, কিন্তু সে বারবার ফিরে এসেছে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে। সে এখন সেই বন্দি রাজাদের বলি দিয়ে এক পৈশাচিক যজ্ঞের আয়োজন করছে। তাকে বিনাশ না করলে তোমার রাজসূয় যজ্ঞ সফল হবে না।"
যুধিষ্ঠির বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য ভাইদের বিপদে ফেলতে চাইলেন না। কিন্তু বৃকোদর ভীম গর্জ উঠে বললেন, "দাদা, ক্ষত্রিয় হয়ে কেন ভয় পাচ্ছেন? জরাসন্ধের মতো অত্যাচারীকে বিনাশ করা তো আমাদের ধর্ম!" অর্জুনও তাঁর গাণ্ডীবে টঙ্কার দিয়ে জানালেন, কৃষ্ণের পরামর্শ আর ভীমের শক্তি থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
কৃষ্ণ তাঁর পরিকল্পনা জানালেন— "সম্মুখ যুদ্ধে জরাসন্ধকে হারানো কঠিন, কারণ তার সেনাবল অপরিসীম। তাই আমি, ভীম আর অর্জুন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মগধের গিরিব্রজপুরে যাব। জরাসন্ধ মল্লযুদ্ধে আহ্বান করলে কখনও ফিরিয়ে দেয় না। আর ভীম ছাড়া এই পৃথিবীতে তাকে মারার ক্ষমতা আর কারোর নেই।"
সবশেষে যুধিষ্ঠির সম্মতি দিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থের আকাশ তখন এক নতুন যুদ্ধের পদধ্বনিতে কাঁপছে। বন্দি রাজাদের মুক্তি আর রাজসূয় যজ্ঞের পথ প্রশস্ত করতে কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন যাত্রা করলেন মগধের উদ্দেশ্যে— এক ভয়ংকর কিন্তু অনিবার্য পরিণতির দিকে।

Comments
Post a Comment