রাজসূয়ের আহ্বানে চার দিক জয়— পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের মহাকাব্য
রাজসূয়ের আহ্বানে চার দিক জয়— পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের মহাকাব্য
ময়দানব নির্মিত অপূর্ব সভায় তখন প্রতিদিন রাজা-মহারাজা, ঋষি-মুনি, দূরদেশের দূতদের আসা-যাওয়া। ইন্দ্রপ্রস্থ যেন ধীরে ধীরে পৃথিবীর মধ্যমণি হয়ে উঠছে। রাজা যুধিষ্ঠিরের শাসনে প্রজারা সুখী, পথেঘাটে চুরি নেই, কৃষকের গোলা ভরা ধান, ব্যবসায়ীদের নৌকা সোনা-রুপো বোঝাই করে নদীপথে চলেছে।
কিন্তু রাজসূয় যজ্ঞের আগে একটি বড় কর্তব্য বাকি ছিল। পৃথিবীর রাজারা যদি যুধিষ্ঠিরকে সম্রাট বলে স্বীকার না করেন, তবে সেই যজ্ঞ পূর্ণ মর্যাদা পাবে না।
একদিন সকালে সভা শেষ হলে অর্জুন ধীরে ধীরে যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সেই অদম্য দীপ্তি, যা যুদ্ধের আগুন জ্বালায়।
অর্জুন বলল,
— “ভ্রাতা, যদি আপনি অনুমতি দেন, তবে আমরা দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়ি। পৃথিবীর রাজাদের জয় করে, তাঁদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে আমরা ফিরে আসব। তখন সমগ্র ভূখণ্ড আপনাকে সম্রাট বলে মেনে নেবে।”
যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তিনি ভাইদের মুখের দিকে তাকালেন। ভীমের চোখে উচ্ছ্বাস, নকুল-সহদেব স্থির, আর অর্জুন যেন প্রস্তুত বজ্রের মতো।
তারপর যুধিষ্ঠির মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি জানি, তোমরা চারজনই দিগ্বিজয় করতে সক্ষম। যাও, ধর্ম রক্ষা করে বিজয় লাভ করো।”
সিদ্ধান্ত হল— চার ভাই চারদিকে যাবেন।
অর্জুন উত্তরে,
ভীম পূর্বদিকে,
সহদেব দক্ষিণে,
আর নকুল পশ্চিমে।
অর্জুন উত্তরের পথে যাত্রা করলেন। তার সঙ্গে বিশাল সেনাবাহিনী, অসংখ্য রথ, অশ্ব ও হাতি। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে তিনি প্রথমে অনর্ত, কালকূট ও কুলিন্দ রাজ্য জয় করলেন। অধিকাংশ রাজাই অর্জুনের বীরত্বের কথা শুনে যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করল।
তারপর তিনি সুমণ্ডলের সহায়তায় শাকলদ্বীপ ও প্রতিবিন্ধ্যের রাজাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন। শাকলদ্বীপের রাজা ছিলেন ভয়ংকর যোদ্ধা। সাত দ্বীপের রাজাদের মধ্যে তার শক্তির খ্যাতি সুদূর প্রসারিত। বহুদিন ধরে যুদ্ধ চলল। আকাশ তীরের শব্দে অন্ধকার হয়ে উঠত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্জুনের গাণ্ডীবের সামনে তাকে মাথা নত করতেই হল।
সেই রাজাদের সঙ্গে নিয়ে অর্জুন এগোলেন প্রাগ্জ্যোতিষপুরের দিকে। সেখানে রাজত্ব করতেন মহাবীর ভগদত্ত। তাঁর সঙ্গে ছিল কিরাত, চিন ও সমুদ্রপথের বহু শক্তিশালী রাজা।
আট দিন ধরে ভয়ংকর যুদ্ধ চলল। কখনও হাতির পিঠে, কখনও রথে, কখনও মাটিতে নেমে যুদ্ধ। ভগদত্তের বিশাল হাতি সেনা দেখে অনেক যোদ্ধাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অর্জুনের তীরবৃষ্টি যেন ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছিল।
অষ্টম দিনের শেষে ভগদত্ত যুদ্ধ থামিয়ে বললেন,
— “পার্থ, তোমার শক্তি সত্যিই অসাধারণ। তুমি দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র— আজ আমি তা বুঝতে পারলাম। ইন্দ্রের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আছে। আমি আর যুদ্ধ করতে চাই না। বলো, তোমার কী ইচ্ছা?”
অর্জুন বিনীত স্বরে বললেন,
— “ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করতে চান। তিনি যেন সমগ্র পৃথিবীর সম্রাট হিসেবে স্বীকৃত হন— এই আমার কামনা। আপনি কর প্রদান করে তাঁকে সেই মর্যাদা দিন। কিন্তু আপনাকে আমি আদেশ করার সাহস করি না। আপনি ইন্দ্রের বন্ধু, আমাদেরও শুভাকাঙ্ক্ষী। বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবেই এই অনুরোধ করছি।”
ভগদত্ত হেসে বললেন,
— “যুধিষ্ঠিরের মঙ্গল আমিও চাই। আমি কর দেব। আরও কিছু চাইলে বলো।”
এরপর অর্জুন উত্তরের আরও দুর্গম অঞ্চলে প্রবেশ করলেন। কুবেরের রক্ষিত ভূখণ্ডের আশপাশও তিনি জয় করলেন। উলুক দেশের রাজা প্রবল যুদ্ধ করলেন, কিন্তু শেষে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন। অর্জুন তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন। সেই রাজাকেই সঙ্গে নিয়ে তিনি সেনাবিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন এবং তাকে পরাজিত করলেন।
তারপর একে একে মোদাপুর, বামদেব, সুদামা, সুশঙ্কুল, উত্তর উলুক— সব রাজ্যই অর্জুনের অধীন হল। তিনি পৌরব রাজাকে পরাজিত করলেন, পর্বতবাসী সাত জাতির আক্রমণকারী যোদ্ধাদের দমন করলেন। কাশ্মীরের ক্ষত্রিয় বীরেরা এবং দশমণ্ডলের প্রধান রাজা লোহিতও অর্জুনের অধীনতা স্বীকার করলেন। ত্রিগর্ত, দারু ও কোকনের রাজারা যুদ্ধ না করেই বশ্যতা মেনে নিল।
ক্রমে অর্জুন পৌঁছালেন কিম্পুরুষবর্ষে। সেখানে ড্রুমপুত্র নামে এক সম্রাট ছিলেন। তাঁকেও পরাজিত করে অর্জুন হাটক রাজ্যের দিকে অগ্রসর হলেন। তারপর মানসসরোবরের তীরে এসে তিনি কিছুদিন অবস্থান করলেন।
সেই পবিত্র স্থানে বহু ঋষির আশ্রম ছিল। যুদ্ধের মধ্যে থেকেও অর্জুন সেখানে শান্তি অনুভব করলেন। ঋষিরা তাঁকে আশীর্বাদ করলেন।
এরপর তিনি উত্তর দিকে হরিবর্ষ জয় করতে গেলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছতেই প্রবলদেহী এক দ্বাররক্ষক এসে দাঁড়াল।
সে বলল,
— “তুমি সাধারণ মানুষ নও। এখানে পৌঁছতে পারাই অসম্ভব। তুমি নিশ্চয়ই মহাবীর। এখানে এসে তুমি জয়ী হয়েছ। বলো, তুমি কী চাও?”
অর্জুন বললেন,
— “আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করতে চান। তাঁকে পৃথিবীর সম্রাট হিসেবে স্বীকার করে তোমরা কর প্রদান করো।”
হরিবর্ষের মানুষ আনন্দের সঙ্গে রত্ন, মণিমুক্তা, স্বর্ণালঙ্কার ও অমূল্য ধনসম্পদ এনে দিল।
উত্তর দিক জয় করে অবশেষে অর্জুন ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। অসংখ্য ধনরত্ন যুধিষ্ঠিরের পায়ের কাছে সমর্পণ করে তিনি বিশ্রামের জন্য অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন।
এদিকে ভীমও যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে পূর্বদিকে বেরিয়ে পড়েছিলেন।
দশার্ণ দেশের রাজা সুধর্মা ছিলেন মহাবলশালী। তিনি ভীমকে দেখে বললেন,
— “অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, এসো বাহুযুদ্ধ হোক।”
দুজনের মল্লযুদ্ধ শুরু হল। যেন দুটি পর্বত একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভীম সুধর্মাকে পরাস্ত করলেন। কিন্তু সুধর্মা রাগ করলেন না। বরং ভীমের শক্তি ও বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে বললেন,
— “আজ থেকে আমি তোমার অনুগত।”
তিনি ভীমের সেনাপতি হিসেবেও যোগ দিলেন।
তারপর ভীম অশ্বমেধ, পুলিন্দনগর ও আরও বহু রাজ্য জয় করলেন। চেদিরাজ শিশুপালের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হল না, কারণ তিনি আত্মীয় ছিলেন। শিশুপাল স্বেচ্ছায় কর দিতে রাজি হলেন।
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু দেশ ভীমের অধীনে এল। বিজয় সমাপ্ত করে তিনি বিপুল ধনরত্ন নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন এবং সব যুধিষ্ঠিরের হাতে তুলে দিলেন।
সহদেব দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলেন। তিনি মৎস্যদেশ, মথুরা ও আরও বহু রাজ্য জয় করলেন। দক্ষিণের রাজারা তাঁর বুদ্ধি ও শৌর্যে মুগ্ধ হয়ে কর প্রদান করল।
নকুল পশ্চিম দিকে গিয়ে অসংখ্য রাজাকে পরাজিত করলেন। পশ্চিমের মরুভূমি, সিন্ধুর তীর, দূর সমুদ্রপথের বণিকরাজ্য— সব জায়গা থেকেই তিনি কর সংগ্রহ করলেন।
অবশেষে সহদেব ও নকুলও ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। তাঁরা যে বিপুল ধনসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন, তা যুধিষ্ঠিরের ভাণ্ডার পূর্ণ করে দিল।
তখন ইন্দ্রপ্রস্থের ধনভাণ্ডার যেন কুবেরের ভাণ্ডারের সমান হয়ে উঠল। পৃথিবীর চার দিকের রাজারা যুধিষ্ঠিরকে সম্রাট বলে মেনে নিয়েছে।
এখন আর রাজসূয় যজ্ঞের পথে কোনও বাধা রইল না।

Comments
Post a Comment