অগ্নিগর্ভ পাঞ্চালী: বিরাটনগরে কীচক দম্ভের অবসান


অগ্নিগর্ভ পাঞ্চালী: বিরাটনগরে কীচক দম্ভের অবসান

মহাভারতের অজ্ঞাতবাস পর্বের সেই রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়—যেখানে পাণ্ডবপত্নী দ্রৌপদীকে নিজের কামনার শিকার বানাতে চেয়েছিল মৎস্যরাজ বিরাটের শ্যালক কীচক। 

বিরাটনগরের অগ্নিকণা: দ্রৌপদী ও কীচকের দম্ভ

বিরাটনগরের রাজপ্রাসাদে তখন সন্ধ্যা নামছে। কিন্তু সৈরিন্ধ্রী রূপী পাঞ্চালীর মনে কোনো শান্তি নেই। মহাবীর অর্জুনের পত্নী, পঞ্চপাণ্ডবের গর্ব আজ এক সামান্য দাসীর বেশে মহারানী সুদেষ্ণার সেবা করছেন। কিন্তু তাঁর এই ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রূপই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

কামনার বিষাক্ত দৃষ্টি

বিরাট রাজার শ্যালক এবং মৎস্য দেশের প্রধান সেনাপতি কীচক। বীর হিসেবে তার খ্যাতি থাকলেও চারিত্রিক অধঃপতন ছিল চরমে। একদিন রাজপ্রাসাদে দ্রৌপদীকে দেখে তার লালসার আগুন জ্বলে উঠল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মহারানী সুদেষ্ণাকে গিয়ে বলল:

"দিদি, তোমার এই দাসী তো কোনো সাধারণ নারী নয়! ওর রূপের ছটায় আমার প্রাসাদ অন্ধকার হয়ে গেছে। ওকে আমার চাই-ই চাই।"


সুদেষ্ণা জানতেন তাঁর ভাই কতটা দুর্ধর্ষ, কিন্তু তিনি সৈরিন্ধ্রীর তেজকেও ভয় পেতেন। তবুও ভাইয়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে তিনি দ্রৌপদীকে এক পাত্র মদ্য নিয়ে কীচকের প্রাসাদে পাঠালেন।

সতীত্বের অপমান ও আর্তনাদ

দ্রৌপদী বুঝেছিলেন বিপদ আসন্ন। তিনি মনে মনে দেবতাদের স্মরণ করে কীচকের কক্ষে প্রবেশ করলেন। পাঞ্চালীকে একা পেয়ে কীচক তার লোলুপ হাত বাড়িয়ে দিল।

"সৈরিন্ধ্রী! কেন এই দাসীবৃত্তি? আমার অঙ্কশায়িনী হও, মৎস্য দেশের রানী করে রাখব তোমাকে!"—কীচকের এই দম্ভোক্তি শুনে দ্রৌপদীর চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হতে লাগল। তিনি এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাজসভার দিকে দৌড়াতে শুরু করলেন। উন্মত্ত কীচক তাঁকে তাড়া করল এবং খোদ রাজসভার সামনে দ্রৌপদীকে চুলে ধরে পদাঘাত করল।

অসহায় দ্রৌপদী সজল চোখে কঙ্ক (যুধিষ্ঠির) ও বল্লভের (ভীম) দিকে তাকালেন। যুধিষ্ঠির তখন পাশা খেলায় মগ্ন, ধর্মরক্ষার খাতিরে তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। কিন্তু ভীমের চওড়া বুক অপমানে ফুঁসতে লাগল। তাঁর হাত বারবার পাশের শালগাছটার দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের ইশারায় তিনি শান্ত হতে বাধ্য হলেন।

দ্রৌপদীর শপথ ও ভীমের প্রতিজ্ঞা

সেই রাতে দ্রৌপদী রন্ধনশালায় গিয়ে ভীমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁর সেই অপমানিত চোখের জল ভীমকে বিচলিত করে তুলল। দ্রৌপদী বললেন, "হে বৃকোদর, যে চুলে কীচকের হাতের স্পর্শ লেগেছে, সেই অপমান আমি সইব কী করে? যদি তুমি আজ প্রতিশোধ না নাও, তবে আমি নিজের প্রাণ ত্যাগ করব।"

ভীম গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন, "কেঁদো না কৃষ্ণা। কালকের সূর্যোদয় কীচক আর দেখতে পাবে না। কাল রাতে তুমি তাকে নির্জন নৃত্যশালায় আসতে বলো।"

মহাকালের বিচার

পরদিন মধ্যরাতে কীচক সুসজ্জিত হয়ে প্রমোদকক্ষে প্রবেশ করল। সে ভেবেছিল সৈরিন্ধ্রী সেখানে তার প্রতীক্ষায় আছে। অন্ধকারে এক নারীকে শায়িত দেখে সে আনন্দে বলে উঠল, "প্রিয়ে, অবশেষে এলে তুমি?"

কিন্তু শয্যা থেকে উঠে দাঁড়াল এক বিশালদেহী পুরুষ। মহাকালের মতো গর্জে উঠলেন ভীম। শুরু হলো মল্লযুদ্ধ। কীচকের দম্ভ চূর্ণ করে ভীম তাকে এমনভাবে প্রহার করলেন যে তার হাড়গোড় মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো। পরদিন সকালে বিরাটনগর দেখল এক বীভৎস দৃশ্য—অত্যাচারী কীচক এক মাংসের স্তূপে পরিণত হয়েছে।


Comments

Popular posts from this blog

আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে

কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া