পরাশর: মহাভারতের সেই নেপথ্য কারিগর
পরাশর: মহাভারতের সেই নেপথ্য কারিগর
ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে এমন কিছু মানুষের দেখা পাওয়া যায়, যাঁরা মঞ্চের সামনে থাকেন না ঠিকই, কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে পুরো নাটকের মোড় ঘুরিয়ে দেন। মহর্ষি পরাশর মানুষটি ঠিক তেমনই। আজ যদি আমরা কুরুবংশের সেই বিশাল মহীরুহটার দিকে তাকাই, তবে মনে প্রশ্ন জাগে—পরাশর না থাকলে কি এর জন্ম হতো? উত্তরটা খুব সহজ—না। কুরু-পাণ্ডবদের সেই দীর্ঘ রক্তধারার আদি উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে যমুনার তীরের এক কুয়াশাচ্ছন্ন নৌকায়।
যমুনার সেই মায়াবী কুয়াশা
গল্পটা শুরু হয় এক মায়াবী পরিবেশে। তপোবন ছেড়ে কোনো এক প্রয়োজনে যমুনা নদী পার হচ্ছেন মহাতপা পরাশর। খেয়া বাইছে এক ধীবর কন্যা—নাম তার মৎস্যগন্ধা। পরাশর সাধারণ ঋষি ছিলেন না, তিনি ছিলেন কালদ্রষ্টা। দিব্যচক্ষু দিয়ে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, সামনেই এক ঘোর অন্ধকার সময় আসছে—যাকে আমরা বলি কলিযুগ। সেই যুগে বেদের পবিত্র জ্ঞানকে রক্ষা করার জন্য এক মহাপ্রাণের পৃথিবীতে আসা খুব প্রয়োজন। আর সেই জন্মের শ্রেষ্ঠ আধার হিসেবে তিনি বেছে নিলেন এই কিশোরী কন্যাকে।
পরাশর মৎস্যগন্ধার কাছে তাঁর ইচ্ছের কথা জানালেন। কুমারী কন্যাটি লোকলজ্জার ভয়ে কুঁকড়ে যেতেই ঋষি তাঁর যোগবলে নদীজুড়ে সৃষ্টি করলেন এক নিবিড় কুয়াশা। সেই কৃত্রিম অন্ধকারে জল আর জঙ্গলের মাঝে যেন থমকে গেল সময়। মিলেমিশে এক হয়ে গেলেন ঋষি আর মানবী। জন্ম নিলেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন—যাঁকে পৃথিবী চেনে ব্যাসদেব নামে। এই ব্যাসদেবই তো পরে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু আর বিদুরের জন্ম দেন। অর্থাৎ, কুরুক্ষেত্রের সেই প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধের পাণ্ডুলিপি পরাশরই লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন যমুনার ওই নৌকায়। যাওয়ার আগে তিনি মৎস্যগন্ধাকে এক অদ্ভুত বর দিলেন—তাঁর গায়ের কটু মাছের গন্ধ বদলে গিয়ে এক দিব্য সুগন্ধে ভরে উঠল চারপাশ। এই সুগন্ধই তো পরে রাজা শান্তনুকে টেনে এনেছিল সত্যবতীর কাছে, যেখান থেকে মহাভারতের মূল সংঘাতের শুরু।
আকাশের মানচিত্র এবং পরাশর
মহাভারতের এই জটিল পারিবারিক রাজনীতির বাইরে পরাশরের আরও এক মস্ত বড় জগত ছিল—সেটা নক্ষত্রের জগত। তিনি ছিলেন বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র বা ‘হোরা শাস্ত্র’-এর অবিসংবাদিত সম্রাট। আজ আমরা যে রাশিফল বা গ্রহের দশা নিয়ে এত মাথা ঘামাই, তার ভিত্তিপ্রস্তর কিন্তু গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এই মানুষটিই।
পরাশর মানুষটি ছিলেন বড় বিচিত্র। তিনি কেবল তপোবনেই দিন কাটাতেন না, তাঁর চোখ ছিল অসীম আকাশের নীলিমার দিকে। আজ আমরা আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে কত বড়াই করি, অথচ ভাবলে অবাক লাগে যে, কয়েক হাজার বছর আগে কোনো ল্যাবরেটরি ছাড়াই তিনি মহাজাগতিক রহস্যের সমাধান করে ফেলেছিলেন। তাঁর জ্যোতিষশাস্ত্র স্রেফ হাত দেখা বা টিয়া পাখির ভাগ্যগণনা নয়—তা আসলে এক নিখুঁত গণিত।পরাশর রচিত ‘বৃহৎ পরাশর হোরা শাস্ত্র’ আজও জ্যোতিষীদের কাছে বাইবেলের মতো। তিনি শুধু যজ্ঞের মন্ত্র উচ্চারণ করেই থেমে থাকেননি, তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন মহাবিশ্বের গাণিতিক যুক্তি। আকাশের গ্রহদের অবস্থান কীভাবে মানুষের ভাগ্য আর সময়ের চাকাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা তিনি জলভরা মেঘের মতো সহজ করে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
সময়ের অমোঘ জাল: বিংশোত্তরী দশা
আমার কাছে পরাশরের সবচেয়ে বিস্ময়কর কাজ মনে হয় তাঁর এই ‘দশা’ পদ্ধতি। মানুষের আয়ুকে তিনি ১২০ বছরের একটা ক্যানভাসে এঁকেছিলেন। তিনি জানতেন, একই সময়ে জন্মানো দুই মানুষের জীবন কখনও এক হয় না। কেন হয় না? কারণ প্রত্যেকের সময়ের চাকা ঘোরে আলাদা লয়ে। একজনের জীবনে যখন বৃহস্পতির সুবর্ণ যুগ, অন্যজন হয়তো তখন শনির কঠিন পাঠশালায় শিক্ষা নিচ্ছে। পরাশর যেন আমাদের শিখিয়ে গেলেন—সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সময় বা ‘টাইমিং’ আছে। জোয়ার আসার আগে নৌকো ভাসিয়ে যেমন লাভ নেই, তেমনি ভাঁটার সময় জাল ফেললে মাছ ওঠে না।
বিষ্ণু পুরাণ: মহাকালের আখ্যান
পরাশর ছিলেন একাধারে স্রষ্টা আর অন্যধারে এক ক্লান্তিহীন কথক। তাঁর মুখ দিয়েই আমরা পেয়েছি ‘বিষ্ণু পুরাণ’-এর মতো অমূল্য গ্রন্থ। সৃষ্টি থেকে প্রলয়, মহাকালের চাকা কীভাবে ঘোরে, কিংবা মানুষের সামাজিক কর্তব্যই বা কী—পরাশর যেন এক পর্যটকের মতো আমাদের শুনিয়ে গিয়েছেন সেই সব কাহিনী। তাঁর দর্শনে আধ্যাত্মিকতা ছিল বটে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল মাটির পৃথিবীর জীবনবোধ।
কেন আজও তিনি প্রাসঙ্গিক?
পরাশর এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। একদিকে তিনি মহাভারতের অমর কাহিনীকার ব্যাসদেবের জন্মদাতা, অন্যদিকে তিনি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেই আদি পথপ্রদর্শক যিনি আমাদের শিখিয়েছেন সময় এবং নিয়তি একে অপরের পরিপূরক।
মহাভারতের পাতায় পাতায় যখন কুরুক্ষেত্রের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা পড়ি, তখন বারবার মনে পড়ে যমুনার সেই নির্জন নৌকা আর নিবিড় কুয়াশার কথা। পরাশরের সেই একটা সিদ্ধান্তই যদি না থাকতো, তবে আজ আমরা গীতা পেতাম না, পেতাম না সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের শিক্ষা। পরাশর হলেন সেই নেপথ্য স্থপতি, যিনি প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নিজেই একদিন নীরবে অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন।




Comments
Post a Comment