উত্তরার কোলে মৃত শিশু আর কৃষ্ণের সেই রাত
উত্তরার কোলে মৃত শিশু আর কৃষ্ণের সেই রাত
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়েছে।
কিন্তু শেষ হওয়া মানে কি সত্যিই শেষ হওয়া?
যুদ্ধ শেষ হয় রণাঙ্গনে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে। মায়ের বুকে, স্ত্রীর চোখে, সন্তানের স্বপ্নে। সেই যুদ্ধ কোনোদিন শেষ হয় না।
উত্তরা জানত এটা।অভিমন্যু মারা যাওয়ার পর উত্তরা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।হঠাৎ নয়। আস্তে আস্তে। প্রথমে কম কথা বলত। তারপর আরও কম। তারপর একদিন সকালে উঠে দেখা গেল — সে শুধু তাকিয়ে আছে। কোনোদিকে। শূন্যের দিকে। যেখানে কিছু নেই, সেদিকে।কুন্তী এসে বসতেন পাশে। কিছু বলতেন না। শুধু হাত রাখতেন মাথায়।সুভদ্রা আসতেন। চোখে তাঁরও জল। ছেলে গেছে তাঁরও। কিন্তু পুত্রশোক আর স্বামীশোক আলাদা জিনিস। সুভদ্রা সেটা বুঝতেন।
উত্তরা বসে থাকত।বিরাট রাজার মেয়ে সে।মৎস্য দেশের রাজকুমারী। ছোটবেলায় নাচতে ভালোবাসত। গান গাইত। হাসত প্রাণ খুলে।কবে যে সেই মেয়েটা চলে গেল, কেউ বলতে পারে না।
অভিমন্যু যেদিন গেল, সেদিন উত্তরার ভেতর থেকে কেউ একজন চলে গেল চুপি চুপি। হাসিটা গেল। গানটা গেল। রঙটা গেল।রইল শুধু একটা শরীর। যার ভেতরে আরেকটা প্রাণ বড় হচ্ছে।
অভিমন্যুর সন্তান।উত্তরা জানত সে গর্ভবতী। অভিমন্যুও জানত। যুদ্ধে যাওয়ার আগে একবার হাত রেখেছিল পেটে। কিছু বলেনি। শুধু হাত রেখে চোখ বুজেছিল।সেই স্পর্শটা মনে আছে উত্তরার।সেটাই এখন তার একমাত্র সম্পদ।
মাসের পর মাস কাটল।উত্তরার পেট বাড়তে লাগল।কিন্তু উত্তরা যেন ক্রমশ ছোট হতে লাগল। শরীর আছে, কিন্তু মন নেই। খাওয়া কমে গেছে। ঘুম নেই রাতে। শুধু শুয়ে থাকে আর ছাদের দিকে তাকায়।কুন্তী একদিন বললেন — মা, শিশুর কথা ভাবো। সে বাঁচতে চাইছে।উত্তরা বলল — তার বাবা বাঁচতে চেয়েছিল। পারেনি।কুন্তী চুপ করে গেলেন।এর উত্তর তাঁর কাছে ছিল না।
তারপর সেই রাতটা এল।অশ্বত্থামা।দ্রোণপুত্র। কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডবদের হাতে বাবার মৃত্যুর পর সে পাগল হয়ে গিয়েছিল। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছিল।
রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে সে হত্যা করল দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে। ঘুমন্ত ছেলেদের। নিরস্ত্র শিশুদের।তারপর সে জানল — পাণ্ডব বংশ শেষ হয়নি। উত্তরার গর্ভে একটি শিশু আছে। অভিমন্যুর সন্তান।
সে সেটাও শেষ করতে চাইল।
ব্রহ্মাস্ত্র।অশ্বত্থামা ছুড়ল সেই মহাবিধ্বংসী অস্ত্র।উত্তরার গর্ভের দিকে।একটি অজন্মা শিশুকে মারার জন্য।এর চেয়ে কাপুরুষের কাজ আর কী হতে পারে?
উত্তরা সেই মুহূর্তে কী অনুভব করেছিল সেটা কোনো ভাষায় বলা যায় না।পেটের ভেতরে কিছু একটা হল। একটা আঘাত। একটা জ্বালা। যেন কেউ ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।সে মাটিতে পড়ে গেল।কাঁদতে পারল না। চিৎকার করতে পারল না।শুধু একটাই নাম মুখে এল।
কৃষ্ণ।কৃষ্ণ তখন কোথায় ছিলেন?দূরে। কাছে। কৃষ্ণের কাছে-দূরের হিসাব আলাদা।
কিন্তু উত্তরা ডাকল। আর যে ডাকে সে পায়।কৃষ্ণ এলেন।
সেই মুহূর্তে। সেই রাতে।উত্তরার পাশে বসলেন। তাঁর চোখে তখন কী ছিল — কেউ দেখেনি ঠিকমতো। যারা পাশে ছিল তারা পরে বলেছে — সেই চোখে একটা গভীরতা ছিল। যেন সমুদ্রের তলা দেখা যাচ্ছে।
উত্তরা বলল — কৃষ্ণ, আমার সন্তান।কৃষ্ণ বললেন — জানি।
উত্তরা বলল — বাঁচাও।কৃষ্ণ কিছু বললেন না।শুধু চোখ বুজলেন।
সেই রাতে কী হয়েছিল, পুরোটা কেউ জানে না।শুধু জানা যায় — কৃষ্ণ সেই রাতে নিজেকে ছোট করলেন।যিনি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা, যাঁর ইশারায় সূর্য ওঠে, যিনি গীতার জ্ঞান দিয়েছেন অর্জুনকে — তিনি সেই রাতে একটি অজন্মা শিশুর রক্ষাকবচ হয়ে গেলেন।ব্রহ্মাস্ত্রের আগুন থেকে শিশুটিকে ঢেকে রাখলেন নিজের সত্তা দিয়ে।
কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র থামানো যায় না।
সেই অস্ত্র তার কাজ করল।
প্রসবের দিন এল।হস্তিনাপুরে সেদিন একটা ভয়ের ছায়া ছিল। সবাই জানত — উত্তরার সন্তান আসছে। কিন্তু কেউ জানত না কীভাবে আসবে।প্রসব বেদনা শুরু হল। আর তারপর -নিঃশব্দ।শিশুটি এল।কিন্তু কাঁদল না।
নিঃশব্দ শিশু।ধাত্রী দেখল — শিশুর শরীর আছে। সুন্দর শিশু। অভিমন্যুর মতো মুখ। কিন্তু প্রাণ নেই।ব্রহ্মাস্ত্রের অভিঘাত তার প্রাণ নিয়ে গেছে।
ধাত্রী কাঁদতে লাগল।বাইরে কুন্তী অপেক্ষা করছিলেন। সুভদ্রা অপেক্ষা করছিলেন। পাণ্ডবেরা অপেক্ষা করছিলেন।ভেতর থেকে কান্নার শব্দ বের হল।
কিন্তু সেই কান্না শিশুর নয়।উত্তরা শিশুটিকে বুকে নিল।
মৃত শিশু।ঠান্ডা। নিঃশব্দ।
উত্তরা কাঁদল না। হয়তো কান্নাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো এত কষ্টের পর মানুষের ভেতরে একটা জায়গা হয় যেখানে আর কষ্ট ঢোকে না। অসাড় হয়ে যায়।
সে শুধু বলল — কৃষ্ণ।একটাই শব্দ।
কৃষ্ণ ঘরে ঢুকলেন।উত্তরার দিকে তাকালেন। তারপর শিশুর দিকে।কেউ কিছু বলল না।ঘরে তখন একটা অদ্ভুত নিঃশব্দতা। বাইরে বাতাস নেই। প্রদীপ জ্বলছে কিন্তু কাঁপছে না।
কৃষ্ণ এগিয়ে গেলেন।তিনি হাত বাড়ালেন শিশুর দিকে।উত্তরা শিশুটাকে দিল।
কৃষ্ণ শিশুটিকে কোলে নিলেন।
তারপর চোখ বুজলেন।এরপর কী হয়েছিল সেটা ব্যাখ্যা করার ভাষা নেই।যারা সেই ঘরে ছিল, তারা পরে বলেছে — একটা আলো ছিল। কৃষ্ণের হাত থেকে। খুব মৃদু। যেন ভোরের প্রথম আলো।সেই আলো শিশুর গায়ে পড়ল।তারপর একটা শব্দ হল।ছোট্ট একটা শব্দ।শিশুর কান্না।
উত্তরা চমকে উঠল।কৃষ্ণ চোখ খুললেন। হাসলেন। সেই হাসি যা শুধু কৃষ্ণই হাসতে পারেন — যার মধ্যে সব আছে, দুঃখও আছে, আনন্দও আছে, জ্ঞানও আছে।
শিশুটি কাঁদছে।জীবন্ত।কৃষ্ণ শিশুটিকে উত্তরার কোলে দিলেন।বললেন — এর নাম হবে পরীক্ষিৎ। যে পরীক্ষিত হয়েছে জন্মের আগেই।উত্তরা শিশুকে বুকে চাপল।এবার কাঁদল।
অনেকদিন পর।বাইরে কুন্তী শুনলেন শিশুর কান্না।তিনিও কাঁদলেন। সুভদ্রা কাঁদলেন। যুধিষ্ঠির চোখ মুছলেন।ভীম কিছু বললেন না। শুধু আকাশের দিকে তাকালেন।অর্জুন দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেলের কথা মনে পড়ছিল। অভিমন্যু। যে চলে গেছে।কিন্তু অভিমন্যুর ছেলে এল।বংশ রইল।কৃষ্ণ বের হয়ে আসছিলেন।উত্তরা ডাকল — কৃষ্ণ।কৃষ্ণ ফিরলেন।
উত্তরা বলল — তুমি না থাকলে?
কৃষ্ণ বললেন — আমি সবসময় থাকি। শুধু ডাকতে হয়।উত্তরা বলল — আমি ডেকেছিলাম। অভিমন্যু যখন চক্রব্যূহে ছিল — তখনও ডেকেছিলাম।কৃষ্ণ চুপ করে গেলেন।এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছেও নেই।কারণ কিছু কিছু প্রশ্ন আছে যার উত্তর বিধাতাও দেন না।সেই রাতে উত্তরা অনেকক্ষণ শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।অভিমন্যুর মুখ।একই চোখ। একই নাক। একই ছোট্ট হাত।যে মানুষটা চলে গেছে, সে সম্পূর্ণ যায়নি।
একটুখানি রেখে গেছে।বাইরে হস্তিনাপুরের রাত।আকাশে তারা।পরীক্ষিৎ সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
নবজন্মের হাসি।যে হাসি বলছে — আমি এসেছি। আমি থাকব।
কুরু বংশের আলো নিভে যায়নি সেই রাতে।একটা ছোট্ট শিশুর কান্নায় আবার জ্বলে উঠেছিল।
আর সেই আলো জ্বালিয়েছিলেন একজন — যাঁকে ডাকলে তিনি আসেন।
সবসময়।

Comments
Post a Comment