কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় আর এক বিষাদময় খড়্গ: চেকিতান
কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় আর এক বিষাদময় খড়্গ: চেকিতান
যাদব বংশের রাজনীতি তখন বেশ ঘোলাটে। বলরাম রক্তপাত এড়িয়ে সোজা চলে গেলেন তীর্থযাত্রায়। আর শ্রীকৃষ্ণের বিখ্যাত নারায়ণী সেনা? তারা বিক্রি হয়ে গেল কৌরবদের ছকে—দুর্যোধনের পতাকাতলে অস্ত্র তুলতে তাদের একটুও বাঁধল না। কিন্তু সেই একই যাদব রক্তের ধমনীতে যার বাস, সেই তরুণ যোদ্ধা চেকিতান হাঁটলেন সম্পূর্ণ উল্টো দিকে। ক্ষমতা, প্রলোভন আর নিজের বংশের অধিকাংশের সিদ্ধান্তকে তুচ্ছ করে তিনি এক অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন যুধিষ্ঠিরের পাশে।
কেন? কারণ কৃষ্ণ তাঁর কাছে শুধু এক রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় ছিলেন না; কৃষ্ণ ছিলেন তাঁর কাছে সত্যের কম্পাস। আর পাণ্ডবদের পক্ষে থাকা মানেই যে ধর্মের পক্ষে থাকা, তা বুঝতে চেকিতানের রাজনীতি বোঝার প্রয়োজন হয়নি, লেগেছিল শুধু হৃদয়।
তারপর শুরু হলো কুরুক্ষেত্রের সেই অন্তহীন রক্তস্নান।
পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী বাহিনীর সেনাপতিদের তালিকায় যখন নাম উঠছে, তখন যুধিষ্ঠির নিশ্চিত ছিলেন চেকিতানের ব্যাপারে। পিতামহ ভীষ্ম কৌরব শিবিরের প্রদীপের আলোয় বসে মূল্যায়ন করেছিলেন এই যাদব বীরকে—লিখেছিলেন 'মহারথী'। যিনি একা রথে চেপে হাজারো শত্রুর সারণি ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারেন।
যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই চেকিতান যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। কৃপাচার্যের সাথে তাঁর লড়াই যখন জমে উঠল, তখন দুই বীরের রথ ভাঙল, ধনুক কাটল, তবু রক্তে ভেসেও কেউ পিছু হঠলেন না। অর্জুন যখন সংশপ্তকদের চক্রব্যূহে ব্যস্ত, চেকিতান তখন জীবন বাজি রেখে আগলে রেখেছেন পাণ্ডবদের মূল ব্যূহ। শল্য আর সুশর্মার বাহিনীকে একের পর এক বাণে দিশেহারা করে দিয়েছেন।
কিন্তু চেকিতানের ভাগ্যে লেখা ছিল মহাভারতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং বেদনাময় এক ট্র্যাজেডি।
সেটা যুদ্ধের ১৭তম দিন। কৌরবদের সেনাপতি তখন রাজর্ষি শল্য। শল্যের বাণের তোড়ে পাণ্ডব বাহিনী তখন খড়কুটোর মতো উড়ছে। এমন সময় রথ ছুটিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন চেকিতান। বাণ ফুরিয়ে গেল, রথ ভেঙে চুরমার হলো। কিন্তু যুদ্ধ থামল না।
দুই বীর রথ থেকে লাফিয়ে পড়লেন কুরুক্ষেত্রের রক্তভেজা ধুলোয়। হাতে ঝকঝক করে উঠল উন্মুক্ত খড়্গ আর ঢাল। শুরু হলো এক মহাকাব্যিক তলোয়ার যুদ্ধ। ধাতুর সাথে ধাতুর ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ ছুটছে, দুজনের শরীর চিরে নামছে রক্তের ধারা। কিন্তু বয়সে প্রবীণ ও শক্তিতে কিছুটা এগিয়ে থাকা মদ্ররাজ শল্যের এক বিষাক্ত বোঁঝার মতো তলোয়ারের আঘাত শেষ পর্যন্ত চিরে দিয়ে গেল চেকিতানের বুক।
কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় নিঃশব্দে ঢলে পড়লেন চেকিতান।
যিনি নিজের ভাইদের মতো কৌরবদের দাসত্ব বেছে নেননি, যিনি ধর্মের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়েছিলেন এক শান্ত অহংকার নিয়ে। ইতিহাসের ধুলোয় আজ হয়তো চেকিতানের নামটা একটু আবছা, কিন্তু মহাভারতের পাতার গভীরে তিনি এক অবিচল, একনিষ্ঠ আত্মত্যাগের প্রতীক।

Comments
Post a Comment