মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি
মহাভারতের সভা পর্বের শুরু
সনাতন ধর্মে কোনো পবিত্র শাস্ত্র (যেমন মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবত) পাঠ করার আগে নিচের এই মঙ্গলচরণটি পাঠ করা হয় যাতে পাঠ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং জ্ঞান লাভ করা যায়।
শ্লোক: নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্ ।
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ ॥
বঙ্গানুবাদ:
নারায়ণ, নরোত্তম নর (অর্জুন বা ঋষি নর), দেবী সরস্বতী এবং মহর্ষি ব্যাসদেবকে নমস্কার জানিয়ে তারপর 'জয়' (মহাভারত বা শাস্ত্র পাঠ) উচ্চারণ করা উচিত।
শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা
নারায়ণং নমস্কৃত্য: ভগবান শ্রীনারায়ণকে প্রণাম জানিয়ে।
নরং চৈব নরোত্তমম্: মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যিনি অর্থাৎ 'নর' (ভগবানের অবতার বিশেষ বা অর্জুন)।
দেবীং সরস্বতীং: বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীকে।
ব্যাসং: এই শাস্ত্রের রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে।
ততো জয়মুদীরয়েৎ: তারপর 'জয়' নামক গ্রন্থ (মহাভারত, পুরাণ বা ভাগবত) পাঠ শুরু করা কর্তব্য।
মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি
খাণ্ডবদহনের সেই লেলিহান শিখা তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। অরণ্যের দাহনশেষে চারপাশ এক গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সেই ভস্মস্তূপের মাঝখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে এলেন দানবস্থপতি ময়। অর্জুনের বীরত্বে যমদুয়ার থেকে ফিরে আসা এই শিল্পী কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত।
ময় দানব একদিন হাতজোড় করে অর্জুনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিনীত স্বরে বললেন, "হে অর্জুন, আপনি আমার প্রাণদাতা। এই অধম আপনার চরণে সেবা নিবেদন করতে চায়। আদেশ করুন, আমি আপনার কোন প্রিয় কাজ সাধন করতে পারি?"
অর্জুন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, "আমি তো প্রতিদানের আশায় তোমাকে রক্ষা করিনি, ময়। বিপন্নকে রক্ষা করাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। আমি তোমার কাছে কিছুই চাই না।"
কিন্তু ময় দানব নাছোড়। শিল্পীর আত্মা ঋণী থাকতে জানে না। তিনি বললেন, "আপনার এই ঔদার্য মহৎ, কিন্তু আমি অকৃতজ্ঞ হয়ে থাকতে পারব না। অন্তত আমাকে কিছু দান করার সুযোগ দিন।"
অর্জুন কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, "তোমার যদি সেবা করার একান্তই ইচ্ছে থাকে, তবে তুমি কৃষ্ণের কাছে যাও। তাঁর যদি কোনো অভিলাষ থাকে, তবে তা পূর্ণ করো।"
কৃষ্ণের চরণে প্রণত হয়ে ময় দানব বললেন, "প্রভু, আপনার আর অর্জুনের কৃপায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি। ত্রিভুবনে স্থপতি হিসেবে আমার সামান্য খ্যাতি আছে। আমায় কোনো কাজের আদেশ দিন।"
কৃষ্ণ কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইলেন। তাঁর সেই রহস্যময় চোখের দৃষ্টি যেন সুদূর ভবিষ্যতে নিবদ্ধ। তারপর শান্ত গলায় বললেন, "ময়, তুমি যদি সত্যিই কিছু করতে চাও, তবে ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের জন্য এক অপূর্ব সভাভবন নির্মাণ করো। এমন এক সভাগৃহ, যার তুলনা এই মর্ত্যে কেন, ত্রিভুবনের কোথাও মিলবে না। তার কারুকার্য যেন মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়।"
ময় দানবের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "তথাস্তু!"
যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন ইন্দ্রপ্রস্থে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পরম সমাদরে ময় দানবকে অভ্যর্থনা জানালেন। ময়ের মুখে দানবদের প্রাচীন বীরগাথা আর স্থাপত্যের কাহিনী শুনতে শুনতে যুধিষ্ঠির মুগ্ধ হলেন। সভাভবন তৈরির জন্য দশ হাজার হাত বিস্তৃত এক বিশাল ভূমি নির্বাচন করা হলো।
সেখানে যখন মহতী নির্মাণযজ্ঞের প্রস্তুতি চলছে, তখন কৃষ্ণের মনে এক অন্য সুর বেজে উঠল। অনেকদিন হলো তিনি দ্বারকাছাড়া। পিতা বসুদেব আর মাতা দেবকীর মুখখানি তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ঘরে ফেরার এক তীব্র আকুলতা তাঁকে স্পর্শ করল। তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায় প্রার্থনা করলেন।
যাত্রার দিন স্থির হলো। প্রভাতসূর্যের মতো দীপ্তিময় রথে কৃষ্ণের সারথি দারুক প্রস্তুত। যাত্রার আগে কৃষ্ণ পিসি কুন্তীর চরণস্পর্শ করে আশীর্বাদ নিলেন। বিদায় জানালেন বোন সুভদ্রা, দ্রৌপদী আর কুলপুরোহিতকে। বিদায়বেলায় প্রত্যেকের চোখ সজল হয়ে উঠল, যেন হৃদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিঁড়ে যাচ্ছে।
কৃষ্ণ রথে আরোহণ করলেন। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে স্বয়ং যুধিষ্ঠির লাগাম ধরলেন। অর্জুনও রথে উঠে বসলেন— প্রিয় সখাকে আরও কিছুক্ষণ সঙ্গ দেওয়ার অছিলায়। পিছনে চললেন ভীম, নকুল আর সহদেব।
বেশ কিছুটা পথ তাঁরা নীরবে অতিক্রম করলেন। সম্পর্কের এই নিবিড়তায় শব্দ তখন গৌণ। অবশেষে কৃষ্ণ বললেন, "ভ্রাতঃ, এবার তোমাদের ফেরার সময় হয়েছে।"
অগত্যা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পাণ্ডবরা রথ থেকে নামলেন। ধুলো উড়িয়ে কৃষ্ণের রথ দ্বারকার পথে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।
দ্বারকায় কৃষ্ণ পৌঁছাতেই আনন্দোৎসব শুরু হয়ে গেল। উগ্রসেন এবং যাদবকুল তাঁদের প্রিয় কৃষ্ণকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত। কৃষ্ণ প্রথমে পিতা-মাতার চরণে প্রণতি জানালেন, তারপর বড় ভাই বলরামকে আলিঙ্গন করলেন। পুত্র শাম্ব ও প্রদ্যুম্নদের স্নেহাশীষ দিয়ে তিনি প্রবেশ করলেন মহিষী রুক্মিণীর প্রাসাদে।
এদিকে ইন্দ্রপ্রস্থে মায়ার জাদুকরী স্পর্শে গড়ে উঠতে লাগল সেই মায়াসভা, যা একদিন পৃথিবীর ইতিহাসে বিস্ময় আর বিবাদের এক অদ্ভুত আখ্যান হয়ে থাকবে। আর কৃষ্ণ ফিরে গেলেন তাঁর আপন আলয়ে, যেখানে স্নেহ আর ভালোবাসার নীড় তাঁর অপেক্ষায় ছিল।

Comments
Post a Comment