শ্রীরামের লঙ্কাজয়ে ছয় বানর বীরেব অবদান: নল, নীল, অঙ্গদ, ক্রাথ, মৈন্দ ও দ্বিবিদ


শ্রীরামের লঙ্কাজয়ে ছয় বানর বীরেব অবদান: নল, নীল, অঙ্গদ, ক্রাথ, মৈন্দ ও দ্বিবিদ

মহাকাব্য রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের সীতা উদ্ধার ও লঙ্কাজয় অভিযানের মূল চালিকাশক্তি ছিল সুগ্রীবের অধীনস্থ বানর ও ভালুকদের বিশাল বাহিনী। এই মহাসেনাবাহিনীতে কেবল বিপুল শারীরিক বলই ছিল না, ছিল অসাধারণ সামরিক দক্ষতা, কারিগরি প্রজ্ঞা ও অটল রামভক্তি। সমগ্র অভিযানে যে সকল বানর বীর ও সেনাপতিরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছয়জন হলেন—নল, নীল, অঙ্গদ, ক্রাথ, মৈন্দ ও দ্বিবিদ।

স্থাপত্য প্রজ্ঞায় প্রকৌশলী নল

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পুত্র নল ছিলেন বানরবাহিনীর প্রধান স্থাপত্যশিল্পী ও প্রকৌশলী। রামায়ণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অলৌকিক অধ্যায় 'রামসেতু' (নল সেতু) নির্মাণের মূল দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। বিশ্বকর্মার বরপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তাঁর ছোঁয়ায় বিশাল পর্বত ও শিলাখণ্ড মহাসমুদ্রে ভেসে থাকত। তাঁর সুনিপুণ নির্দেশনায় অতি অল্প সময়ে সমুদ্রের ওপর সেতু নির্মিত হয়, যা রামচন্দ্র ও তাঁর পুরো বাহিনীকে লঙ্কায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

সামরিক কৌশলে সর্বাধিনায়ক নীল

অগ্নিদেবের পুত্র নীল ছিলেন সুগ্রীবের অনুগত বানরসেনার সর্বাধিনায়ক বা প্রধান সেনাধ্যক্ষ। সেতু নির্মাণ পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল সেনাদলকে সুসংগঠিত রাখা ও যুদ্ধকৌশল বিন্যাসে তাঁর সামরিক বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পায়। লঙ্কার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাবণের অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী রাক্ষস সেনাপতি প্রহস্তকে একক দ্বৈরথে বধ করে নীল শ্রীরামের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেন।

কূটনীতি ও শৌর্যে যুবরাজ অঙ্গদ

কিষ্কিন্ধ্যার রাজপুত্র এবং বীর বালীর পুত্র অঙ্গদ ছিলেন রামায়ণের অন্যতম প্রজ্ঞাবান ও শৌর্যবান চরিত্র। যুদ্ধের সূচনা করার পূর্বে শ্রীরাম তাঁকে দূত হিসেবে রাবণের রাজসভায় প্রেরণ করেন। সেখানে রাবণের সম্মুখে অঙ্গদের বিখ্যাত 'চরণ প্রতিষ্ঠা' বা পা স্থির রাখার ঘটনা রাক্ষসদের মনে ভয় ও বিস্ময়ের সঞ্চার করেছিল। লঙ্কাকাণ্ডে তিনি প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেন এবং রাক্ষস বীর বজ্রদংষ্ট্রকে পরাস্ত ও বধ করে নিজের বীরত্বের পরিচয় দেন।

অদম্য বলশালী পরাক্রান্ত ক্রাথ

বানর সেনাপতি ক্রাথ ছিলেন অত্যন্ত বলশালী ও নিবেদিতপ্রাণ এক যুথপতি। সুগ্রীবের আদেশে নিজস্ব বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনি শ্রীরামের সেবায় যোগ দেন। লঙ্কার যুদ্ধে তোরণ ও বিশাল প্রাকার ধ্বংস করা এবং শত্রুপক্ষের ব্যুহ ছিন্নভিন্ন করতে ক্রাথ তাঁর অতুলনীয় শারীরিক বলের প্রদর্শন ঘটিয়েছিলেন।

অভেদ্য জুটি মৈন্দ ও দ্বিবিদ

অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের অংশজাত দুই সহোদর মৈন্দ ও দ্বিবিদ ছিলেন রামায়ণের এক অপরাজেয় ও অভেদ ভাইদের জুটি। ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত হওয়ায় এই দুই বীর ছিলেন কার্যত অবধ্য। সীতা অনুসন্ধানের সময় দক্ষিণ দিকের কঠিন অভিযানের দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে লঙ্কার যুদ্ধে রাম-লক্ষ্মণের ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে তাঁরা শত্রুসেনাকে তছনছ করেছিলেন। যুদ্ধে রাক্ষসবাহিনীর একাধিক প্রকাণ্ড যোদ্ধাকে তাঁরা যৌথভাবে পরাস্ত করেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রামায়ণের গল্পে এই ছয় বানর বীরের ভূমিকা ছিল অনন্য। নলের কারিগরি জ্ঞান, নীলের সেনা পরিচালনা, অঙ্গদের কূটনীতি ও বীরত্ব এবং ক্রাথ, মৈন্দ ও দ্বিবিদের বিপুল শারীরিক শক্তির সম্মিলিত প্রভাবেই শ্রীরামের লঙ্কাজয়ের এই মহাকাব্যিক পথ সুগম হয়েছিল।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)