নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান

 


নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান

ফিরে আসা এবং এক নতুন আরম্ভ।পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভায় যখন বিদুর পদার্পণ করলেন, তখন চারদিকে এক থমথমে অথচ রাজকীয় গাম্ভীর্য। পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে হস্তিনাপুরে। বিদুর এসেছেন ধৃতরাষ্ট্রের দূত হয়ে। সৌজন্য আর উপঢৌকনের আড়ালে আসল উদ্দেশ্যটি কিন্তু কারোরই অজানা ছিল না।

বিদুর শান্ত গলায় বললেন, "মহারাজ দ্রুপদ, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র এই বৈবাহিক সন্ধিতে পরম প্রীত। তিনি চান পাণ্ডবরা এখন তাঁদের কুলবধূ দ্রৌপদী এবং মাতা কুন্তীকে নিয়ে আপন আলয়ে প্রত্যাবর্তন করুক।"

দ্রুপদ কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলেন না। তিনি তাকালেন পাণ্ডবদের দিকে। যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, "মহারাজ, আমরা এখন আপনার আশ্রিত। আপনার নির্দেশই আমাদের শিরোধার্য।"

সেই ভরা সভায় কৃষ্ণের উপস্থিতি ছিল এক অলৌকিক জ্যোতির মতো। তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই রহস্যময় স্মিত হাসি। কৃষ্ণ ধীরস্বরে বললেন, "পাণ্ডবদের এখন হস্তিনাপুরে ফেরাই বিধেয়। সময় এসেছে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার।" কৃষ্ণের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য কার? দ্রুপদ অনুমতি দিলেন।

হস্তিনাপুরে যখন খবর পৌঁছাল, তখন মানুষের মধ্যে সে এক উন্মাদনা! যেন শ্মশানের ছাই থেকে ফিনিক্স পাখি বেঁচে ফিরেছে। বিকর্ণ, চিত্রসেন, দ্রোণাচার্য আর কৃপাচার্য এগিয়ে এলেন নগরদ্বারে। বাদ্যি-বাজনা আর পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে পাঁচ ভাই আর কুন্তী ফিরলেন প্রাসাদে। ধৃতরাষ্ট্র আর ভীষ্মের পদতলে মস্তক অবনত করলেন যুধিষ্ঠির। কুশল বিনিময়ের আড়ালে ধৃতরাষ্ট্রের বুকের মধ্যে তখন কী যন্ত্রণা হচ্ছিল, তা হয়তো কেবল অন্তর্যামীই জানতেন।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে নিভৃতে ডাকলেন। বললেন, "বৎস যুধিষ্ঠির, কলহ আমি চাই না। দুর্যোধনের সঙ্গে তোমাদের বিবাদ মিটিয়ে ফেলার একটাই পথ—রাজ্যভাগ। আমি তোমাদের খাণ্ডবপ্রস্থ দিচ্ছি। সেখানেই তোমরা নিজেদের রাজধানী গড়ে তোলো। সুখে থাকো।"

খাণ্ডবপ্রস্থ! সে তো এক গহন অরণ্য, পরিত্যক্ত জনপদ। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মুখে কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই। ধর্মের অনুশাসনে তিনি সেই রুক্ষ মাটিকেই মেনে নিলেন।

তারপর শুরু হলো এক মহাযজ্ঞ। রুক্ষ মরুপ্রান্তর আর গভীর বনানী কেটে তিল তিল করে গড়ে উঠল এক স্বপ্ননগরী— ইন্দ্রপ্রস্থ। প্রাসাদের চূড়া আকাশ ছুঁল, পরিখায় টলমল করতে লাগল স্বচ্ছ নীল জল, আর বীথিপথ ভরে উঠল পুষ্পশোভিত বৃক্ষে। খাণ্ডবপ্রস্থর সেই অভিশপ্ত মাটি থেকে জেগে উঠল ইন্দ্রের অমরাবতীর মতো এক ঐশ্বর্যময়ী নগরী।

যুধিষ্ঠিরের শাসনে প্রজারা পেল শান্তির নীড়। ধর্ম আর ন্যায়ের শাসন কায়েম হলো সেখানে। কাজ শেষ দেখে কৃষ্ণ আর বলরাম বিদায় নিলেন দ্বারকার পথে।

আকাশে তখন মেঘমুক্ত নীলিমা, কিন্তু ভাগ্যের লিখন অলক্ষ্যে অন্য জাল বুনছিল। আপাতত শান্তি ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু কুরুক্ষেত্রের সেই রক্তক্ষয়ী মহাপ্রলয়ের বীজ কি তখনই উপ্ত হয়ে যায়নি? সময় তার উত্তর দেবে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র