খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ

 


খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ

পাণ্ডবরা ফিরে আসায় ইন্দ্রপ্রস্থের সাধারণ মানুষের মনে যেন উৎসবের রঙ লেগেছে। চারদিকে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণের মন তখন অন্য কোথাও। একদিন যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা দুজনে মিলে যমুনার তীরে গেলেন একটু নিভৃত সময়ের খোঁজে। বহমান নদীর শীতল হাওয়ায় দুজনে গল্পে মগ্ন, ঠিক তখনই সেখানে এক অদ্ভুত তেজস্বী ব্রাহ্মণের আবির্ভাব হলো।

সেই ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ যেন তপ্ত কাঞ্চন, মাথায় জটা আর মুখভর্তি দাড়ি। এক আশ্চর্য দীপ্তি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাঁর শরীর থেকে। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন, "তোমরা মহাবীর। আমি সর্বভুক, আজ তোমাদের কাছে এসেছি আমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে। ওই খাণ্ডব বনই আমার আহার।"

শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন বিস্ময় গোপন করে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কে? কী আহার আপনার কাম্য? আদেশ করুন, আমরা তা পূর্ণ করব।"

ব্রাহ্মণ তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ করলেন। তিনি অগ্নিদেব। তিনি বললেন, "আমি সাধারণ অন্ন চাই না। আমি এই খাণ্ডব বন দহন করতে চাই। এর আগে বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানে সপরিবারে তক্ষক নাগ বাস করে। আমি যখনই আগুন জ্বালি, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর বন্ধুর রক্ষায় মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়ে আমাকে নিভিয়ে দেন। তোমরা বীর, তোমরা যদি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাকে রক্ষা করো, তবেই আমি এই বন গ্রাস করতে পারি।"

অগ্নির অসুস্থতা ও শ্বেতকীর যজ্ঞ

অর্জুন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, ইন্দ্রের সুরক্ষিত এই বন কেন তিনি ধ্বংস করতে চান? অগ্নি তখন শোনালেন এক প্রাচীন ইতিহাস।

বহু কাল আগে শ্বেতকী নামে এক পরম ধার্মিক রাজা ছিলেন। তাঁর যজ্ঞের নেশা ছিল অদম্য। বছরের পর বছর তিনি অবিরাম যজ্ঞ করে যেতেন। যজ্ঞের ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়ে যেত। যজ্ঞ করতে করতে ব্রাহ্মণরা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তাঁদের শরীর আর সায় দিল না। তাঁরা সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু জেদি শ্বেতকী দমবার পাত্র নন। মহাদেবের আশীর্বাদে তিনি মহাতেজস্বী মহর্ষি দুর্বাসাকে দিয়ে টানা বারো বছর ধরে যজ্ঞ করালেন। সেই যজ্ঞের আগুনে বিরামহীনভাবে ঢালা হলো ঘৃত। বারো বছর পর ব্রাহ্মণদের খুশি করে রাজা স্বর্গে গেলেন ঠিকই, কিন্তু বিপত্তি ঘটল অন্য জায়গায়।

টানা বারো বছর ধরে অত ঘৃত আহুতি খেয়ে অগ্নিদেবের মন্দাগ্নি হলো। তাঁর তেজ কমে গেল, শরীর হয়ে পড়ল পাণ্ডুর। ব্রহ্মা পরামর্শ দিলেন, "খাণ্ডব বনে বহু ওষধি আর জীবজন্তু আছে। ওই বন পুড়িয়ে খেলে তবেই তোমার এই ব্যাধি সারবে।"

কিন্তু প্রতিবারই ইন্দ্রের বাধার কাছে তাঁকে হার মানতে হচ্ছিল। ব্রহ্মা তখন তাঁকে বললেন নর-নারায়ণের অবতার কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্য নিতে।

যুদ্ধের প্রস্তুতি ও দিব্য অস্ত্রলাভ

অর্জুন সব শুনে বললেন, "দেব, আমরা প্রস্তুত। কিন্তু ইন্দ্রের বজ্র আর বৃষ্টির মোকাবিলা করতে হলে আমার উপযুক্ত ধনুক আর তক্ষুণি শেষ হবে না এমন তূণীর প্রয়োজন।"

অগ্নিদেব তখন বরুণ দেবতাকে স্মরণ করলেন। বরুণের কাছ থেকে অর্জুন পেলেন সেই বিখ্যাত 'গাণ্ডীব' ধনু এবং দুটি অক্ষয় তূণীর। শ্রীকৃষ্ণকে দেওয়া হলো এক অজেয় চক্র। অগ্নিদেব বললেন, "এই চক্র নিক্ষেপ করলে কাজ শেষ করে তা আবার তোমার হাতে ফিরে আসবে।"

 আগুনের উৎসব ও ইন্দ্রের পরাজয়

শুরু হলো দহন। আগুনের শিখা যেন আকাশের দিকে জিভ বাড়িয়ে দিল। বনের ভেতর পশুপাখির আর্তনাদ উঠল। অর্জুন তাঁর শরজালে এমন এক চাঁদোয়া তৈরি করলেন যে বৃষ্টির এক ফোঁটাও আগুনের ওপর পড়তে পারল না। দেবরাজ ইন্দ্র কুপিত হয়ে মেঘ পাঠালেন, বজ্রপাত করলেন, কিন্তু অর্জুনের বাণ বর্ষণের কাছে সব ব্যর্থ হলো।

তক্ষক নাগ তখন কুরুক্ষেত্রে ছিলেন , তাঁর পুত্র অশ্বসেন কোনোমতে পালিয়ে বাঁচলেন। অন্যদিকে, দানব স্থপতি ময়দানব বাঁচার জন্য অর্জুনের শরণাপন্ন হলেন। অর্জুন শরণাগতকে ত্যাগ করেন না, তাই ময়দানব রক্ষা পেলেন। অশ্বসেন, ময়দানব আর চারটি শার্ঙ্গক পাখি ছাড়া খাণ্ডব বনের আর কেউ রক্ষা পেল না।

আকাশবাণী হলো যে, ইন্দ্রের পরাজয় বিধিলিপি এবং শ্রীকৃষ্ণ-অর্জুন অপরাজেয়। দেবরাজ শান্ত হলেন। দীর্ঘ পনেরো দিন ধরে জ্বলল সেই খাণ্ডব বন।

আদি পর্বের সমাপ্তি

দহন শেষে অগ্নিদেব তাঁর হৃত তেজ ফিরে পেলেন। তিনি এবং দেবরাজ ইন্দ্র খুশি হয়ে অর্জুন ও কৃষ্ণকে বর দিতে চাইলেন। অর্জুন চাইলেন সমস্ত দিব্য অস্ত্র। ইন্দ্র প্রতিশ্রুতি দিলেন, মহাদেব যখন অর্জুনের ওপর তুষ্ট হবেন, তখন তিনি স্বয়ং এসে অর্জুনকে সব অস্ত্র দেবেন। আর শ্রীকৃষ্ণ চাইলেন অর্জুনের সাথে তাঁর চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব।

ইন্দ্র তথাস্তু বলে বিদায় নিলেন। এই ধ্বংসের ছাই থেকেই জন্ম নিল এক নতুন সম্ভাবনা, যা ভবিষ্যতে পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এখানেই মহাভারতের আদি পর্বের সমাপ্তি।

খাণ্ডব দহন কি কেবল একটি বনের বিনাশ ছিল, নাকি নতুন এক সাম্রাজ্য গড়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি? ইতিহাসের পরতে পরতে এমন অনেক নিষ্ঠুর সত্য লুকিয়ে থাকে। 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র