"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"
কনৌজ শহরে একটা ছেলে ছিল।নাম অজামিল।
বাবা-মা যখন নাম রেখেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন ছেলেটা বড় হয়ে কিছু একটা হবে। হলও। ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম, ছোটবেলা থেকেই বেদ শেখা শুরু। ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ — একে একে সব। গুরুর কাছে বসে শ্লোক মুখস্থ করত, সন্ধ্যায় সন্ধ্যাবন্দনা করত, ভোরে উঠে স্নান সেরে পূজায় বসত।
পাড়ার লোকে বলত — অজামিল একটা আলাদা ছেলে। ওর চোখে একটা শান্তি আছে। ওর গলায় বেদমন্ত্র শুনলে মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বর কথা বলছেন।
এইরকম একটা ছেলে।
বয়স তখন কতই বা হবে। বিশ-বাইশ। গুরুর আদেশে একদিন জঙ্গলে গেল কাঠকুটো আনতে। যজ্ঞের জন্য সমিধ চাই। সূর্য তখন মাথার উপরে। জ্যৈষ্ঠের দুপুর। বনের ভেতরটা গরমে ঝিমঝিম করছে। পাখি ডাকছে না, বাতাস নেই, শুধু ঝিঁঝিঁর একটানা শব্দ।
অজামিল হাঁটছিল।হঠাৎ থেমে গেল।একটু সামনে, গাছের আড়ালে
এখানে একটু থামা দরকার।
মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যেগুলো পরে মনে হয় — ওই একটা মুহূর্তই সব বদলে দিয়েছিল। একটা সিদ্ধান্ত, একটা দৃশ্য, একটা কথা — আর জীবনটা অন্যদিকে বাঁক নিয়ে নেয়।
অজামিলের জীবনে সেই মুহূর্তটা এল ওই জঙ্গলে।
গাছের আড়ালে একজন পুরুষ ও একজন নারী।
শূদ্র। নিচু জাতের মানুষ। লোকটা মাতাল। চোখ লাল, পোশাক অবিন্যস্ত। মেয়েটাও হুঁশে নেই। দুজনে মিলে যা করছিল — তা দেখার জিনিস নয়। তা দেখলে সভ্য মানুষ চোখ সরিয়ে নেয়। তা দেখলে ব্রাহ্মণ সন্তান মুখ ফিরিয়ে দ্রুত চলে যায়।
অজামিল চলে যায়নি।
দাঁড়িয়ে রইল।একটু, দুটো, তিনটো মুহূর্ত। তারপর আরো একটু। তারপর আরো।
বেদের শ্লোকগুলো হঠাৎ কোথায় চলে গেল মাথা থেকে। গুরুর মুখের কথাগুলো কোথায় উবে গেল। সন্ধ্যার মন্ত্র, ভোরের স্তব — সব যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
রইল শুধু ওই দৃশ্যটা।
মেয়েটার নাম ছিল। সব মেয়েরই নাম থাকে। কিন্তু শাস্ত্র তার নাম রাখেনি। শুধু বলেছে — সে ছিল সুন্দরী। শূদ্রাণী। দাসীবৃত্তি করত।
অজামিল সেদিন ফিরে গেল ঠিকই। কাঠ নিয়ে, সমিধ নিয়ে।
কিন্তু মন পড়ে রইল ওই জঙ্গলে।
রাতে শুতে গেলে চোখের সামনে ভাসে। সকালে উঠে মন্ত্র পড়তে বসলে মনোযোগ থাকে না। গুরু ডাকেন, সে সাড়া দেয়, কিন্তু আসলে কোথায় থাকে সে?
এইভাবে কয়েকটা দিন গেল।
তারপর একদিন অজামিল আবার গেল।
এবার কাঠের জন্য নয়।
মেয়েটার কাছে।যা হওয়ার হল।
ব্রাহ্মণের ছেলে শূদ্রাণীর ঘরে উঠল। বাবা-মাকে ছেড়ে দিল। বিধিমতো বিবাহিত স্ত্রীকে ছেড়ে দিল। সংসার ছেড়ে দিল। বেদ ছেড়ে দিল। গুরু ছেড়ে দিল।
সব ছেড়ে দিল।শুধু ওই মেয়েটাকে ছাড়তে পারল না।
পাড়ার লোকেরা থু থু দিল। ব্রাহ্মণসমাজ একঘরে করল। বাবা কাঁদলেন, মা বুক চাপড়ালেন। কিন্তু অজামিল ফিরল না।
মানুষ যখন একবার কোনো নেশায় পড়ে, তখন সে আর হিসাব কষে না। লাভ-ক্ষতির অঙ্ক তার কাছে অর্থহীন হয়ে যায়।
তারপর কেটে গেল বছরের পর বছর।অজামিল এখন আর সেই ছেলেটি নেই।
পেট চালাতে হবে। মেয়েটার সাথে সংসার করতে হবে। ছেলেপুলে হয়েছে। একটা, দুটো, তিনটো করে করে অনেকগুলো। টাকা লাগে। সৎপথে উপায় নেই। তখন শুরু হল অন্য পথ।
মিথ্যা বলা। জুয়া খেলা। চুরি করা। প্রতারণা করা।
যে ছেলেটা একসময় সত্যের কথা পড়াত, সে এখন সত্য বলতে জানে না। যে ছেলেটার কণ্ঠে বেদমন্ত্র শুনে পাড়ার লোক চোখ বুজত, সে এখন বাজারে মিথ্যার পসরা সাজায়।
জীবন এইভাবেও যায়।
এই পর্যন্ত পড়ে পাঠক হয়তো ভাবছেন — এ তো পতনের গল্প। এই গল্পে আর কী নতুন আছে? মানুষ পড়ে, মানুষ ভুল করে — এ তো চিরকালের কথা।
কিন্তু গল্পটা এখানে শেষ নয়।
অজামিলের বয়স হল। অনেক বয়স। আটাশি বছর।
শরীর ভেঙে গেছে। চুল সাদা। হাত কাঁপে। শ্বাস নিতে কষ্ট। জীবনের বাকি দিনগুলো গোনা যাচ্ছে।
এই সময়ে মানুষের মনে কী আসে জানেন?
পুরনো কথা আসে।অনেক পুরনো। যখন সে ছোট ছিল। মায়ের কোলে শুয়ে ঘুমাত। বাবার সাথে গঙ্গায় যেত। গুরুর আশ্রমে ভোরের আলোয় বসে শ্লোক পড়ত।
সেই দিনগুলো।অজামিলের একটা ছেলে ছিল — সবচেয়ে ছোট। নাম রেখেছিল নারায়ণ।
কেন এই নাম? কেউ জানে না। হয়তো কোনো এক মুহূর্তে মনের গভীর থেকে উঠে এসেছিল। হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বুড়ো মানুষটা চেয়েছিল — অন্তত ছেলেটার মধ্য দিয়ে হলেও একটু পবিত্রতা থাকুক।
মৃত্যুর সময় এল।যমদূতেরা এল। ভয়ংকর চেহারা। কালো মুখ, বিকট রূপ। অজামিলের বুক কেঁপে উঠল।
সে চিৎকার করল।
একটাই নাম — *নারায়ণ! নারায়ণ!*
ছেলেকে ডাকছিল সে। ছেলের ভয়ে। ছেলেকে শেষবার দেখতে চাইছিল।
কিন্তু সেই নামেই এল বিষ্ণুদূতেরা।
এই জায়গাটায় এসে পুরাণের গল্পটা অন্যরকম হয়ে যায়।
বিষ্ণুদূতেরা যমদূতদের থামিয়ে দিল। বলল — *এই মানুষ মৃত্যুর মুহূর্তে নারায়ণের নাম নিয়েছে। তাকে তোমরা নিতে পারবে না।*
যমদূতেরা বলল — *সারাজীবন পাপ করেছে। শাস্তি পাবে না?*
বিষ্ণুদূতেরা বলল — *নামের মহিমা জানো? সেই নাম — এক মুহূর্তের জন্য হলেও যে উচ্চারণ করেছে, তার হিসাব আলাদা।*
এখানে একটু থামি।এই গল্পের ভেতরে একটা গভীর কথা আছে।পুরাণ বলছে — মানুষ যতই পড়ুক, যতই শিখুক — মাথার জ্ঞান আর বুকের টান সবসময় একসাথে চলে না। অজামিল বেদ জানত। কিন্তু একটা মুহূর্তে সে থামতে পারেনি। একটা দৃশ্য তাকে টেনে নিয়ে গেল।
এটা কি শুধু অজামিলের গল্প?
সৎ থাকতে চেয়েও পারেনি এমন মানুষ কি আজ নেই? ভুলের পথে পা দিয়ে ফেলার পর আর ফেরা হয়নি এমন মানুষ কি আজ নেই?
পুরাণ বলছে — হয়। সব পাপের শেষে, সব পতনের পর — একটা ক্ষণ আসে। সেই ক্ষণে যদি মনের গভীর থেকে একটু আলো জ্বলে — তাহলেই যথেষ্ট।
অজামিল সেদিন বেঁচে গেল।
না, ঠিক বেঁচে গেল না। বরং বলা যায় — জেগে উঠল।
সে উঠল। হরিদ্বারে গেল। গঙ্গার ধারে বসল। চোখ বুজল।
আর এবার যে নামটা উচ্চারণ করল — সেটা ছেলের নামে নয়। সেটা সত্যিকারের ডাক।
জীবনটা একটা অদ্ভুত নদীর মতো।
কখনো স্বচ্ছ, কখনো ঘোলা। কখনো শান্ত, কখনো ভয়ানক স্রোত। অজামিল সেই নদীতে বহুদিন ডুবে ছিল। কিন্তু শেষমেশ ভেসে উঠেছিল।
মানুষ কি সবসময় ভাসতে পারে?পুরাণ বলে — পারে। যদি সে চায়।
আর সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় কথা।
*শ্রীমদ্ভাগবতের ষষ্ঠ স্কন্ধে অজামিলের এই আখ্যান আছে। কিন্তু এই গল্প শুধু পুরাণের নয় — এই গল্প যেকোনো মানুষের, যে একবার পথ হারিয়েছিল।*






Comments
Post a Comment