কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ

 


Wat Watch Morech

কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ

সে এক অদ্ভুত সময়। কুরুরাজ্যে তখন কেবলই বসন্তের সমীরণ। হস্তিনাপুরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে যেন উৎসবের রোশনাই। মহারাজ বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তাকে পূর্ণ করতেই যেন মর্ত্যে এলেন ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু আর বিদুর। প্রজারা সুখে আছে, ঘরে ঘরে ধনের অভাব নেই, এমনকি রাজধানীর রাজপথে কোনো চোর-ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রবও নেই। এক কথায়, কুরুরাজ্য তখন এক পুষ্পিত উদ্যান।

ভীষ্মের কড়া শাসনে আর স্নেহের ছায়ায় বেড়ে উঠছে তিন ভাই। তিনজনেরই তিন রূপ। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হলেও তাঁর শরীরে যেন সহস্র হস্তীর বল। লৌহদণ্ড অবলীলায় দুমড়ে দিতে পারেন তিনি। পাণ্ডু আবার ধনুর্ধর হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তীরের ফলায় তিনি আকাশ ছুঁতে চান। আর বিদুর? তাঁর মধ্যে বাস করেন সাক্ষাৎ ধর্ম। শান্ত, ধীর আর অসীম প্রজ্ঞার অধিকারী সেই মানুষটি।

কিন্তু নিয়তির লিখন বড় অদ্ভুত। বিদুর পরম জ্ঞানী হলেও তিনি দাসীপুত্র, তাই সিংহাসনের উত্তরাধিকার তাঁর নেই। বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল রাজমুকুট, কিন্তু তাঁর চোখের অন্ধকার সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। শাস্ত্র আর আচারের দোহাই দিয়ে কনিষ্ঠ পাণ্ডুকেই বেছে নেওয়া হলো আগামীর যুবরাজ হিসেবে। ধৃতরাষ্ট্রের অন্তরে সেই অন্ধকারের দহন কি সেদিন কেউ টের পেয়েছিল?

ঠিক সেই সময়েই ভীষ্মের কানে এল গান্ধার রাজ্যের রাজকন্যা গান্ধারীর কথা। রাজা সুবলের কন্যা তিনি—যেমন বুদ্ধিমতী, তেমনই গুণবতী। ভীষ্ম স্থির করলেন, এই মেয়েটিই হতে পারে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের যোগ্য জীবনসঙ্গিনী। কিন্তু প্রস্তাব যেতেই রাজা সুবল থমকে গেলেন। নিজের রূপবতী কন্যাকে এক জন্মান্ধের হাতে তুলে দেবেন? পিতা হিসেবে তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না।

কিন্তু ভীষ্ম তো শুধু এক যোদ্ধা নন, তিনি এক অটল জেদ। তাঁর বারংবার অনুরোধ আর কুরুবংশের সম্মানের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত সুবল রাজি হলেন। বোন গান্ধারীকে নিয়ে হস্তিনাপুরে পা রাখলেন শকুনি।

গান্ধারী যখন শুনলেন তাঁর স্বামী দৃষ্টিহীন, তাঁর অন্তরে কোনো হাহাকার জাগল না। বরং এক অদ্ভুত তেজ ফুটে উঠল সেই কিশোরীর মুখে। তিনি ভাবলেন, স্বামী যা দেখতে পাবেন না, সেই রূপ-রস-রঙের মায়ায় তিনিও মজবেন না। এক টুকরো রেশমি বস্ত্র দিয়ে নিজের চোখ দুটি সজোরে বেঁধে ফেললেন তিনি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন—আজীবন এই অন্ধত্বই হবে তাঁর সহচর। পতির যে জগৎ অন্ধকার, স্ত্রীর জগৎও তাই হবে।

ভীষ্মের আশীর্বাদে মহাসমারোহে বিবাহ সম্পন্ন হলো। হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। গান্ধারী তাঁর সেবা, ধৈর্য আর অসামান্য বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করে নিলেন সবার মন। অন্ধ স্বামীর ছায়া হয়ে থেকে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, বাইরের চোখ বুজলেও অন্তরের আলো দিয়েও সংসার সাজানো যায়।

কুরুবংশের সেই শান্ত হ্রদে তখনো কোনো ঢেউ ওঠেনি। কিন্তু অন্দরের গভীরে কি কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল? সে কথা কেবল মহাকালই জানত।


Comments

Popular posts from this blog

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত।

দ্রৌপদীর প্রশ্ন — কুরুসভায় এক নারীর আর্তনাদ