দ্রৌপদীর প্রশ্ন — কুরুসভায় এক নারীর আর্তনাদ

 


দ্রৌপদীর প্রশ্ন — কুরুসভায় এক নারীর আর্তনাদ

সেদিন কুরুসভায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

পাশার ছকে যুধিষ্ঠির সব হারিয়েছেন — রাজ্য, ধন, ভাই, নিজেকে। আর তারপর... তারপর তিনি দাঁও রেখেছেন দ্রৌপদীকে। পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। পাঞ্চালরাজের কন্যা। যজ্ঞের আগুন থেকে জন্ম নেওয়া এক নারী।

শকুনির পাশা গড়িয়ে পড়ল। দুর্যোধন জিতে গেল।

দুঃশাসন গেল দ্রৌপদীর কক্ষে। টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে এল সভার মাঝখানে। সেই নারীর কেশ তখন খোলা, বস্ত্র বিপর্যস্ত। পাঁচ পাঁচজন বীর স্বামী মাথা নিচু করে বসে। ভীষ্ম চুপ। দ্রোণ চুপ। কৃপাচার্য চুপ। বিদুর ছাড়া সকলে যেন পাথর হয়ে গেছেন।


আর দুর্যোধন? সে হাসছে। উরু দেখাচ্ছে দ্রৌপদীকে। বলছে — "এসো প্রিয়ে, এখন তুমি আমাদের দাসী।"

দ্রৌপদীর সারা শরীর কাঁপছে। কিন্তু চোখে জল নেই। আছে আগুন।

সেই আগুনেই তিনি প্রশ্ন করলেন।

প্রথম প্রশ্ন

তিনি সভার দিকে তাকালেন। গলা তুললেন —

আমি জানতে চাই — যুধিষ্ঠির কি আগে নিজেকে হেরেছেন, না আমাকে? যদি তিনি আগেই নিজেকে হেরে দাসে পরিণত হয়ে থাকেন — তাহলে একজন দাসের কি অধিকার আছে অন্যকে পণ রাখার? একজন দাস কি তার স্ত্রীকে বাজি রাখতে পারে?

সভা নিস্তব্ধ।

ভীষ্ম মাথা নামিয়ে নিলেন। কেউ উত্তর দিতে পারলেন না। কারণ প্রশ্নটা ন্যায়সঙ্গত। প্রশ্নটা ধর্মের মূলে আঘাত করেছে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন

এবার তিনি তাকালেন তাঁর পাঁচ স্বামীর দিকে। সেই পাঁচজন বীর — যাঁরা একসময় স্বর্গ কাঁপিয়েছেন, পৃথিবী জয় করেছেন।

তাঁদের দিকে তাকিয়ে দ্রৌপদী বললেন —

তোমরা কি সত্যিই ক্ষত্রিয়? তোমরা কি সেই মানুষ যাদের বাহুবলের কথা তিন লোকে প্রসিদ্ধ? আজ তোমাদের স্ত্রীকে প্রকাশ্য সভায় টেনে আনা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে — আর তোমরা মাথা নিচু করে বসে আছ? এই কি তোমাদের ধর্ম? এই কি তোমাদের পৌরুষ?

ভীম কাঁদছেন নিঃশব্দে। অর্জুন পাথরের মতো স্থির। যুধিষ্ঠির চোখ বুজে আছেন।

কারণ পাশায় হেরে যাওয়া মানুষের কথা বলার অধিকার নেই — এই ধর্মের বেড়াজালে আটকে গেছেন তাঁরা।

তৃতীয় প্রশ্ন

এবার দ্রৌপদী ফিরলেন সভার বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ — এই মহারথীদের দিকে।

তাঁর কণ্ঠে তখন শুধু ক্রোধ নয়, আছে গভীর বেদনা —

"হে পিতামহ ভীষ্ম! হে আচার্য দ্রোণ! আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না কী হচ্ছে এই সভায়? আপনারা কি ধর্মের রক্ষক নন? একজন কুলবধূকে, একজন সধবা নারীকে, যজ্ঞসম্ভবা পাঞ্চালীকে এভাবে সভায় টেনে এনে অপমান করা হচ্ছে — আর আপনারা নীরব? এই কি কুরুবংশের ধর্ম? এই কি আর্যাবর্তের সংস্কৃতি?"

ভীষ্ম কাঁপলেন। কিন্তু বললেন — "ধর্মের গতি সূক্ষ্ম, আমি নিশ্চিত উত্তর দিতে পারছি না।"

এই উত্তরই ছিল সেদিনের সবচেয়ে বড় কাপুরুষতা।

চতুর্থ প্রশ্ন — সবচেয়ে তীক্ষ্ণ

দ্রৌপদী এবার পুরো সভার দিকে ঘুরলেন। তাঁর চোখ দিয়ে যেন অগ্নি ঝরছে —

এই সভায় কি একজনও ধার্মিক মানুষ নেই? একজনও কি নেই যে বলবে — এটা অন্যায়? রাজারা এখানে বসে আছেন, মহারথীরা বসে আছেন — কিন্তু কেউ মুখ খুলছেন না। তাহলে কি এই সভা আসলে ধর্মসভা নয়, এটা অধর্মের আখড়া?

সভায় একটা গুঞ্জন উঠল। বিকর্ণ — দুর্যোধনের ভাই — উঠে দাঁড়াল। বলল — "দ্রৌপদী হারেননি। এই পণ অবৈধ।"

কিন্তু কর্ণ তাকে থামিয়ে দিল।

শেষ আশ্রয় — কৃষ্ণের কাছে


যখন সভার কেউ রক্ষা করল না, যখন স্বামীরা অসহায়, যখন বড়রা নীরব —

দ্রৌপদী তখন মনে মনে ডাকলেন একজনকে।

হে গোবিন্দ! হে দ্বারকানাথ! তুমি কোথায়? আজ আমি নিঃসহায়। স্বামীরা পরাজিত, গুরুজনেরা নীরব, সভা অন্ধ। তুমিই এখন আমার একমাত্র আশ্রয়। রক্ষা করো।

আর তখনই ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা।

দুঃশাসন শাড়ি টানতে লাগল। টানে, টানে, আরও টানে — কিন্তু শাড়ি শেষ হয় না। বস্ত্রের স্তূপ জমে যাচ্ছে, তবু দ্রৌপদী আবৃত।

কৃষ্ণ এলেন। বস্ত্ররূপে।

সেদিন দ্রৌপদী শুধু কাঁদেননি।

তিনি প্রশ্ন করেছিলেন।

আর সেই প্রশ্নগুলো আজও বাতাসে ভাসে — ধর্ম কোথায়? পৌরুষ কোথায়? বিবেক কোথায়?

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আসলে সেদিনই শুরু হয়ে গিয়েছিল — দ্রৌপদীর সেই প্রশ্নের আগুনে।

Comments

Popular posts from this blog

অগ্নিগর্ভ পাঞ্চালী: বিরাটনগরে কীচক দম্ভের অবসান

আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে