আম্রপালি যে মেয়ে একজন সাধারণ ভিক্ষুকের মধ্যে অসাধারণ কিছু দেখেছিল

  Watch More

আম্রপালি যে মেয়ে একজন সাধারণ ভিক্ষুকের মধ্যে অসাধারণ কিছু দেখেছিল

বৈশালী শহরটা তখন ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রানবন্ত  শহরগুলোর একটা।

লিচ্ছবি রাজাদের রাজধানী। গঙ্গার কাছে, সবুজে ঘেরা। বাজারে বিদেশি বণিক, রাজপথে হাতির মিছিল, সন্ধ্যায় প্রদীপের আলোয় ঝলমল করত পুরো নগর।আর এই নগরের সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল একটি মেয়ের।

সে কোথা থেকে এসেছিল কেউ ঠিকমতো জানত না। কেউ বলত রাজবংশের রক্ত আছে তার। কেউ বলত একটা আমবাগানে শিশু অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তাই নাম আম্রপালি।সত্যিটা যাই হোক — একটা জিনিস সত্যি ছিল।সে ছিল অপরিসীম সুন্দরী।


আর বৈশালীর নিয়মে সেই সৌন্দর্যই তার ভাগ্য লিখে দিয়েছিল। নগরের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে হবে নগরবধূ। কোনো একজনের নয়, সকলের। রাজা আসবেন, মন্ত্রী আসবেন, বণিক আসবেন — সবার আতিথেয়তা করবে সে।এই নিয়মটা কে বানিয়েছিল, কেন বানিয়েছিল — সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি।

আম্রপালিকেও করতে দেওয়া হয়নি।বছরের পর বছর কেটে গেল।বৈশালীর সবচেয়ে বড় প্রাসাদ তার। সবচেয়ে সুন্দর বাগান তার। সোনার গহনা, রেশমের পোশাক, দাসদাসী। রাজারা তার দরজায় আসতেন। মগধের রাজা বিম্বিসার পর্যন্ত তার প্রেমে পড়েছিলেন।

কিন্তু রাতে যখন সব অতিথি চলে যেত — প্রাসাদের বড় ঘরে একা বসে থাকত আম্রপালি।

একটা শূন্যতা ছিল। কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা। নাম দেওয়া যাচ্ছিল না সেটাকে। কিন্তু ছিল। প্রতিটা রাতে।

সেই সময়ে বৈশালীতে একটা কথা ছড়িয়ে পড়ল।গৌতম বুদ্ধ কাছেই আছেন। বেলুবন কুঞ্জে তাঁবু ফেলেছেন তাঁর শিষ্যরা। তিনি জ্ঞানের কথা বলেন, মুক্তির কথা বলেন। রাজা থেকে ভিখিরি — সবাই তাঁর কাছে যায়, সবাই ফেরে হালকা হয়ে।

আম্রপালি শুনল।মনে একটু নাড়া দিল। কিন্তু সে কি যেতে পারবে? নগরবধূ কি সাধুর কাছে যায়?তারপর একদিন সকালে তার দরজায় এল একজন মানুষ।

গেরুয়া কাপড়। মাথা নেড়া। পায়ে ধুলো। হাতে একটা মাটির ভিক্ষাপাত্র।বুদ্ধের শিষ্য। ভিক্ষুক।

সে একটু আশ্রয় চাইছে। কয়েকদিনের জন্য। গুরুর অনুমতি নিয়েই এসেছে। বৈশালীতে থেকে ধর্মপ্রচার করবে।আম্রপালির দরজায় অনেক মানুষ এসেছে। কিন্তু এমন মানুষ আসেনি কখনো।

এই মানুষটা কিছু নিতেআসেনি। শুধু একটু ছাদ চাইছে মাথার উপর।আম্রপালি বলল — আসুন।ভিক্ষুক এলেন।প্রাসাদের একটা ছোট্ট ঘর দেওয়া হল তাঁকে। কোনো সাজসজ্জা নেই, বিছানা নেই বিশেষ। শুধু একটা চাটাই আর একটু ছাদ।

ভিক্ষুক সেটাতেই খুশি।প্রথম দিন থেকেই আম্রপালি লক্ষ করল কিছু একটা।ভোর হতে না হতে ভিক্ষুক উঠে বসেন। চোখ বুজে। নিঃশব্দে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নড়েন না। কথা বলেন না। শুধু বসে থাকেন।সেই বসে থাকার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায় — এই মানুষটা ভেতরে কোথাও আছেন যেখানে পৌঁছানো সহজ নয়।সকালে বের হন ভিক্ষাপাত্র নিয়ে। যা পান তাই খান। বিকেলে ফেরেন। আবার বসেন। আবার সেই নিঃশব্দ।রাতে কোনো শব্দ নেই তাঁর ঘর থেকে।আম্রপালির প্রাসাদে প্রতিরাতে উৎসব হত।

সংগীত বাজত, নাচ হত, হাসির শব্দ থাকত। অতিথিরা আসত, যেত।কিন্তু সেই ছোট্ট ঘরে একটা মানুষ ঘুমিয়ে পড়তেন নিঃশব্দে। সব হইচই পেরিয়ে।আম্রপালি একদিন দুপুরে গেল তাঁর কাছে।

জিজ্ঞেস করল — আপনি সারাদিন চোখ বুজে বসে থাকেন। কী দেখেন? ভিক্ষুক চোখ খুললেন। একটু হাসলেন।

বললেন — বাইরে চোখ বুজি, ভেতরে চোখ খুলি।আম্রপালি বুঝল না পুরোটা। কিন্তু কথাটা মাথায় রয়ে গেল।কয়েকদিন কাটল।আম্রপালি আস্তে আস্তে লক্ষ করতে লাগল আরও কিছু।

এই মানুষটার চোখে কোনো লোভ নেই। তার প্রাসাদের সম্পদ দেখে চোখ বড় হয় না। তার সৌন্দর্য দেখে অন্যদের মতো মুগ্ধ হন না। তাকে দেখেন — একজন মানুষ হিসেবে। শুধু একজন মানুষ।এই দৃষ্টি সে আগে পায়নি।যারা তার কাছে আসত, তারা আসত কিছু নিতে। কিন্তু এই মানুষটা কিছুই নিচ্ছেন না। শুধু আছেন।একদিন সন্ধ্যায় আম্রপালি আবার গেল।বলল — আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

ভিক্ষুক বললেন — বলো।

আম্রপালি বলল — আমার মতো মানুষের কি মুক্তি হয়?কথাটা বলতে গিয়ে গলা একটু কাঁপল তার।ভিক্ষুক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন — মুক্তির দরজায় কোনো পাহারাদার নেই। কেউ জিজ্ঞেস করে না — তুমি কে? কোথা থেকে এলে? কী করতে?আম্রপালির চোখে জল এল।

প্রথমবারের মতো।এতদিনে কাঁদেনি। রাজারা যখন তাকে সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন, তখনও না। একা রাত কাটিয়েছে, তখনও না।আজ কাঁদল।সেই রাতে আম্রপালি অনেকক্ষণ জেগে রইল।

ভেতরে কিছু একটা নড়ছে। পুরনো কিছু ভাঙছে। নতুন কিছু জন্ম নিচ্ছে।সে ঠিক করল — এই মানুষটার গুরুকে দেখতে হবে।পরদিন সকালে ভিক্ষুক বের হচ্ছিলেন।আম্রপালি বলল — আপনার গুরুর কাছে নিয়ে যাবেন আমাকে?ভিক্ষুক থামলেন।বললেন — তুমি কি সত্যিই যেতে চাও?আম্রপালি বলল — সারাজীবন মানুষ আমার কাছে এসেছে। এবার আমি যেতে চাই।

বেলুবন কুঞ্জে সেদিন অনেক মানুষ।শত শত ভিক্ষুক। গৃহস্থ মানুষ। রাজার লোক। সবাই এসেছেন বুদ্ধের কাছে।আম্রপালি গেল সেই ভিক্ষুকের সাথে।তাকে দেখে মানুষ ফিসফিস করল। কানাঘুষো হল। নগরবধূ বুদ্ধের কাছে? কেউ কেউ মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু ভিক্ষুক এগিয়ে চললেন। আম্রপালিও।

বুদ্ধ বসে আছেন।একটা বটগাছের নিচে। চোখ বন্ধ। তারপর খুললেন।আম্রপালি প্রথমবার দেখল সেই চোখ।

সেখানে কোনো বিচার নেই। কোনো কৌতূহল নেই। কোনো করুণা নেই — করুণা মানে তো একটু উঁচু থেকে দেখা। সেটাও নেই।শুধু আছে একটা অসীম শান্তি। যেন এই মানুষটা সব দেখেছেন। সব জানেন। তবু কোনো ধাক্কা লাগেনি তাঁকে।

আম্রপালি প্রণাম করল।মাটিতে মাথা রাখল।বুদ্ধ বললেন — উঠে বসো।আম্রপালি উঠল।

বুদ্ধ বললেন — আমার শিষ্য তোমার কথা বলেছে। তুমি প্রশ্ন করেছিলে — আমার মতো মানুষের কি মুক্তি হয়?

আম্রপালি বলল — হ্যাঁ প্রভু।

বুদ্ধ বললেন — তুমি ভুল প্রশ্ন করেছিলে।

আম্রপালি চমকে উঠল।

বুদ্ধ বললেন — প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল — মুক্তি কি হয়? উত্তর — হয়। তারপর প্রশ্ন — কার হয়? উত্তর — যে চায় তার। তুমি কি চাও?আম্রপালি বলল — চাই।বুদ্ধ বললেন — তাহলে তুমি পাবে।

সেই মুহূর্তে আম্রপালির ভেতরে কী হয়েছিল সেটা ভাষায় বলা কঠিন।অনেকদিনের একটা ভার হঠাৎ নামল। অনেকদিনের একটা প্রশ্নের জবাব মিলল। অনেকদিনের সেই ফাঁকা জায়গাটায় কিছু একটা ভরে গেল।

সে বলল — প্রভু, আমি আপনার শিষ্যা হতে চাই।সেদিন সভায় অনেকে অবাক হয়েছিল।

নগরবধূ ভিক্ষুণী হবে?কিন্তু বুদ্ধ রাজি হলেন।

কারণ তিনি জানতেন — এই মেয়ের মনে যে আগুন জ্বলছে সেটা অনেকের চেয়ে বেশি খাঁটি। কারণ সে অনেক কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট পেলে মানুষ হয় ভেঙে পড়ে, নয়তো সত্যিকারভাবে খোঁজে।আম্রপালি খুঁজেছিল।

সেদিন আম্রপালি হল বুদ্ধের প্রথম ভিক্ষুণীদের একজন।

মাথার কালো চুল কাটা গেল। সুন্দর পোশাক গেল। গহনা গেল। প্রাসাদ পরে সংঘকে দান করে দিল সে।

পরে সে কবিতা লিখেছিল।

থেরীগাথায় সেই কবিতা আজও আছে। পালি ভাষায়।সে লিখেছিল — একসময় তার চুল ছিল কালো এবং সুগন্ধী। এখন বয়সের ভারে রুক্ষ। একসময় তার গাল ছিল মসৃণ, ঠোঁট ছিল লাল। এখন সব বদলে গেছে।

কিন্তু শেষ লাইনে লিখেছিল —

এই শরীর সত্য বলছে। যা মিথ্যা ছিল তা গেছে। যা আসল ছিল তা রয়ে গেছে।

আড়াই হাজার বছর আগের গল্প। কিন্তু প্রশ্নটা আজও একই — আমরা মানুষকে তার পরিচয়ে বিচার করি, না তার মনে?আম্রপালি উত্তর দিয়ে গেছেন। নিজের জীবন দিয়ে।

Comments

Popular posts from this blog

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

দ্রৌপদীর প্রশ্ন — কুরুসভায় এক নারীর আর্তনাদ

অগ্নিগর্ভ পাঞ্চালী: বিরাটনগরে কীচক দম্ভের অবসান