Posts

নল-দময়ন্তী কথা: (২য় ভাগ) দেব-আশীর্বাদ ও সর্বনাশের বীজ

Image
যুধিষ্ঠির মহর্ষি বৃহদশ্বের কাছ থেকে এমন এক রাজার গল্প শুনতে চেয়েছিলেন, যিনি রাজা যুধিষ্ঠিরের মতোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যপীড়িত ছিলেন। তাই বৃহদশ্ব গল্পটি শুরু করেছিলেন। এটি নল ও দময়ন্তীর পর্বটির ২য় ভাগ। প্রথম পর্বটি আগেই প্রকাশিত  হয়েছে। প্রথম পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন   বৃহদশ্ব মুচকি হাসলেন। তাঁর চোখের কোণে এক অদ্ভুত বিষাদের আলো। যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, "শোনো ধর্মরাজ, দময়ন্তী যখন সেই স্বয়ংবর সভায় সমস্ত দেবতাদের উপেক্ষা করে নলের গলায় বরমাল্য তুলে দিলেন, তখন কিন্তু চার দেবতা—ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ আর যম—সামান্যতম ক্ষুব্ধ বা অপমানিত বোধ করলেন না। মানুষের মনের এই অমোঘ টান, এই চতুর অথচ গভীর প্রেম দেখে বরং তাঁরা মনে মনে মুগ্ধই হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের মায়া-রূপ ত্যাগ করে নিজেদের আসল স্বরূপে প্রকট হলেন। তাঁদের স্বর্গীয় আভায় মর্ত্যের সেই রাজসভা যেন এক নিমেষে পবিত্র হয়ে উঠল। দেবতারা হাসিমুখে দম্পতিকে আশীর্বাদ করলেন। শুধু আশীর্বাদই নয়, চার দেবতা নলকে চারটি অলৌকিক বর দিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র বললেন, 'নল, তুমি যখনই মনে মনে আমাকে স্মরণ করবে, আমি উপস্থিত হব। আর কোনোদিন ত...

দেবতাদের হারিয়ে মর্ত্যের প্রেম: নল-দময়ন্তীর অমর উপাখ্যান-১ম ভাগ

Image
দেবতাদের হারিয়ে মর্ত্যের প্রেম: নল-দময়ন্তীর অমর উপাখ্যান-১ম ভাগ। যুধিষ্ঠির মহর্ষি বৃহদশ্বের কাছ থেকে এমন এক রাজার গল্প শুনতে চেয়েছিলেন, যিনি রাজা যুধিষ্ঠিরের মতোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যপীড়িত ছিলেন। তাই বৃহদশ্ব গল্পটি শুরু করেছিলেন।  ১. অনন্য এক রাজা ও এক না-দেখা রাজকুমারী বৃহদশ্ব একটু থামলেন। তারপর যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "অনেকদিন আগের কথা, ধর্মরাজ। নিষধ দেশে এক রাজা ছিলেন, নাম তাঁর নল। বীরসেনের ছেলে নল ছিলেন সর্বগুণসম্পন্ন। এমন রূপ, এমন পুরুষালি চেহারা খুব একটা দেখা যায় না। ঘোড়া ছোটানো আর তাদের বশ করার বিদ্যায় তাঁর জুড়ি ছিল না, বেদেও ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। আর যুদ্ধে? যুদ্ধে তিনি ছিলেন একাই এক সিংহের মতো পরাক্রমশালী। তবে হ্যাঁ, একটা দুর্বলতা ছিল তাঁর। পাশা খেলার প্রতি তাঁর এক অমোঘ টান ছিল। যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একাকিত্ব বোধ করছিলেন নল, মনে মনে একজন যোগ্য জীবনসঙ্গিনী খুঁজছিলেন। তরুণ রাজার মনে এমন ইচ্ছে জাগা তো কোনো অন্যায় বা লজ্জার কথা নয়। ঠিক সেই সময়েই বিদর্ভ রাজ্যে রাজত্ব করতেন রাজা ভীমক। হে ধর্মরাজ, ইনি কিন্তু তোমাদের সেই চেনা ভীম নন, ইনি অন্য একজন মান...

অন্ধকারের রাজপ্রাসাদে এক ফালি বিষাদের আলো

Image
  অন্ধকারের রাজপ্রাসাদে এক ফালি বিষাদের আলো ইন্দ্রলোকের মেঘের রাজ্যে তখন অর্জুন। মর্ত্যের কোনো মানুষের হাত যা ছুঁতে পারেনি, সেইসব অলৌকিক দৈবাস্ত্রের গোপন বিদ্যা তিনি আয়ত্ত করছেন একাগ্র মনে। কিন্তু ক্ষমতার সেই অলৌকিক খবর তো শুধু স্বর্গের দেবতারা জানবেন না, তা একসময় চুইয়ে নামল মর্ত্যের মাটিতেও। হস্তিনাপুরের অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কানে যখন এই সংবাদ পৌঁছাল, তখন তাঁর বুকের ভেতরটা একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল। ঠিক সেই সময়েই হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে পা রাখলেন মহর্ষি ব্যাসদেব। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের সামনে এসে বসলেন। ব্যাসদেবের কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত কিন্তু অমোঘ। তিনি কোনো লুকোছাপা না করে স্পষ্ট ভাষায় অন্ধ রাজাকে জানিয়ে দিলেন—মেঘের ওপারের সেই উচ্চতর জগতে অর্জুন কী কী অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। কোন কোন দিব্যাস্ত্র এখন তাঁর হাতের মুঠোয়, এবং ভবিষ্যতে কোন ভয়ানক উদ্দেশ্যে তিনি সেগুলো ব্যবহার করবেন, তার একটা নিখুঁত ছবি এঁকে দিলেন ব্যাসদেব। যা বলার তা বলা হয়ে গেলে, মহর্ষি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না, নগরের ধুলো উড়িয়ে বিদায় নিলেন। ব্যাসদেব চলে যাওয়ার পর ধৃতরাষ্ট্র দীর্ঘক্ষণ একাকী বসে রইলেন। চারপাশের জমাট অন্ধ...

অমরাবতীর অলিন্দে পাঁচ বছর: অর্জুনের স্বর্গবাসের দিনলিপি

Image
অমরাবতীর অলিন্দে পাঁচ বছর: অর্জুনের স্বর্গবাসের দিনলিপি মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন তার ভেতরের সমস্ত ভার—কর্তব্যের দায়, বনবাসের গ্লানি, পাশাখেলায় সর্বস্ব খোয়ানোর অপমান আর ভরা রাজসভায় অপমানিত দ্রৌপদীর সেই করুণ মুখ—সবকিছু মিলেমিশে এমন এক অখণ্ড পাথর হয়ে ওঠে যে, নিজের অস্তিত্ব আর সেই বোঝার তফাত করা যায় না। কাম্যক বনের ভাইদের ছেড়ে এসে যখন অর্জুন হিমালয়ের নিস্তব্ধ চূড়ায় একা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাঁর পিঠেও ছিল এই অন্তহীন বোঝা। কিন্তু আজ যেন ভেতরের হাওয়াটা একটু বদলেছে। তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে আছে এমন সব অস্ত্র, যা মর্ত্যের কোনো রাজা কোনোদিন চোখেও দেখেনি—দেবতাদের উপহার, এক অলৌকিক ঐশ্বর্যের স্মারক। অর্জুনের বুকের ভেতর এখন এক গভীর, অচঞ্চল শান্তি। কাম্যক বন থেকে যে মানুষটা বেরিয়েছিল, এই মানুষটা আর সে নয়। তিনি এখন অপেক্ষা করছেন। একটা রথের অপেক্ষা। মাতলির আগমন ও স্বর্গের আহ্বান অপেক্ষা দীর্ঘ হলো না। হঠাৎই হিমালয়ের শৃঙ্গগুলোর ওপর আকাশের আলো এমনভাবে বদলে গেল, যার সাথে সূর্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এ এক অন্যরকম আলো—ঘন, স্থির, যার নিজস্ব একটা ওম আছে। তারপর কানে এলো সেই শব্দ। এক গভীর, গুরুগম্ভীর প্রতিধ্বনি...

কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক

Image
  কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক বিষ কেবল প্রাণ হরণ করে না, বিষের এক নিজস্ব অহংকার আছে। সে চারপাশের বাতাস, জল আর মাটিকে নিজের মতো করে কলুষিত করতে চায়। যমুনার সেই গভীর দহটি বহু বছর ধরে সেই রকমই এক অহংকারী বিষের নীল চাদরে ঢাকা পড়েছিল। বৃন্দাবনের মানুষ নদীর দিকে যাওয়া ভুলেই গিয়েছিল। গাভীগুলো জল ছুঁত না, ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি আচমকা ডানা ঝটপট করে মরে ভেসে উঠত কালো জলের বুকে। তীরের কদম্ব গাছটি হয়ে গিয়েছিল অবশ, কুচকুচে কালো। যমুনার যে জল হওয়া উচিত ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ আর শীতল, তা এক উগ্র, তপ্ত বিষের কামড়ে সারাক্ষণ ফুটত, বুদবুদ তুলত। সেই দহের অতল অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল কালীয়। তিন ভুবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে অহংকারী নাগরাজ। সে ভাবত, এই নদী, এই জল—সব তার নিজস্ব সাম্রাজ্য। চারপাশের এই মৃত্যু আর ধ্বংসকে সে তার রাজকীয় অধিকার বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু নাগরাজ ভুল ভেবেছিল। আর সেই ভুলটা ভেঙে দেওয়ার জন্য যমুনার ঘাটে এসে দাঁড়াল এক নীল রঙের বালক। রামনক দ্বীপ থেকে বৃন্দাবন: এক পলাতকের ইতিহাস কালীয় চিরকাল যমুনার বাসিন্দা ছিল না। তার আসল ঘর ছিল মহাসমুদ্রের বুকে এক নির্জন ভূখণ্ড—রা...

দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ

Image
দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের বুকে এমন এক দুঃশ্চিন্তা বহু যুগ ধরে পাথরের মতো চেপে ছিল, যার সমাধান তিনি নিজেও করতে পারছিলেন না। শত্রু যদি সাধারণ শত্রু হয়, তবে বজ্রধারী ইন্দ্রের পক্ষে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি সেই শত্রুকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এমন আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন, যা তাকে দেবতাদের কাছেও অজেয় করে তোলে, তবে? অর্জুনের জন্মের বহু আগে, হস্তিনাপুরে পাশা খেলার বহু আগে, পাণ্ডবদের বনবাসেরও বহু আগে, স্বর্গলোকের আকাশে এই এক নামই আতঙ্কের ছায়া হয়ে ভাসত— নিবাতকবচ। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত নিয়ম। যে সমস্যার সমাধান যুগ যুগ ধরে দেবতারা খুঁজে পাননি, তার উত্তর একদিন এসে দাঁড়াল এক মানবযোদ্ধার হাতে— যার হাঁটুর উপর বিশ্রাম নিচ্ছিল গাণ্ডীব ধনুক, আর যার রথ ছুটছিল স্বর্গের পথে। নিবাতকবচদের জন্ম ও তপস্যা অতি প্রাচীন কালে, যখন দেবতা ও অসুরদের সংঘর্ষ ছিল জগতের নিয়মের মতো স্বাভাবিক, তখন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির গর্ভে জন্ম নেয় এক শক্তিশালী অসুরগোষ্ঠী। এদের নাম ছিল নিবাতকবচ। দেবতাদের মতোই তারা কশ্যপের সন্তান। অর্থাৎ, দেবতা ও অসুর আ...

কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান

Image
কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান মর্ত্যের ধুলোবালি আর রক্তের তৃষ্ণা থেকে অনেক দূরে, অমরাবতীর স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোয় সেদিন এক অদ্ভুত নাটক তৈরি হচ্ছিল। দেবরাজ ইন্দ্রের আমন্ত্রণে অর্জুন তখন স্বর্গলোকে। উদ্দেশ্য—দিব্য অস্ত্র লাভ এবং গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্য-গীতের শিক্ষা নেওয়া। অর্জুনের সেই ক্লান্তিহীন, পেশীবহুল শরীর, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মহাসমুদ্রের গাম্ভীর্য আর বীরত্ব দেখে স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা উর্বশীর রক্তে দোলা লাগল। যে উর্বশীর এক একটি পলকপাতে ত্রিলোকের মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভেঙে যায়, সে আজ মর্ত্যের এক ধনুর্বাজির সামনে ব্যাকুল, কামনার আগুনে দগ্ধ। দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই উর্বশীকে পাঠালেন অর্জুনের কক্ষে। বসন্তের মায়াবী বাতাসে উর্বশী যখন অর্জুনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর পরনে সূক্ষ্ম মেঘের মতো বসন, চোখে মদিরার আহ্বান, আর ঠোঁটে এক আদিম আদিখ্যেতা। স্বর্গের নিয়ম আলাদা; সেখানে সম্পর্ক মানে শুধুই মুহূর্তের আনন্দ, সেখানে কোনো মর্ত্যের বন্ধন নেই। কিন্তু অর্জুন? তিনি তো শুধু এক জন মহান যোদ্ধা নন, তিনি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির ধারক। উর্বশীর সেই উত...