কেকয়রাজের বিস্মৃত উপাখ্যান-সিংহাসন, রক্তসূত্র ও নিয়তির পরিহাস:
কেকয়রাজের বিস্মৃত উপাখ্যান-সিংহাসন, রক্তসূত্র ও নিয়তির পরিহাস:
সিন্ধু ও বিপাশার মাঝামাঝি এক জনপদ — কেকয়। তার রাজবংশ প্রাচীন, যোদ্ধা হিসেবে প্রসিদ্ধ, আর ভাগ্যের কী পরিহাস, এই বংশেরই এক কন্যা রামায়ণের কৈকেয়ী, দশরথের প্রিয়তমা মহিষী। কিন্তু মহাভারতের পাতায় কেকয়রাজের পরিচয় ভিন্ন প্রসঙ্গে আসে — এখানে তারা পাণ্ডবদের আত্মীয়, পাণ্ডবদেরই পক্ষের যোদ্ধা।
কুন্তীর সঙ্গে কেকয়-বংশের বিবাহসূত্র ছিল বলে জনশ্রুতি, আর সেই সূত্রেই কেকয়রাজের পাঁচ পুত্র — বৃহৎক্ষত্র, চিত্রকেতু, বৃন্দ, কেকয় এবং নাম না-জানা আরও ভাইয়েরা — কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের রথ, তাঁদের ধনুকের টঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে কৌরবসেনার বুকে কাঁপন ধরাত।
মহাভারতের সুবিশাল মানচিত্রে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আলো আর উত্তাপ যতটা জায়গা জুড়ে রয়েছে, তার নেপথ্যে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট রাজ্যগুলোর ইতিহাস ততটাই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। এমনই এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির নাম কেকয় রাজ্য—যেখানকার রাজা, রাজপুত্র এবং রাজকন্যারা কুরুবংশেরই রক্তে রক্তান্বিত হয়েও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের নির্মম ঘূর্ণাবর্তে নিজেদের ধ্বংস টেনে এনেছিলেন।
১. কুরুকুলের সঙ্গে রক্তের টান
কেকয় রাজ্য ছিল ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে এক পরাক্রমশালী ভূখণ্ড। কেকয়রাজ শুধু সামরিক ক্ষমতায় শক্তিশালী ছিলেন না, হস্তিনাপুরের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক।
ব্যাসদেবের মহাভারত অনুসারে, কেকয়রাজ সুমিত্রে (বা ধৃষ্টকেতু) পাঁচ পুত্র এবং দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। কেকয়রাজের জ্যেষ্ঠা কন্যা সুদেষ্ণা ছিলেন মৎস্যদেশের রাজা বিরাটের প্রধান মহিষী (যাঁর অনুজ ছিলেন মহাবলী সেনাপতি কিচক)। অন্যদিকে, তাঁর পাঁচ বীর পুত্র—বৃহৎক্ষত্র, মনুমান, রাজাধিদেব, ভদ্রক এবং জয়াৎসেন—ছিলেন পাণ্ডবদের পিসি (কুন্তীর বোন শ্রুতকীর্তি)-র সন্তান। অর্থাৎ, কেকয় রাজপুত্ররা ছিলেন পাণ্ডবদের মামাতো ভাই।
শ্রুতকীর্তি: কুন্তীর ভগ্নী, কেকয়রাজের রাণী
শূরসেনের কন্যা তিনি — বসুদেবের সহোদরা, কুন্তীর আপন বোন। যাদব বংশে জন্ম নিয়েও ভাগ্য তাঁকে নিয়ে গেল দূর কেকয়রাজ্যে, বিবাহসূত্রে। কুন্তীর মতোই তাঁর জীবনও বাঁধা পড়ল পরবংশের রাজমহিষী হয়ে, নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্য এক রাজপরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে।
শ্রুতকীর্তির নাম মহাভারতের পাতায় বড় করে লেখা নেই — কিন্তু তাঁর গর্ভেই জন্ম নিয়েছিলেন সেই পাঁচ কেকয়-রাজপুত্র, যাঁরা পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে পাণ্ডবদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মাসতুতো ভাই কুন্তীর পুত্রদের প্রতি তাঁদের এই টান আসলে শ্রুতকীর্তিরই রক্তের টান, মায়ের শিক্ষারই প্রতিফলন। যে বাঁধন তিনি নিজের বোনের সঙ্গে বহন করেছিলেন সারাজীবন, সেই বাঁধনই সঞ্চারিত হয়েছিল পরের প্রজন্মে।
কিন্তু যুদ্ধ কারো পক্ষপাত মানে না। শ্রুতকীর্তির পুত্রেরা যখন এক এক করে দ্রোণ-কর্ণের বাণে ভূলুণ্ঠিত হলেন, তখন কোথাও এক মায়ের নীরব শোক ইতিহাসের খাতায় লেখা হল না। যুদ্ধের বিজয়-পরাজয়ের হিসেবে এই মায়েদের কান্না বড় অবহেলিত থেকে যায় — অথচ প্রতিটি মৃত যোদ্ধার পেছনে এমনই এক শ্রুতকীর্তি ছিলেন, যিনি সন্তান মানুষ করেছিলেন স্নেহে, আর হারিয়েছিলেন যুদ্ধের নিষ্ঠুর প্রয়োজনে।
শ্রুতকীর্তির কাহিনি তাই আসলে মহাভারতের সেই নীরব নারীদের কাহিনি, যাঁদের নাম ইতিহাস মনে রাখে না, কিন্তু যাঁদের ত্যাগেই মহাকাব্যের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে।
২. ভাইয়ে-ভাইয়ে গৃহযুদ্ধ ও রাজ্যের বিভাজন
যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পুরো ভারতবর্ষকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল, কেকয় রাজপরিবারও তার থেকে রেহাই পায়নি। অহংকার, ঈর্ষা আর ক্ষমতার লোভে কেকয় রাজপরিবার দুটি শত্রু শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
কেকয়রাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র বৃহৎক্ষত্র ও তাঁর চার ভাই ছিলেন পাণ্ডবভক্ত। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের ন্যায়পরায়ণতা দেখে তাঁরা নিজেদের পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষাবলম্বন করেন। অন্যদিকে, কেকয়রাজের ছোট ভাই (বা অন্য শাখাসন্তান) দুর্ধর্ষ সহদেব—যিনি হস্তিনাপুরের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন—কৌরবদের শিবিরে যোগ দেন এবং কেকয় রাজ্যের সিংহাসন দাবি করে ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
একই পরিবারের রক্ত, একই পতাকার ইতিহাস, অথচ কুরুক্ষেত্রের ধুলোয় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল কেকয়রাজের নিজেদেরই সন্তান ও আত্মীয়রা।
৩. কুরুক্ষেত্রের রক্তস্নাত পতন
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ সত্য হলো—কেকয় রাজপুত্রদের তেজ ও রণকৌশল। যুদ্ধের সময় কেকয়রাজ বৃহৎক্ষত্র ও তাঁর চার ভাই পাণ্ডবদের অক্ষৌহিণী বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে অসম সাহস দেখিয়েছিলেন। দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য ও কর্ণ—কৌরবদের শ্রেষ্ঠ মহারথীদের মুখোমুখি হতেও তাঁরা পিছপা হননি।
কিন্তু নিয়তি অন্যরকম চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। যুদ্ধের ১৪তম দিনে, যখন জয়দ্রথ বধের পর চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে, তখন কৌরবপক্ষের প্রধান যোদ্ধা দ্রোণাচার্যের সঙ্গে ভয়াবহ দ্বৈরথ শুরু হয় কেকয়রাজ বৃহৎক্ষত্রের। প্রবীণ আচার্যের অমোঘ বাণ বর্ষণে একে একে কেকয়রাজের বীর পুত্ররা বীরগতি প্রাপ্ত হন। মহাভারতের পাতায় আঁকা হয়ে যায় এক পিতার সমস্ত বংশপ্রদীপের একসঙ্গে নিভে যাওয়ার দৃশ্য।
এক রাজবংশের অবশেষ
যে কেকয়রাজ মৎস্যদেশের সেনাপতি কিচকের মতো শ্যালককে জন্ম দিয়েছিলেন, যাঁর কন্যাসন্তান রাজরানী হয়েও অজ্ঞাতবাসে দ্রৌপদীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, সেই কেকয়রাজের শেষ পরিণতি কিন্তু অত্যন্ত করুণ। কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিনের মহাধ্বংসলীলা শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, কেকয় রাজ্যের পরাক্রমশালী রাজবংশ সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে।
কুরুবংশের মহাবাটবৃক্ষের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া কেকয়রাজের এই গল্পটি কেবল যুদ্ধের নয়—এ হলো রক্তসূত্রের অহংকার, গৃহবিবাদ আর অন্ধ নিয়তির এক নিঃশব্দ হাহাকার।

Comments
Post a Comment