কেকয়রাজপুত্র কিচক: রক্ত, বংশ পরিচয় ও এক সেনাপতির উত্থান


কেকয়রাজপুত্র কিচক: রক্ত, বংশ পরিচয় ও এক সেনাপতির উত্থান

মহাভারতের সুবিশাল মানচিত্রে কিছু চরিত্র ইতিহাস বা কাব্যের মূল আলোতে তেমনভাবে আসে না, অথচ তাদের রক্তে ও পরিচয়ে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত নাটকীয়তা। মৎস্যদেশের প্রচণ্ড প্রতাপশালী সেনাপতি কিচক তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অজ্ঞাতবাসের নাট্যশালা কিংবা এক নারীর প্রতি লাঞ্ছনার রক্তাক্ত ইতিহাস। কিন্তু এই সেনাপতির জন্মকথা, তাঁর কুলমর্যাদা আর একশো পাঁচ ভাইয়ের অটুট শক্তিবলয়ের গল্পটি মূল মহাভারতে অত্যন্ত বিশিষ্ট।

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়: কিচক কি কোনো সাধারণ সারথিপত্র?

লোককথায় বা বিভ্রান্তিকর ধারণায় অনেকেই কিচককে সাধারণ কোনো রথচালকের পুত্র বলে ভুল করেন। কিন্তু ব্যাসদেবের মহাভারত তা বলে না।

কিচক ছিলেন কেকয় রাজ্যের রাজপুত্র। তাঁর পিতা ছিলেন কেকয় রাজ এবং মাতা ম্যালবী। কিচকেরা বংশানুক্রমে 'সূত' কুলজাত ছিলেন। প্রাচীন ভারতে সূতদের রাজসভায় কবি, সারথি বা দূত হিসেবে দেখা গেলেও, কেকয় বংশের এই সূত শাখাটি ছিল অত্যন্ত বীরভোগ্যা এবং রাজক্ষমতাসম্পন্ন।

রাজা বিরাটের মহিষী সুদেষ্ণা ছিলেন এই কেকয়রাজের কন্যা এবং কিচকের জ্যেষ্ঠা ভগিনী। বোনের বিবাহের সুবাদেই কিচক মৎস্যদেশে আসেন এবং নিজের অসীম রণকৌশল ও বাহুবলে মৎস্যরাজ্যের প্রধান সেনাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন। বস্তুত, বিরাটরাজ সিংহাসনে বসে থাকলেও মৎস্যদেশের প্রকৃত শাসক ও শক্তির উৎস ছিলেন স্বয়ং কিচকই।

২. একশো পাঁচ ভাইয়ের অভেদ্য বলয়: ‘উপকিচক’ উপাখ্যানকিচক একা ছিলেন না; তাঁর ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল তাঁর এক বিশাল ও একতাবদ্ধ ভাইদের বাহিনী।

 কিচকের ছোট ভাই ছিল ঠিক ১০৫ জন।উপকিচক মহাভারতের মূল গ্রন্থে এই ১০৫ জন ভাইকে যৌথভাবে ‘উপকিচক’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। কিচককে ধরে এই রাজপরিবারে মোট ভাই ছিলেন ১০৬ জন।

এই ১০৬ ভাই কেবল রক্তসম্পর্কেই যুক্ত ছিলেন না, তারা ছিলেন রাজকার্যে এবং যুদ্ধে একের পর এক দুর্ভেদ্য ঢালের মতো। কিচকের নেতৃত্বে এই ১০৫ উপকিচক মৎস্যরাজ্যের সীমান্ত রক্ষা করতেন এবং পার্শ্ববর্তী শত্রু রাজ্য—বিশেষ করে ত্রিগর্ত ও হস্তিনাপুরের আক্রমণ থেকে মৎস্যদেশকে বারবার রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের এই অদম্য ঐক্য ও বীরত্বের কারণেই স্বয়ং বিরাটরাজ কিচক পরিবারের হাতে রাজ্যের সমস্ত সামরিক ক্ষমতা সঁপে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

 ৩. ক্ষমতার চরম অহংকার ও পতন

মৎস্যরাজের অনুগ্রহ নয়, নিজের ও নিজের ১০৫ ভাইয়ের বাহুবলেই কিচক মৎস্যদেশের একছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিবেশী রাজ্যগুলি বিরাটকে নয়, ভয় পেত সেনাপতি কিচক ও তাঁর উপকিচকদের। কিন্তু অসীম ক্ষমতা আর অজেয় শক্তির মেহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়।

অজ্ঞাতবাসকালে পাণ্ডবদের মৎস্য প্রাসাদে অবস্থানকালে, কিচক রাজরানী সুদেষ্ণার সেবিকা 'সৈরন্ধ্রী'র (ছদ্মবেশী দ্রৌপদী) অপরূপ রূপ দেখে কামাক্রান্ত ও অহংকারী হয়ে ওঠেন। নিজের পদের ক্ষমতা ও শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়ে তিনি রাজসভায় সৈরন্ধ্রীকে লাঞ্ছিত করেন এবং অপমান জানান। ক্ষমতা যাঁকে অন্ধ করেছিল, তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে ধর্মের সূক্ষ্ম বিচার কোনো পরাক্রমশালী সেনাপতিকেও ক্ষমা করে না।

অবশেষে সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই রূপায়িত হয় গভীর রাতের নাট্যশালার গোপন যুদ্ধ। ছদ্মবেশী ভীমসেনের হাতে অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রাণ হারান সেনাপতি কিচক। ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং ক্রোধে অন্ধ হয়ে ১০৫ উপকিচকও সৈরন্ধ্রীকে মারার চক্রান্ত করে, যার পরিণতিতে ছদ্মবেশী ভীম একাই সেই ১০৫ জন উপকিচককেও বিনাশ করেন।

এভাবেই কেকয় রাজপুত্রের বাহুবল, ১০৫ ভাইয়ের গর্ব এবং এক মহাবিক্রমী সেনাপতির দাপট সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়—যার পেছনে ছিল কেবল ক্ষমতার অন্ধ অহংকার আর কামনার অন্ধকার।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)