অষ্টবসু ও শাপমুক্তির কাহিনি

 


Watch More

অষ্টবসু ও শাপমুক্তির কাহিনি

সেই সুদূর অতীতের কথা। মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে ছিল এক অলৌকিক গাভী — নাম তার নন্দিনী। যে কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে পারত সে। একদিন স্বর্গের আট ভাই, যাদের বলা হয় অষ্টবসু, তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে সেই বনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভাইদের মধ্যে দ্যু তাঁর স্ত্রীর পীড়াপিড়িতে আর বাকি ভাইদের মদদে সেই নন্দিনী ও তার বাছুরটিকে চুরি করে নিলেন।

ধ্যানের মধ্যে বশিষ্ঠ সব বুঝতে পারলেন। রাগে তাঁর মন জ্বলে উঠল। তিনি অভিশাপ দিলেন — অষ্টবসুকে মানুষ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিতে হবে। বসুরা পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইলে মুনি কিছুটা নরম হলেন। বললেন, সাতজন জন্মের পরপরই মুক্তি পাবে, স্বর্গে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু যে চুরি করেছে, সেই দ্যুকে দীর্ঘকাল মাটির পৃথিবীতে কাটাতে হবে — তবে সে হবে মহান, অতুলনীয় বীর।

এরপর অষ্টবসুরা গেলেন দেবী গঙ্গার কাছে। অনুরোধ করলেন, মর্ত্যে তিনি যেন তাঁদের মা হন। গঙ্গা রাজি হলেন।

এদিকে হস্তিনাপুরের রাজা প্রতীপের ছেলে শান্তনু একদিন গঙ্গার তীরে শিকারে বেরিয়ে এক অপরূপ নারীকে দেখলেন। তিনিই দেবী গঙ্গা। শান্তনু বিয়ের প্রস্তাব দিলে গঙ্গা একটাই শর্ত রাখলেন — "আমি যা-ই করি, তুমি কখনো বাধা দেবে না, প্রশ্ন করবে না। যেদিন করবে, সেদিনই চলে যাব।" প্রেমের টানে শান্তনু রাজি হয়ে গেলেন।

বিয়ের পর একে একে সাতটি পুত্র জন্ম নিল। আর প্রতিটি সন্তান জন্মানোর পরপরই গঙ্গা তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। শান্তনুর বুক ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু শর্তের ভয়ে মুখে কিছু আসছিল না। এই সাতজনই ছিলেন সেই অভিশপ্ত সাত বসু — গঙ্গার হাত ধরে তাঁরা শাপমুক্ত হয়ে স্বর্গে ফিরে গেলেন।

অষ্টম সন্তান জন্মাল। গঙ্গা তাকেও নদীতে নিয়ে যেতে উদ্যত হলেন। এবার আর পারলেন না শান্তনু। চিৎকার করে উঠলেন — "থামো! এ কী করছ তুমি? নিজের সন্তানকে এভাবে মারছ?"

গঙ্গা শান্তভাবে বললেন, "মহারাজ, শর্ত ভাঙলেন আপনি। এখানেই আমাদের পথ আলাদা। এই ছেলেটি আসলে সেই দ্যু — যাকে বশিষ্ঠের শাপ দীর্ঘকাল ধরে রেখেছে পৃথিবীতে। একে আমি নিয়ে যাচ্ছি, যোগ্য করে গড়ে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব।"

বহু বছর পর গঙ্গা সেই পুত্রকে সব বিদ্যায় পারদর্শী করে শান্তনুর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। পৃথিবী তাকে চিনল দেবব্রত নামে। আর পরবর্তীকালে তাঁর এক অটল ভীষণ প্রতিজ্ঞার কারণে সারা জগৎ তাঁকে ডাকল **ভীষ্ম** বলে — এক নাম, এক কিংবদন্তি।

Comments

Popular posts from this blog

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

দ্রৌপদীর প্রশ্ন — কুরুসভায় এক নারীর আর্তনাদ

অগ্নিগর্ভ পাঞ্চালী: বিরাটনগরে কীচক দম্ভের অবসান