নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যা

 


নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যায়" 

পাঞ্চালীর পরিণয়: এক অলৌকিক নিয়তি

সিদ্ধান্তটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ঠেকলেও তার ভেতরে কোনো চপলতা ছিল না। বারণাবতের জতুগৃহ থেকে ফেরার পর পাণ্ডবদের জীবনে এই মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে জটিল। জ্ঞানবৃদ্ধরা দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে রায় দিলেন—দ্রৌপদীর এই পঞ্চভর্তৃক বিবাহ ধর্মবিরুদ্ধ নয়। বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দেবাদিদেব শিবের অমোঘ বর। নিয়তি অনেক আগেই এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল, দ্রুপদ-কন্যা কেবল তার বাস্তবায়ন করছেন মাত্র।

এমন এক সন্ধিক্ষণে স্বয়ং মহর্ষি ব্যাসদেব এসে উপস্থিত হলেন রাজা দ্রুপদের রাজসভায়। তাঁর চোখেমুখে অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি। যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তিনি বললেন, "বৎস যুধিষ্ঠির, আজকের দিনটি অত্যন্ত শুভ। চন্দ্রে এখন পুষ্য়া নক্ষত্রের অবস্থান। লগ্ন বয়ে যাওয়ার আগে আজই বিবাহ সুসম্পন্ন হওয়া উচিত।"

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মস্তক অবনত করে সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন। মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চাল রাজপ্রাসাদে যেন এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। রাজা দ্রুপদ আর ধৃষ্টদ্যুম্ন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতে লাগলেন। সুগন্ধি ধূপ আর রাজকীয় আয়োজনে সেজে উঠল অন্তপুর।

বিবাহের মণ্ডপে

দ্রৌপদীকে স্নান করিয়ে সাজানো হলো মহামূল্যবান পট্টবস্ত্র আর অলঙ্কারে। সখী পরিবেষ্টিত হয়ে যখন তিনি বিবাহ মণ্ডপে এসে দাঁড়ালেন, মনে হচ্ছিল আগুনের এক জীবন্ত শিখা মর্ত্যে নেমে এসেছে। সভাসদ আর মন্ত্রীদের চোখে তখন বিস্ময় আর সম্ভ্রম।

অন্যদিকে পাঁচ পাণ্ডব ভ্রাতাও শাস্ত্রীয় স্নান শেষ করে রাজবেশে সজ্জিত হলেন। পুরোহিত ধৌম্যের নির্দেশে তাঁরা ধীর পদক্ষেপে মণ্ডপে প্রবেশ করলেন। যজ্ঞকুণ্ডের আগুন তখন ধিকিধিকি জ্বলছে।

 প্রথম বিবাহ : বৈদিক রীতি মেনে প্রথমে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীর পরিণয় সম্পন্ন হলো। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে তাঁরা সাতটি পবিত্র পদক্ষেপ ফেললেন।

 পরবর্তী বিবাহ গুলি: ঠিক একইভাবে, নিখুঁত আচার মেনে একে একে ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেবও কৃষ্ণা’র পাণিগ্রহণ করলেন।

রাজা দ্রুপদ দুহাত উজাড় করে জামাতাদের যৌতুক দিলেন—স্বর্ণালঙ্কার, রত্নরাজি, সজ্জিত অশ্ব আর হস্তী বাহিনী। সাথে ছিল প্রত্যেক জামাতাদের জন্য এক শত করে পরিচারিকাদের  বিশাল দল। পাঞ্চাল রাজ্যে এক নতুন আনন্দের জোয়ার এল।

কুন্তীর আশীর্বাদ ও কৃষ্ণ-আগমন

রাজপ্রাসাদে কুন্তীর সাথে দ্রুপদের রাণীদের এক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল। নতুন পুত্রবধূকে কাছে টেনে নিয়ে কুন্তী অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আশীর্বাদ করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর বাষ্পাকুল হলেও ছিল বরাভয়ে পূর্ণ:

"মা কৃষ্ণা, ইন্দ্রাণী যেমন ইন্দ্রের, অরুন্ধতী যেমন বশিষ্ঠের কিংবা লক্ষ্মী যেমন বিষ্ণুর অনুগামিনী—তুমিও তোমার স্বামীদের প্রতি তেমনই অনুগত থেকো। দীর্ঘজীবী হও, বীর সন্তানের জননী হও। অতিথি, ঋষি আর আবালবৃদ্ধবনিতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করো। শতবর্ষ পরম সুখে রাজত্ব করো তুমি।"

এই আনন্দ উৎসবের পূর্ণতা পেল যখন শ্রীকৃষ্ণ এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সখা অর্জুন আর পাণ্ডবদের জন্য নিয়ে এলেন অগাধ সম্পদ—সূক্ষ্ম বস্ত্র, বহুমূল্য শয্যা আর যুদ্ধাশ্ব। যুধিষ্ঠির স্মিতহাস্যে কৃষ্ণের সেই উপহার গ্রহণ করলেন; তিনি জানতেন এ কেবল ধনরত্ন নয়, এ হলো এক অটুট বন্ধুত্বের স্বীকৃতি।

পাঞ্চাল রাজ্যে শুরু হলো পাণ্ডবদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। অপমানের গ্লানি মুছে গিয়ে সেখানে তখন কেবল সম্মান আর আগামীর এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুতি।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র