সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ
সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ
মায়া ও নিয়ম: এক কঠিন অঙ্গীকারের উপাখ্যান
খাণ্ডবপ্রস্থ এখন আর সেই পরিত্যক্ত মরুভূমি নেই, অর্জুনের গাণ্ডীব আর ময়দানবের জাদুকরী ছোঁয়ায় তা এখন ঝলমলে ইন্দ্রপ্রস্থ। পাণ্ডবরা সেখানে সুখে আছে ঠিকই, কিন্তু এক অলক্ষ্য আশঙ্কার মেঘ যুধিষ্ঠিরের মনের কোণে মাঝেমধ্যেই উঁকি দেয়। পাঁচ ভাই, অথচ জীবনসঙ্গিনী কেবল একজন—দ্রৌপদী। এই অদ্ভুত সম্পর্কের বুনন যেমন নিবিড়, তেমনই আলগা হয়ে যাওয়ার ভয়ও তো কম নয়।
ঠিক এমন সময়ই একদিন ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। চিরচেনা সেই বীণা আর মুখে ‘নারায়ণ’ নাম। যুধিষ্ঠির সসম্ভ্রমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদীও এলেন, নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন দেবর্ষিকে। নারদ তাঁর শান্ত দৃষ্টিতে দ্রৌপদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "মা, তুমি এবার ভেতরে যাও।" দ্রৌপদী নিঃশব্দে প্রস্থান করলে নারদ মুখ ফেরালেন পাণ্ডবদের দিকে।
নারদ জানতেন, আবেগ দিয়ে সংসার চলে না, তার জন্য লাগে কঠিন নিয়ম। তিনি পাণ্ডবদের কাছে এক প্রাচীন আখ্যানের অবতারণা করলেন। সুন্দ আর উপসুন্দ—দুই প্রবল পরাক্রমী অসুর ভাই। তাদের মধ্যে এমন ভালোবাসা যে ছায়াও যেন শরীরকে ছাড়িয়ে যায় না। ব্রহ্মার বরে তারা অপরাজেয়, মৃত্যু কেবল হতে পারে একে অপরের হাতে। কিন্তু বিধাতা এক অদ্ভুত ফাঁদ পাতলেন। তিলোত্তমা নাম্নী এক অপার্থিব সুন্দরী মর্ত্যে এলেন। সেই রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল দুই ভাইয়ের আজন্মের প্রেম। তিলোত্তমাকে পাওয়ার আদিম কামনায় তারা একে অপরের বুকে অস্ত্র বিঁধিয়ে দিল। প্রেমের চেয়েও কাম বড় হয়ে উঠল, আর তাতেই ধ্বংস হলো সেই অভেদ্য ভ্রাতৃত্ব।
গল্প শেষ করে নারদ গম্ভীর স্বরে বললেন, "পাণ্ডু পুত্রগণ, তোমরা একে অপরকে ভালোবাসো সত্য, কিন্তু কাম আর ঈর্ষা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই এক অলঙ্ঘ্য নিয়ম তোমাদের বাঁধতে হবে। দ্রৌপদী এক এক সময়ে তোমাদের এক একজনের কাছে থাকবেন। সেই নির্জন মুহূর্তে যদি অন্য কোনো ভাই অসাবধানবশত তাঁদের কক্ষে প্রবেশ করে, তবে তাকে বারো বছরের জন্য ব্রহ্মচর্য পালন করে বনে নির্বাসনে যেতে হবে।"
সভাকক্ষে এক দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব—প্রত্যেকেই বুঝলেন এই নিয়মের গুরুত্ব। সুন্দ-উপসুন্দের মতো ধ্বংস হওয়ার চেয়ে সংযমের বেড়ি পরা অনেক শ্রেয়। তাঁরা সকলে একবাক্যে এই কঠিন শপথ গ্রহণ করলেন।
এইভাবেই শুরু হলো ইন্দ্রপ্রস্থের এক নতুন অধ্যায়। যেখানে শুধু ঐশ্বর্য নয়, ছিল অনুশাসন আর অপরিসীম শ্রদ্ধা। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠল তাঁদের দেওয়া সেই কথা। মায়া আর নিয়মের এই অদ্ভুত ভারসাম্যে ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে উঠল এক আদর্শ জনপদ, যার খবর বাতাসের টানে ছড়িয়ে পড়ল দিগ দিগন্তে।
এক অদ্ভুত শান্তির চাদরে ঢাকা পড়ল পাণ্ডবদের সংসার, কিন্তু মহাকালের চাকা তখন অলক্ষ্যে ভবিষ্যতের কোনো এক ঝড়ের সংকেত দিচ্ছিল।

Comments
Post a Comment