কুরুক্ষেত্রের রক্তে এক অখ্যাত মহারথী: ধৃষ্টকেতু

 


কুরুক্ষেত্রের রক্তে এক অখ্যাত মহারথী: ধৃষ্টকেতু

শিশুপালের চেদিরাজ্য তখন শোকে আর ক্রোধে ফুটছে। রাজসূয় যজ্ঞের ভরা সভায় শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র কেটে নামিয়েছে মহারাজ শিশুপালের মাথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে যজ্ঞবেদি। এমন এক রাতে, চেদির সিংহাসনে যখন এসে বসলো এক কিশোর—নাম তার ধৃষ্টকেতু—সবাই ভেবেছিল এবার কৃষ্ণের বিরুদ্ধে, পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে এক রক্তের বদলা নেওয়ার পালা শুরু হলো। ইতিহাস অন্তত তা-ই শেখায়। শত্রুর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সন্তান শেখে শুধু ঘৃণা।

কিন্তু বালক ধৃষ্টকেতু গড় গড় করে হাঁটলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। সে পথ প্রতিহিংসার নয়, সে পথ প্রজ্ঞার। কিশোর রাজা বুঝতে পেরেছিলেন, পিতা শিশুপাল যে পথ ধরেছিলেন, তা অহংকারের, তা অধর্মের। শ্রীকৃষ্ণের হাতে পিতার মৃত্যু কোনো অন্যায় হত্যা নয়, তা ছিল পাপের অনিবার্য পাওনা। পিতৃহত্যার দাহ বুকে চেপেও ধৃষ্টকেতু হাত বাড়িয়ে দিলেন পাণ্ডবদের দিকে। ধিক্কার দিল কৌরবরা, অবাক হলো আর্যাবর্ত। কিন্তু ধৃষ্টকেতুর কাছে ধর্ম ছিল রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড়।

সম্পর্ক আরও গভীর হলো। নিজের বোন করেণুমতিকে তুলে দিলেন চতুর্থ পাণ্ডব নকুলের হাতে। বনবাসের বারো বছর আর অজ্ঞাতবাসের এক বছর—যখন পাণ্ডবরা প্রায় নিঃস্ব, হৃতসর্বস্ব—তখনও চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু তাঁদের পাশ থেকে সরেননি। গোপন সংবাদের জোগান দিয়েছেন, দিয়েছেন মানসিক শক্তি।

তারপর এলো সেই প্রলয়ঙ্কর কুরুক্ষেত্র।

পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী বাহিনীর সাতজন সেনাপতির নাম যখন তৈরি হচ্ছে, যুধিষ্ঠির কোনো দ্বিধা ছাড়াই বেছে নিলেন ধৃষ্টকেতুকে। পিতামহ ভীষ্ম কৌরব শিবিরে বসে নিজের যুদ্ধপঞ্জিকায় ধৃষ্টকেতুর নামের পাশে লিখেছিলেন—'মহারথী'। একাই যিনি হাজার সৈন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।

যুদ্ধের মাঠে ধৃষ্টকেতু ছিলেন এক জীবন্ত প্রলয়। কৃপাচার্য থেকে বাহ্লীক—কৌরবপক্ষের বাঘা বাঘা বীরেরা তাঁর বাণের তোড়ে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। রক্তে রাঙা কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, চেদির রাজরক্ত শুধু ষড়যন্ত্রে ফোটে না, বীরত্বেও জ্বলে ওঠে।

কিন্তু মহাকাব্যের নিয়ম বড় নিষ্ঠুর। দ্রোণ পর্বে যখন আচার্য দ্রোণ পাণ্ডববাহিনীকে বিচূর্ণ করছেন, ধৃষ্টকেতু নিজের রথ নিয়ে সরাসরি গিয়ে দাঁড়ালেন সেই মহাবীর দ্রোণাচার্যের সামনে। তছনছ করে দিলেন দ্রোণের ধনু, কেটে ফেললেন রথের ধ্বজা। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং দ্রোণাচার্যও। কিন্তু বৃদ্ধ আচার্যের ক্ষিপ্র আর মারাত্মক অস্ত্রের সামনে শেষ পর্যন্ত শরীর ধরে রাখতে পারলেন না চেদির তরুণ রাজা। বুক চিরে বেরিয়ে গেল দ্রোণের শায়ক।

কুরুক্ষেত্রের রক্তভেজা মাটিতে ঢলে পড়লেন ধৃষ্টকেতু।

যিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধের চেনা গল্পটা বদলে দিয়েছিলেন এক চিরন্তন সত্যের টানে—আজকের ইতিহাস হয়তো তাঁর নামটা খানিকটা ভুলেই গেছে। কিন্তু মহাভারতের পাতার গভীরে ধৃষ্টকেতু আজও এক নিঃসঙ্গ, অথচ আলোকময় ব্যতিক্রম।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)