মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান
মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান
নারদের পরামর্শে পাণ্ডবরা এক কঠিন নিয়মে নিজেদের বেঁধেছিলেন। দ্রৌপদীর সঙ্গে নিভৃতবাসের সময় যদি কোনো ভ্রাতা অন্য ভ্রাতার কক্ষে প্রবেশ করেন, তবে তাকে বারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস গ্রহণ করতে হবে। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে দিনগুলো বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই কাটছিল। কিন্তু নিয়তি যার নাম, সে তো অতর্কিতেই হানা দেয়।
একদিন এক আর্ত ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হলেন অর্জুনের দ্বারে। দস্যুরা তাঁর গোধন হরণ করে নিয়ে গেছে। ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম আর্তের ত্রাণ করা, অথচ অর্জুনের গাণ্ডীব তখন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর শয়নকক্ষে। অর্জুন দ্বিধায় পড়লেন—একদিকে কুলধর্মের নিয়মভঙ্গ, অন্যদিকে শরণাগতের রক্ষা। মুহূর্তকাল ভেবে তিনি স্থির করলেন, একজন ব্রাহ্মণের চোখের জলের চেয়ে নিজের বারো বছরের নির্বাসন অনেক তুচ্ছ। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে অস্ত্র তুলে নিলেন তিনি। ঝড়ের গতিতে দস্যুদের অনুসরণ করে উদ্ধার করে আনলেন হরণ করা গরু।
ফিরে এসে যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণাম করে অর্জুন অবিচল কণ্ঠে বললেন, "অগ্রজ, আমি নিয়ম ভঙ্গ করেছি। আমাকে দণ্ড গ্রহণ করতে দিন।" যুধিষ্ঠির বহু অনুনয় করলেন, বললেন আপৎকালে প্রজারক্ষার জন্য এই ত্রুটি মার্জনীয়। কিন্তু অর্জুন অটল। সত্যের প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করতে শেখেননি।
শুরু হলো অর্জুনের বনবাস। উত্তর থেকে দক্ষিণে নানা তীর্থ ভ্রমণ করতে করতে তিনি পৌঁছালেন হরিদ্বারে, গঙ্গার স্নিগ্ধ শীতল ধারায়। একদিন স্নান করতে নামলে অতর্কিতে এক টান অনুভব করলেন তিনি। এক রহস্যময় শক্তি তাঁকে টেনে নিয়ে গেল অতলে—নাগরাজ্যে। সেখানে দেখা হলো নাগকন্যা উলূপীর সঙ্গে। উলূপী স্পষ্টভাবেই জানালেন তাঁর অনুরাগের কথা। অর্জুন নিজের ব্রহ্মচর্য পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও উলূপী তর্কে হারালেন তাঁকে। তিনি বললেন, "দ্রৌপদীর কারণেই এই ব্রত, অন্য নারীর ক্ষেত্রে নয়।" সেই যুক্তিতে বাধা পড়ে অর্জুন সেখানে কিছুদিন অতিবাহিত করলেন। তাঁদের মিলনে জন্ম নিল বীর পুত্র ইরাবান। বিদায়কালে উলূপী অর্জুনকে বর দিলেন যে, কোনো জলচর প্রাণী কখনো তাঁর ক্ষতি করতে পারবে না।
সেখান থেকে অর্জুন যাত্রা করলেন মণিপুরে। সেখানে তাঁর চোখ আটকে গেল রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদার লাবণ্যে। রাজা চিত্রবাহনের শর্ত ছিল কঠিন—এই বংশে একটি মাত্র সন্তান জন্মায়, তাই চিত্রাঙ্গদার পুত্রকে মণিপুরের উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যেতে হবে। অর্জুন রাজি হলেন। জন্ম নিলেন বভ্রুবাহন। মহাকাব্যের চাকা ঘুরল অন্য খাতে।
তীর্থযাত্রার পথে অগস্ত্য তীর্থে পৌঁছে অর্জুন শুনলেন এক অদ্ভুত ভয়ের কথা। সেখানে কুমিরের ভয়ে কেউ জলে নামে না। উলূপীর দেওয়া বরের শক্তিতে অর্জুন নির্ভয়ে জলে নামলেন। একে একে পাঁচটি কুমিরকে টেনে তুললেন ডাঙায়। স্পর্শমাত্রই তারা রূপান্তরিত হলো দিব্য অপ্সরায়। অভিশাপমুক্ত অপ্সরাদের আশীর্বাদ নিয়ে অর্জুন এগিয়ে চললেন তাঁর শেষ গন্তব্যের দিকে।
অবশেষে প্রভাস তীর্থ। সেখানেই প্রিয় সখা কৃষ্ণের সঙ্গে পুনর্মিলন। রইবতক পর্বতে দুই বন্ধুর সেই কথোপকথন, হাসি আর স্মৃতির রোমন্থন যেন দীর্ঘ বারো বছরের ক্লান্তি ধুয়ে দিল। দ্বারকায় যাদবদের বিপুল অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলল অর্জুনের এই পরিব্রাজন। এই বনবাস কেবল দণ্ড ছিল না, এ ছিল এক বীরের আত্মানুসন্ধান আর ভারতভূমির বিচিত্র রসের আস্বাদন। অর্জুনের এই যাত্রা মহাকাব্যের পাতায় এক উজ্জ্বল পরিচ্ছেদ হয়ে রইল।

Comments
Post a Comment