মহাপ্রাজ্ঞ জাম্ববান রামায়ণে প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা:


মহাপ্রাজ্ঞ জাম্ববান রামায়ণে প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা: 

মহাকাব্য রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের পক্ষে লঙ্কাজয় অভিযানে বহু বীর, সেনাপতি ও দেবঅংশের বীরগাথা বর্ণিত হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে প্রবীণতম, পরম শ্রদ্ধেয় এবং প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে যে চরিত্রটি স্বমহিমায় উজ্জ্বল, তিনি হলেন ভালুকরাজ ‘জাম্ববান’। তিনি কেবল বীর যোদ্ধা বা সেনাপতি ছিলেন না, বরং সমগ্র বানর ও ভালুকবাহিনীর প্রধান অভিভাবক, নীতিপ্রদর্শক এবং সংকটমোচনের দিশারী হিসেবে রামায়ণের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

পৌরাণিক বিশ্বাস ও মহাকাব্যের বিবরণ অনুযায়ী, জাম্ববানের উৎপত্তি হয়েছিল স্বয়ম্ভূ পিতামহ ব্রহ্মা থেকে। তিনি ছিলেন কালজয়ী ও অতি দীর্ঘায়ু এক চরিত্র। সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর—এই তিন যুগেই তাঁর মহিমান্বিত উপস্থিতির কথা জানা যায়। রামায়ণে (ত্রেতা যুগ) তিনি শতকোটি পৌরুষদীপ্ত ভালুকসেনার অধিপতি হিসেবে সুগ্রীব ও শ্রীরামের সেবা করেন। পরবর্তীকালে মহাভারতেও (দ্বাপর যুগ) শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর স্যমন্তক মণি উদ্ধারকে কেন্দ্র করে মল্লযুদ্ধ ও কন্যা জাম্ববতীর বিবাহের কাহিনী অত্যন্ত সুপরিচিত।

রামায়ণে জাম্ববানের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী ভূমিকা দেখা যায় কিষ্কিন্ধাকাণ্ড ও সুন্দরকাণ্ডের সন্ধিক্ষণে। সীতার খোঁজে দক্ষিণ অভিমুখে আসা বানর সেনাদল যখন অসীম মহাসমুদ্র দেখে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিল, তখন এই প্রাজ্ঞ প্রবীণই সংকট নিরসনে এগিয়ে আসেন। তিনি মহাবীর হনুমানের কাছে গিয়ে তাঁর ওপর থাকা অভিশাপের কথা মনে করিয়ে দেন এবং হনুমানের অসীম সুপ্ত শক্তির জাগরণ ঘটান। জাম্ববানের সেই তেজস্বী ও উৎসাহব্যাঞ্জক বাক্যই হনুমানকে লঙ্কাদগ্ধ ও মহাসমুদ্র লঙ্ঘনে অনুপ্রাণিত করেছিল।

লঙ্কাকাণ্ডের রণক্ষেত্রেও জাম্ববান তাঁর রণকৌশল ও বীরত্বের পরিচয় দেন। নগর প্রাকারের সুসংগঠিত ও দুর্ভেদ্য দক্ষিণ তোরণ আক্রমণের সময় লক্ষ্মণ ও বিভীষণের সঙ্গে যৌথভাবে নেতৃত্ব দিয়ে জাম্ববান রাক্ষসদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। আবার যুদ্ধের অন্যতম সংকটময় মুহূর্তে, যখন ইন্দ্রজিতের নাঘপাশে ও বিষাক্ত বাণে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ সহ সমগ্র সেনা মূর্ছিত হয়ে পড়েছিল, তখন জাম্ববানই প্রজ্ঞার সাথে হিমালয়ের গন্ধমাদন পর্বত থেকে সঞ্জীবিনী বুটি সহ চারপ্রকার মহৌষধি নিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, জাম্ববান ছিলেন রামায়ণের সেই ধীর-স্থির ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব, যাঁর জ্ঞান, ধৈর্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া লঙ্কাজয়ের মতো মহাকাব্যিক অভিযান সফল হওয়া অসম্ভব হতো। তিনি শক্তি অপেক্ষা প্রজ্ঞার শ্রেষ্ঠত্বকে মহাকাব্যে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)