ছায়ামানুষের উপহার: শিখণ্ডী ও এক যক্ষের অলৌকিক বিনিময়

 


ছায়ামানুষের উপহার: শিখণ্ডী ও এক যক্ষের অলৌকিক বিনিময়

নিয়তি মাঝে মাঝে মানুষকে এমন এক অচিন গোলকধাঁধায় এনে দাঁড় করায়, যেখান থেকে বেরোনোর কোনো সহজ পথ থাকে না। মহাভারতের পাতায় পাতায় যে রক্ত আর রাজনীতির খেলা, তার আড়ালে এক নিঃশব্দ হাহাকার জমে ছিল পাঞ্চাল রাজপ্রাসাদে। কারণ, যে আগুন ছাই থেকে আবার জন্ম নেয়, তাকে তো আর সাধারণ নিয়মে বাঁধা যায় না।

গল্পের শুরু সেই অদ্ভুত সত্যকে গোপন করার কসরত দিয়ে। কাশীর অম্বা যখন আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের ঘরে জন্ম নিলেন, শিবের বর অনুযায়ী দ্রুপদ জানতেন—এই কন্যাসন্তানই একদিন কুরুবংশের মহীরুহ পিতামহ ভীষ্মকে উপড়ে ফেলবে। কিন্তু লোকচক্ষুর ভয় আর শত্রুর কুনজর থেকে বাঁচাতে রাজকন্যাকে বড় করা হলো রাজপুত্রের মতো। অস্ত্রশিক্ষা, রথচালনা, রাজ্য শাসন—সবই শিখলেন তিনি। নাম রাখা হলো শিখণ্ডিনী। কিন্তু বাইরের পোশাক আর ধনুক দিয়ে কি রক্তের ভেতরের আসল সত্যকে ঢেকে রাখা যায়?

বিপদ নেমে এল বিয়ের পর। দাশার্ণ রাজকন্যার সাথে মহাসমারোহে বিয়ে হলো শিখণ্ডিনীর। কিন্তু বাসরঘরের পর্দা উঠতেই সত্য তার নির্মম মুখ দেখাল। প্রতারিত নববধূর বাবা দাশার্ণরাজ ক্রোধে ফেটে পড়লেন—পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন। যে শিখণ্ডিনী ভেবেছিলেন তিনি পিতার অহংকার হবেন, তিনিই হঠাৎ নিজের অজান্তে পুরো রাজ্যের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠলেন।

কী অপরাধ ছিল তাঁর? জন্ম ও লিঙ্গের এই টানাপোড়েনে তিনি তো কেবল এক নিয়তির পুতুল! অপরাধবোধের এক তীব্র দহন শুরু হলো তাঁর ভেতরে। কাউকে কিছু না জানিয়ে, এক রাতের অন্ধকারে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গভীর বনের দিকে পা বাড়ালেন শিখণ্ডিনী। উদ্দেশ্য একটাই—মানুষের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে নিজের এই অর্থহীন জীবন শেষ করে দেওয়া।

সেই নিবিড়, অন্ধকার অরণ্যে বাস করতেন স্থূণাকর্ণ নামের এক যক্ষ। বনের নির্জনতায় এক রাজপুত্রের রূপ ধরে থাকা নারীর কান্না আর অনাহারে তিলে তিলে মরে যাওয়ার এই জেদ দেখে যক্ষের মন কেঁপে উঠল। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন।

শিখণ্ডিনী তাঁর বিদীর্ণ হৃদয় খুলে দিলেন যক্ষের সামনে—অম্বার সেই পুরনো অপমানের কথা, জন্মের ভুল, আর বর্তমানে নিজের জন্য পিতা ও রাজ্যের ওপর নেমে আসা ঘোর বিপদের কথা।

সব শুনে যক্ষ স্থূণাকর্ণ এক অদ্ভুত, প্রায় অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, “হে রাজকন্যা, কেঁদো না। আমি তোমাকে আমার পুরুষত্ব দান করছি, আর বদলে তোমার নারীত্ব আমি গ্রহণ করছি। তুমি তোমার রাজ্যকে রক্ষা করো। কাজ শেষ হলে আবার ফিরে এসে আমার পুরুষত্ব আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যেও।”

এক নিমেষে বনে ঘটে গেল এক অলৌকিক রূপান্তর। স্থূণাকর্ণ হলেন নারী, আর শিখণ্ডিনী লাভ করলেন এক বলিষ্ঠ পুরুষদেহ। নতুন রূপ নিয়ে, নতুন সত্তা নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন তিনি—এখন আর তিনি শিখণ্ডিনী নন, তিনি পূর্ণ পুরুষ শিখণ্ডী। দাশার্ণরাজের সমস্ত সন্দেহ দূর হলো, পাঞ্চালের ওপর থেকে যুদ্ধের কালো মেঘ কেটে গেল।

কিন্তু নিয়তির খেলা কি সেখানেই শেষ হয়? যক্ষরাজ কুবের যখন নিজের অনুচরের এই কাণ্ড জানতে পারলেন, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে স্থূণাকর্ণকে অভিশাপ দিলেন—“এক মর্ত্যের মানুষের জন্য তুমি যক্ষজাতির নিয়ম ভেঙেছ! শিখণ্ডী যতদিন বেঁচে থাকবে, তোমাকে এই নারী রূপেই কাটাতে হবে।”

অভিশাপই শেষে বর হয়ে দাঁড়াল। স্থূণাকর্ণকে আর তাঁর পুরুষত্ব ফেরত নিতে হলো না, আর শিখণ্ডীকেও আজীবন বইতে হলো না কোনো ছদ্মবেশ। সেই যক্ষের দান করা শরীর নিয়েই কুরুক্ষেত্রের রক্তঝরা প্রান্তরে অর্জুনের রথের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শিখণ্ডী। আর তাঁরই আড়াল থেকে ছোড়া বাণে ধূলিসাৎ হয়েছিল পিতামহ ভীষ্মের অহংকার।

মহাভারতে রাজাদের মুকুট আর ধনুকের টঙ্কার হয়তো অনেক বেশি শব্দ তুলেছিল, কিন্তু বনের অন্ধকারে দুই ভিন্ন জগতের প্রাণীর এই অলৌকিক লেনদেন না হলে মহাভারতের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)