ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা এবং কুরুবংশের উত্তরাধিকার
মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য দেবব্রত (ভীষ্ম) কঠোর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কেবল রাজ্যই ত্যাগ করেননি, আজীবন ব্রহ্মচর্যের শপথও নিয়েছিলেন। ভীষ্মের এই ত্যাগ দেখে প্রসন্ন হয়ে পিতা শান্তনু তাঁকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বর প্রদান করেন।
শান্তনু-পরবর্তী যুগ এবং বিপর্যয়
শান্তনু ও সত্যবতীর সংসারে দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করেন— চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। শান্তনুর মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্র চিত্রাঙ্গদ সিংহাসনে বসেন, কিন্তু বিদর্ভরাজের সাথে যুদ্ধে তিনি অকালে প্রাণ হারান। সেই সময় বিচিত্রবীর্য নাবালক হওয়ায় সত্যবতীর অনুরোধে ভীষ্ম তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য শাসন করতে থাকেন।
কাশীরাজের কন্যাদের হরণ
বিচিত্রবীর্য প্রাপ্তবয়স্ক হলে ভীষ্ম জানতে পারেন যে কাশীরাজ তাঁর তিন কন্যা— অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকার জন্য স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছেন। ভ্রাতার বিয়ের উদ্দেশ্যে ভীষ্ম একাকী সেই সভায় উপস্থিত হন এবং উপস্থিত সকল রাজন্যবর্গকে যুদ্ধে পরাস্ত করে তিন কন্যাকে বলপূর্বক অপহরণ করে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন।
রাজপ্রাসাদে ফেরার পর জ্যেষ্ঠা কন্যা অম্বা জানান যে তিনি মনে মনে রাজা শাল্বকে পতি হিসেবে বরণ করেছেন। ভীষ্ম তাঁর সত্যনিষ্ঠার সম্মান জানিয়ে অম্বাকে মুক্তি দেন। অতঃপর অম্বিকা ও অম্বালিকার সাথে বিচিত্রবীর্যের বিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে, দীর্ঘ সাত বছর দাম্পত্য জীবনের পর কোনো সন্তান না রেখেই বিচিত্রবীর্য অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
বংশের ধারা রক্ষায় ব্যাসদেব
কুরুবংশ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় মাতা সত্যবতী ভীষ্মকে অনুরোধ করেন অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিবাহ করে রাজ্যের ভার গ্রহণ করতে। কিন্তু ভীষ্ম তাঁর ভীষণ প্রতিজ্ঞায় অটল থাকেন এবং বিবাহ করতে অস্বীকার করেন। নিরুপায় হয়ে সত্যবতী তাঁর অন্য এক পুত্র, ঋষি বেদব্যাসকে স্মরণ করেন এবং তাঁর মাধ্যমে বংশ রক্ষার প্রস্তাব দেন।
ব্যাসদেবের দর্শনে তিন নারীর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতের কুরুবংশের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়:
* ধৃতরাষ্ট্র (অন্ধ): ব্যাসদেবের উগ্র তেজ ও রূপ দেখে ভয়ে অম্বিকা চোখ বন্ধ করে ফেলেন। ফলে তাঁর গর্ভে জন্মান অন্ধ পুত্র ধৃতরাষ্ট্র।
* পাণ্ডু (বিবর্ণ): ব্যাসদেবকে দেখে অম্বালিকা ভয়ে ফ্যাকাশে বা পাণ্ডুবর্ণ হয়ে যান। তাই তাঁর পুত্র পাণ্ডু জন্ম থেকেই ছিলেন রোগগ্রস্ত ও বিবর্ণ।
* বিদুর (ধর্মজ্ঞ): অম্বিকা নিজে পুনরায় ঋষির কাছে না গিয়ে তাঁর এক দাসীকে পাঠান। সেই দাসী ভক্তি ও আনন্দের সাথে ব্যাসদেবকে সেবা করেন। তাঁর গর্ভেই মহাজ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ বিদুর জন্মগ্রহণ করেন।
এইভাবেই কুরুবংশের পরবর্তী প্রজন্মের সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।

Comments
Post a Comment