মোমল আর মহেন্দ্র রাজস্থানের বালিতে লেখা এক প্রেমের গল্প
মোমল আর মহেন্দ্র রাজস্থানের বালিতে লেখা এক প্রেমের গল্প
থর মরুভূমির কথা একটু বলা দরকার।এই মরুভূমি অন্য মরুভূমির মতো নয়। সাহারা শুধু বালি, গোবি শুধু পাথর। কিন্তু থর — থর হল একটা ভয়ানক জিনিস। দিনে আগুন, রাতে বরফ। দিনের বেলা সূর্য এমনভাবে নামে যেন আকাশটাকে পুড়িয়ে দেবে। আর রাতে চাঁদ উঠলে মনে হয় পুরো মরুভূমি রুপো দিয়ে মোড়া।
এই মরুভূমির মাঝখানে একটা জায়গা আছে — লোদ্রবা।সেখানে একটা প্রাসাদ ছিল।
প্রাসাদে মোমল নামে একটা মেয়ে ছিল।
মোমল কেমন ছিল সেটা বলা কঠিন।কারণ যে মানুষকে ভাষায় ধরা যায়, সে সাধারণ মানুষ। মোমল সাধারণ ছিল না।
তার চোখের রং ছিল মরুভূমির সন্ধ্যার মতো — একটু লাল, একটু সোনালি, একটু রহস্যময়। চুল ছিল কালো এবং এলোমেলো, যেন বাতাস সারাদিন খেলা করেছে। হাঁটার মধ্যে একটা গর্ব ছিল — রাজপুত মেয়ের গর্ব। না মাথা নোয়ানোর, না সরে যাওয়ার।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল — মোমল ছিল তীক্ষ্ণ।বুদ্ধিতে, চোখে, কথায়।রাজস্থানের রাজকুমাররা আসত তাকে দেখতে। ফিরে যেত মাথা নত করে। কারণ মোমল কোনো বোকার সাথে কথা বলত না। তার প্রেম পেতে হলে আগে তার মন জিততে হত। আর মোমলের মন জেতা সহজ ছিল না।
সে একটা পরীক্ষা রেখেছিল।
প্রাসাদের চারদিকে ছিল গোলকধাঁধা।ঘরের পর ঘর, সুড়ঙ্গের পর সুড়ঙ্গ। মোমলের সখীরা ছড়িয়ে থাকত সেখানে — ছদ্মবেশে, ফাঁদ পেতে। যে রাজকুমার রাতে ঢুকত, সে ভোরের আগে বেরোতে পারত না। পথ হারিয়ে ঘুরত। আর মোমল হাসত দূর থেকে।
কত রাজকুমার এসেছে, ফিরে গেছে।কেউ পথ পায়নি।
তারপর একদিন এল মহেন্দ্র।
উমেরকোটের রাজকুমার। সিন্ধু প্রদেশের ছেলে। বয়স বেশি নয়, কিন্তু চোখে একটা আলাদা জিনিস আছে। অন্যদের চোখে থাকে জয় করার ইচ্ছা। মহেন্দ্রের চোখে ছিল বোঝার ইচ্ছা।
সে মোমলের কথা শুনেছিল।
পথে পথে, বাজারে বাজারে। বণিকরা বলে, উটের মাহুতরা বলে, মরুভূমির যাযাবরেরা বলে — লোদ্রবায় একটা মেয়ে আছে, তার নাম মোমল, সে অপরূপ সুন্দরী এবং কেউ তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
মহেন্দ্র শুনল।মনে একটা আগুন জ্বলল।কিন্তু সে রাজকুমার। রাজকুমাররা তাড়াহুড়ো করে না।মহেন্দ্র আগে গেল মরুভূমিতে।একা। কোনো সঙ্গী নেই, কোনো সৈন্য নেই।
থরের বালিতে হাঁটল দিনের পর দিন। রাতে শুয়ে রইল খোলা আকাশের নিচে। তারা দেখল। চাঁদ দেখল। মরুভূমির নিঃশব্দতা শুনল।কেন?কারণ সে বুঝেছিল — মোমলকে পেতে হলে আগে মরুভূমিকে বুঝতে হবে। যে মেয়ে এই মাটিতে বড় হয়েছে, সে এই মাটির মতোই। বাইরে রুক্ষ, ভেতরে অসীম।
কয়েকদিন পর সে লোদ্রবায় এল।রাত তখন গভীর।চাঁদ উঠেছে। মরুভূমি রুপোলি।
মহেন্দ্র একা দাঁড়াল প্রাসাদের সামনে।গোলকধাঁধার দরজা খুলল।অন্য রাজকুমাররা ঢুকেছিল তাড়াহুড়ো করে। মহেন্দ্র ঢুকল ধীরে। থামল। শুনল। বাতাসের গতি কোনদিকে, পাথরের শব্দ কোথায়, ছায়া কোনদিকে পড়ছে।সে পথ হারাল না।
ধীরে ধীরে, একটু একটু করে, এগিয়ে গেল।
মোমল জেগে ছিল।সবসময় জেগে থাকত সে এই রাতে। দেখত — কে আসছে, কীভাবে আসছে।অন্যরা দৌড়াত, হোঁচট খেত, ঘুরপাক খেত।এই মানুষটা হাঁটছে। শান্তভাবে। যেন পথ তার চেনা।মোমলের বুকে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল।এর আগে কখনো হয়নি।মহেন্দ্র এসে দাঁড়াল।মোমল আলোর পাশে বসে ছিল। প্রদীপের আলোয় তার মুখ।
দুজন দুজনকে দেখল।কোনো কথা নেই প্রথমে। কথা বলার দরকার ছিল না। কিছু কিছু মুহূর্ত আছে যেখানে চোখই সব বলে দেয়।তারপর মোমল বলল — তুমি পথ হারাওনি।
মহেন্দ্র বলল — হারানোর ইচ্ছা ছিল না।মোমল বলল — অন্যরাও তাই বলত।মহেন্দ্র বলল — অন্যরা কি থরের বালিতে একা রাত কাটিয়েছিল তোমাকে বোঝার জন্য?মোমল চুপ করে গেল।
এই উত্তর সে আশা করেনি।
সেই রাতে দুজন অনেকক্ষণ কথা বলল।মহেন্দ্র বলল মরুভূমির কথা। রাতের আকাশের কথা। উটের পিঠে চড়ে দিগন্ত পেরোনোর কথা।
মোমল বলল এই প্রাসাদের কথা। একাকীত্বের কথা। কত রাজকুমার এসেছে গেছে, কিন্তু কেউ তার মন ছোঁয়নি।ভোর হয়ে এল।মহেন্দ্র উঠল যাওয়ার জন্য।
মোমল বলল — আবার আসবে?এই প্রথম সে কাউকে এই প্রশ্ন করেছে।মহেন্দ্র ফিরে তাকাল। হাসল।বলল — প্রতি পূর্ণিমায়।
শুরু হল এক অদ্ভুত প্রেম।
প্রতি পূর্ণিমায় মহেন্দ্র আসে। উমেরকোট থেকে লোদ্রবা — থরের বুক চিরে দীর্ঘ পথ। উটের পিঠে আসে একা। রাতে পৌঁছায়। ভোর হলে ফেরে।
মাঝখানে থাকে একটা রাত।
শুধু একটা রাত।
কিন্তু সেই একটা রাতের জন্যই বেঁচে থাকে দুজন।মোমল অপেক্ষা করত।পূর্ণিমার আগের দিন থেকেই। ছাদে উঠে বসত সন্ধ্যায়। মরুভূমির দিকে তাকিয়ে থাকত। কোথাও একটা ধুলো উড়লে মনে হত — এল কি?তার সখীরা বলত — রাজকুমারী, এভাবে কতদিন চলবে?মোমল বলত — যতদিন চাঁদ উঠবে।
মহেন্দ্রও অপেক্ষা করত।
উমেরকোটে বসে দিন গুনত। রাজদরবারে মন থাকত না। শিকারে মন থাকত না। সব কাজের মাঝখানে একটাই মুখ ভাসত।তার বন্ধুরা বলত — রাজকুমার, বিয়ে করো। সংসার করো।মহেন্দ্র বলত — সংসার একটাই হয়। সে এখনো হয়নি।
মাস কাটল, বছর কাটল।প্রেম গভীর হল।একটু একটু করে, পূর্ণিমার পর পূর্ণিমায়।মোমল শিখে গেল মহেন্দ্রের পছন্দ। সে পছন্দ করে বাজরার রুটি ঘি দিয়ে, ঠান্ডা মাঠা, খেজুর। মহেন্দ্র শিখে গেল মোমলের মন। সে কখন হাসে, কখন চুপ করে থাকে, কখন চোখে একটা দূরত্ব আসে।
এই জানাটাই আসলে প্রেম।কিন্তু প্রেমের গল্পে বিধি থাকে।সবসময়।একদিন রাতে মহেন্দ্র এল।বাইরে ঝড়। থরের ঝড় ভয়ংকর। বালি উড়ছে, বাতাস গর্জাচ্ছে, আকাশ কালো।
সে ভিজে এসেছে, ক্লান্ত, ধুলোয় ঢাকা।মোমলের ঘরে ঢুকল।
কিন্তু সেখানে আলো কম। আর একটা মানুষ শুয়ে আছে মোমলের পাশে।মহেন্দ্রের বুকটা ধক করে উঠল।
সত্যিটা হল অন্যরকম।মোমলের বোন — সুমল। সে মাঝে মাঝে আসত বোনের কাছে থাকতে। সেদিনও এসেছিল। ঝড়ের কারণে যেতে পারেনি। ঘুমিয়ে পড়েছিল মোমলের পাশে।
সুমল তখন পুরুষের পোশাক পরেছিল — ঝড়ের রাতে আসার সময়।অন্ধকারে মহেন্দ্র দেখল একটা পুরুষ শুয়ে আছে মোমলের পাশে।
সে কিছু বলল না।শুধু ঘুরে দাঁড়াল।বের হয়ে গেল।মোমল বুঝল না।ভোর হলে দেখল মহেন্দ্র নেই। সুমল ঘুম থেকে উঠল। মোমল সব বুঝল।দৌড়ে গেল বাইরে।মরুভূমিতে শুধু বালি। মহেন্দ্রের উটের পায়ের ছাপ — ঝড়ে মুছে যাচ্ছে।
মোমল চিৎকার করল তার নাম ধরে।মরুভূমি কোনো উত্তর দেয় না।মহেন্দ্র ফিরল না পরের পূর্ণিমায়।তার পরেরটায়ও না।
মোমল অপেক্ষা করল। ছাদে বসে রইল। মরুভূমির দিকে তাকিয়ে।দিন গেল। সপ্তাহ গেল। মাস গেল।মহেন্দ্র এল না।মোমল সিদ্ধান্ত নিল।সে যাবে।পুরুষের পোশাক পরল। মাথায় পাগড়ি বাঁধল। একটা উট নিল। একা বের হল রাতের মরুভূমিতে।
তার সখীরা কাঁদল। বলল — রাজকুমারী, একা যেও না। মরুভূমি মেরে ফেলবে।
মোমল বলল — মরুভূমি মারলে ভালোই হবে। এই অপেক্ষা আর সহ্য হচ্ছে না।
থরের বুক দিয়ে একা হাঁটছে মোমল।দিনে রোদ মাথায় পড়ছে। রাতে ঠান্ডায় কাঁপছে শরীর। জল কমে আসছে। পথ চেনে না ঠিকমতো।কিন্তু থামছে না।প্রেম মানুষকে অসম্ভব কাজ করায়। এটাই তার নিয়ম।
উমেরকোট।মোমল পৌঁছাল।
পুরুষের বেশে। ক্লান্ত, ধুলোয় ঢাকা, চোখে ঘুম নেই।মহেন্দ্রের প্রাসাদের সামনে দাঁড়াল।
ভেতরে পাঠাল খবর — লোদ্রবা থেকে একজন এসেছে। জরুরি কথা আছে।
মহেন্দ্র বের হয়ে এল।
দেখল একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে। ধুলোয় ঢাকা। মুখ ঢাকা পাগড়িতে।তারপর পাগড়িটা সরল।মহেন্দ্রের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।মোমল।
দুজন দুজনকে দেখল।কতক্ষণ — কেউ জানে না।
তারপর মোমল বলল — সেই রাতে যা দেখেছিলে, তা সত্যি ছিল না।
মহেন্দ্র বলল — জানি।
মোমল বলল — তাহলে ফিরলে না কেন?মহেন্দ্র চুপ করে রইল।
সত্যিকারের উত্তর কখনো সহজ হয় না। কারণ মানুষ নিজেও জানে না সবসময় কেন কী করে।
সেখানে দুজনের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, সেটা ইতিহাস লেখেনি।শুধু বলা আছে — মহেন্দ্র সেদিন মোমলের হাত ধরেছিল।আর ছাড়েনি।
কিন্তু প্রেমের গল্প কি সুখে শেষ হয়?থরের প্রেমের গল্প হয় না।
মরুভূমিতে সুখের পরিণতি হয় না।মহেন্দ্র মোমলকে নিয়ে ফিরছিল লোদ্রবায়।পথে বালির ঝড় উঠল।সেই ঝড়ে পথ হারিয়ে গেল।মহেন্দ্র একা ছিল না — কিন্তু মরুভূমি একা করে দেয়। সেই ঝড়ে মহেন্দ্র মোমলকে হারিয়ে ফেলল।
পরে খোঁজ পাওয়া গেছিল।
মোমলকে পাওয়া গেছিল একটা বালির ঢিবির কাছে।বসে আছে। চোখ বন্ধ।
মহেন্দ্রকে পাওয়া গেছিল কিছুটা দূরে।দুজনেই নেই।
থরের মানুষ বলে — সেই জায়গায় এখনো পূর্ণিমার রাতে দুটো ছায়া দেখা যায়।একটা ছায়া হাঁটছে। আরেকটা ছায়া তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কেউ বলে — বালিতে কান পাতলে শোনা যায় একটা মেয়ের গলা।সে ডাকছে।একটাই নাম।
মরুভূমিতে প্রেম এইভাবেই থাকে।শেষ হয় না। মুছে যায় না।
শুধু বালির নিচে চলে যায়।
আর মাঝে মাঝে — ঠিক পূর্ণিমার রাতে — উঠে আসে।
মোমল আর মহেন্দ্রের এই লোককথা রাজস্থানের মরুভূমিতে আজও বেঁচে আছে। থরের বালি যে গল্প বুকে নিয়ে আছে, সেটা শুধু প্রেমের গল্প নয় — সেটা বিশ্বাসের গল্প, ভুল বোঝাবুঝির গল্প, আর শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়ার গল্প।

Comments
Post a Comment