সত্যবতী ও ব্যাসদেব
সত্যবতী ও ব্যাসদেব
বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে যে শূন্যতা নেমে এসেছিল, তা কেবল একটি সিংহাসনের শূন্যতা ছিল না। ছিল বংশের শূন্যতা, রক্তের শূন্যতা। অম্বিকা আর অম্বালিকা — দুই তরুণী রানি — বিধবার সাদা বস্ত্রে ঢেকে গেছেন। তাঁদের কোলে কোনো সন্তান নেই। কুরুবংশের প্রদীপ নিভে আসছে।
সত্যবতী তখন বৃদ্ধা। কিন্তু তাঁর মন বৃদ্ধ হয়নি। রাজমাতার মনে একটাই চিন্তা — এই বংশ টিকিয়ে রাখতে হবে।
সেই মুহূর্তে তিনি মনে করলেন তাঁর সেই প্রথম পুত্রের কথা।
অনেক অনেক আগের কথা। তখন সত্যবতী রানি নন, কোনো প্রাসাদও তাঁর জীবনে নেই। তিনি কেবল একটি নৌকার মাঝি। যমুনার বুকে প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করেন। তাঁর শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসে, তাই লোকে তাঁকে বলে মৎস্যগন্ধা।
একদিন এক ঋষি এলেন নৌকায়। নাম পরাশর।
সত্যবতী দাঁড় বাইছেন। পরাশর তাকিয়ে আছেন। শুধু তাকিয়ে নন — তাঁর ভেতরে জ্বলে উঠছে এক অদ্ভুত অনুভূতি। এই মেয়ে সাধারণ নয়। ঋষির দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায়। তিনি দেখলেন — এই নারীর গর্ভে জন্ম নেবে এক মহাপুরুষ, যিনি যুগযুগান্ত ধরে মানুষের পথ দেখাবেন।
পরাশর বললেন তাঁর মনের কথা।
সত্যবতী ঘাবড়ে গেলেন। তিনি অবিবাহিতা। এই মিলনের কথা জানাজানি হলে তাঁর সম্মান থাকবে না, থাকবে না বিয়ের সম্ভাবনাও। যমুনার দুই তীরে এত লোক — কেউ না কেউ দেখে ফেলবে।
পরাশর হাসলেন। তাঁর ঠোঁটে সেই শান্ত, গভীর হাসি যা কেবল মহাজ্ঞানীদের থাকে।
তিনি হাত তুললেন।
মুহূর্তের মধ্যে ঘন কুয়াশা নেমে এল যমুনার বুকে। চারদিক সাদা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নৌকাটি যেন একটি আলাদা জগতে ভেসে আছে — পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন।
পরাশর বললেন — তোমার কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর এই মাছের গন্ধ? সেও থাকবে না। তোমার শরীর থেকে এখন থেকে এমন সুগন্ধ বের হবে যা যোজন দূর থেকে টের পাওয়া যাবে। তুমি হবে যোজনগন্ধা।
সেদিন যমুনার বুকে একটি দ্বীপে জন্ম নিলেন এক শিশু।
শ্যামবর্ণ। দ্বীপে জন্ম বলে নাম হল দ্বৈপায়ন। আর বর্ণের জন্য কৃষ্ণ। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন।
পরে মানুষ তাঁকে চিনবে ব্যাসদেব নামে।
কিন্তু এই সন্তান মায়ের কোলে বসে থাকেনি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ভেতরে জেগে উঠল এক অপার্থিব জ্ঞান, এক তীব্র বৈরাগ্য। শিশু নয়, সে যেন জন্মেছেই ঋষি হয়ে।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল — মা, আমি বনে যাচ্ছি। তোমার কাছে থাকা আমার ধর্ম নয়।
সত্যবতী কী বলবেন? এই পুত্রকে তিনি লালন করার সুযোগও পাননি। জন্মের মুহূর্তেই সে চলে যাচ্ছে।
ব্যাসদেব মায়ের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন — মা, যদি কখনো তোমার মহাবিপদ হয়, যদি কখনো মনে করো আমাকে দরকার — শুধু একবার মনে মনে ডেকো। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাজির হব।
এটুকুই প্রতিশ্রুতি। এটুকুই সম্পর্ক।
তারপর সে চলে গেল। অরণ্যে। ধ্যানে। তপস্যায়।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
সত্যবতী শান্তনুর রানি হলেন। রাজপ্রাসাদের জৌলুস, দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। এক জীবনে অনেক কিছু পেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
চিত্রাঙ্গদ যুদ্ধে মারা গেলেন। বিচিত্রবীর্য রোগে।
রাজমাতা সত্যবতী এখন এক ভাঙা প্রাসাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। কুরুবংশের বাতি নিভে যাচ্ছে। অম্বিকা-অম্বালিকার কোল শূন্য।
তখন তিনি মনে মনে ডাকলেন।
সেই নামটি। সেই মুখটি। যমুনার দ্বীপে যে শিশু জন্মেছিল এক কুয়াশামাখা দুপুরে।
এবং ব্যাসদেব এলেন।
ঠিক যেমন কথা দিয়েছিলেন।
তপস্যার তেজে তাঁর শরীর দীপ্ত, জটা এলোমেলো, চোখে অসীম গভীরতা। প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে তিনি যেন একটু বেমানান — এই চাকচিক্যের মাঝে এক অরণ্যচারী।
মা আর পুত্রের মিলন হল।
সত্যবতী সব বললেন। বংশরক্ষার কথা, অম্বিকা-অম্বালিকার কথা, শূন্য সিংহাসনের কথা।
ব্যাসদেব শুনলেন। তারপর রাজি হলেন।
নিয়োগ প্রথা — এ ধর্মশাস্ত্রেই স্বীকৃত। বংশ বাঁচাতে, রক্তের ধারা টিকিয়ে রাখতে, এই পথ বেছে নেওয়া যায়। ব্যাসদেব জানতেন। তিনি রাজি হলেন।
অম্বিকার গর্ভে জন্ম নিলেন ধৃতরাষ্ট্র। অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডু। আর এক দাসীর গর্ভে জন্মালেন বিদুর — যাঁর ধর্মজ্ঞান কুরুবংশের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।
কুরুবংশের প্রদীপ আবার জ্বলে উঠল।
ভাবলে অবাক লাগে। সত্যবতী একজন মৎস্যজীবী কন্যা থেকে রানি হয়েছিলেন — এই যাত্রাটাই অবিশ্বাস্য। কিন্তু তার চেয়েও অবিশ্বাস্য এই যে, যমুনার বুকে কুয়াশার আড়ালে যে পুত্র জন্মেছিল এক মুহূর্তের জন্য — সেই পুত্রই শেষ পর্যন্ত তাঁর বংশকে বাঁচাল।
মা ডাকলেন। পুত্র এল।
এটুকুই সম্পর্ক ছিল তাঁদের। কিন্তু এই একটুকুর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মহাভারতের বীজ।

Comments
Post a Comment