কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয়



কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয়

কিছু কিছু গল্প আছে যেগুলো শুনতে শুনতে মনে হয় — এটা শুধু একটা পরিবারের গল্প নয়, এটা আসলে একটা গোটা যুগের গল্প। কুন্তিভোজের রাজ্যের কথা সেই রকম। চম্বল নদীর তীরে, মালব অঞ্চলের উর্বর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট রাজ্যটা হয়তো মানচিত্রে বড় জায়গা নেয় না। কিন্তু মহাভারতের ইতিহাসে এই রাজ্যের অবদান অপরিসীম। কারণ এখানেই একটি মেয়ে বড় হয়েছিলেন,


Watch More

যাঁর পাঁচ পুত্র একদিন পুরো ভারতবর্ষ কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

**এক**

কুন্তিভোজ ছিলেন যদুবংশীয় শূরসেনের ভাই। শূরসেন — যাঁর নাতি ছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ।কুন্তিভোজের রাজ্য ছিল, সেনা ছিল, ঐশ্বর্য ছিল। শুধু ছিল না একটাই জিনিস — সন্তান। দীর্ঘদিন কেটে গেছে, কিন্তু রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে শিশুর কান্না শোনা যায়নি।এদিকে শূরসেনের প্রথম সন্তান জন্মাল — একটি মেয়ে। নাম রাখা হলো পৃথা।

শূরসেন একসময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভাইকে — প্রথম সন্তান তাঁকে দেবেন। প্রতিশ্রুতির কথা মনে রইল। পৃথাকে কোলে তুলে দিলেন কুন্তিভোজের হাতে।কুন্তিভোজ মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সেদিন থেকে পৃথা আর পৃথা রইল না। সে হয়ে গেল কুন্তী — কুন্তিভোজের কন্যা, কুন্তি রাজ্যের রাজকুমারী।

**দুই**

কুন্তী বড় হলেন রাজপ্রাসাদের আদরে। কিন্তু আদরে নষ্ট হননি। বরং অসাধারণ ধৈর্য, সেবাপরায়ণতা আর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় হলেনএকদিন মহর্ষি দুর্বাসা এলেন কুন্তিভোজের প্রাসাদে। দুর্বাসার নাম শুনলেই লোকে ভয় পায়। রাগ তাঁর আগুনের চেয়েও তীব্র। একটু অযত্ন হলেই অভিশাপ নিশ্চিত।কিন্তু কুন্তী ভয় পেলেন না।দিনের পর দিন তিনি মুনিকে সেবা করলেন। ভোরবেলা উঠে রান্না, সময়মতো খাবার পরিবেশন, মুনির পছন্দ-অপছন্দ মনে রাখা — কিছুই বাদ দিলেন না। মুনি যখন মেজাজ দেখালেন, কুন্তী নীরবে সহ্য করলেন। যখন চুপ করে থাকলেন, কুন্তী আরও যত্নশীল হলেন।

দুর্বাসা মুগ্ধ হলেন।

যাওয়ার আগে বললেন, "তোমার সেবায় আমি তুষ্ট। তোমাকে একটি মন্ত্র দিচ্ছি। এই অথর্ববেদীয় মন্ত্রের সাহায্যে তুমি যে কোনো দেবতাকে আহ্বান করতে পারবে, এবং তাঁর ঔরসে সন্তান লাভ করতে পারবে।"বলে চলে গেলেন।কুন্তী সেই মন্ত্র বুকের গভীরে তুলে রাখলেন। তিনি জানতেন না, এই মন্ত্রই একদিন পাঁচ মহাবীরের জন্ম দেবে।

**তিন**

কুন্তী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। রূপের সঙ্গে গুণও ছিল সমান। কুন্তিভোজ ভাবলেন, এমন মেয়ের জন্য স্বয়ম্বর সভাই উপযুক্ত।সভার আয়োজন হলো। দূরদূরান্ত থেকে রাজারা এলেন। কুন্তী একে একে সকলকে দেখলেন।তারপর থামলেন পাণ্ডুর সামনে।পাণ্ডু — হস্তিনাপুরের রাজপুত্র, কুরুবংশের গৌরব। শান্ত চোখ, দৃঢ় মুখ, শরীরে বীরত্বের ছাপ। কুন্তী মালা তুলে দিলেন তাঁর গলায়।বিবাহ সম্পন্ন হলো।পাণ্ডু কুন্তীকে নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরলেন। সঙ্গে প্রচুর ধনরত্ন, উপহার, কুন্তিভোজের আশীর্বাদ। হস্তিনাপুর সেদিন আনন্দে মেতে উঠল।

**চার**

কিন্তু ভীষ্ম ভাবলেন, পাণ্ডুর একটি বিবাহই যথেষ্ট নয়। রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য, বংশের ধারাবাহিকতার জন্য আরও একটি বিবাহ প্রয়োজন।মদ্ররাজের কথা মাথায় এল। মদ্ররাজের বোন মাদ্রী — রূপে গুণে অতুলনীয়।ভীষ্ম নিজে সৈন্যসামন্ত নিয়ে মদ্র রাজ্যের রাজধানীতে গেলেন। মাদ্রীর দাদা শল্য ভীষ্মকে দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। ভীষ্মের কথায় রাজি হলেন। প্রচুর ধনসম্পদ, অলঙ্কার, হাতি-ঘোড়া উপহার দিয়ে মাদ্রীকে পাঠিয়ে দিলেন হস্তিনাপুরে।পাণ্ডু ও মাদ্রীর বিবাহ হলো।এরপর কিছুকাল হস্তিনাপুরে সুখের সংসার চলল। পাণ্ডু দুই স্ত্রী নিয়ে রাজ্য সামলালেন, প্রজাদের ভালোবাসলেন। কিন্তু পাণ্ডুর মন ঘরে থেমে থাকতে চাইল না।

**পাঁচ**

একদিন পাণ্ডু ডাকলেন সভাসদদের।বললেন, "আমি দিগ্বিজয়ে যেতে চাই।"ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চাওয়া — এটা কুরুবংশের রক্তে আছে। শান্তনুও এমনই ছিলেন। ভীষ্মও বীর। পাণ্ডুও সেই ধারার মানুষ।ভীষ্মের কাছে গেলেন আশীর্বাদ নিতে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্র, কুরুবংশের বড়রা — সকলের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিলেন। কুলব্রাহ্মণরা মন্ত্র পড়ে আশীষ দিলেন।তারপর পাণ্ডু বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে বিশাল সেনাবাহিনী। তীরন্দাজ, গজারোহী, রথী, পদাতিক — শত্রুপক্ষ দেখলেই যাদের সাহস টলে যাবে।

**ছয়**

প্রথম আঘাত পড়ল দর্শর্ণ রাজার ওপর। যুদ্ধ হলো। পাণ্ডু জিতলেন।তারপর মগধের রাজা। তিনিও পাণ্ডুর সামনে টিকতে পারলেন না। রাজকোষ থেকে বেরিয়ে এল অশ্ব, গজ, অলঙ্কার, সোনারুপা।বিদেহরাজও পরাজিত হলেন।একে একে কাশী, পুণ্ড্র — সব রাজ্য মাথা নত করল। অনেক রাজা যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করলেন। কারণ পাণ্ডুর বাহিনীর কথা তখন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।রাজারা একে একে এলেন। পাণ্ডুকে সম্মান জানালেন। বললেন, "আপনি দিগ্বিজয়ী। আপনি শ্রেষ্ঠ।" উপহার দিলেন রত্ন, মণি, সোনা, রুপা, ঘোড়া, রথ — যা দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।পাণ্ডুর অভিযান শেষ হলো। বিজেতা হয়ে ফিরলেন হস্তিনাপুরে।

**সাত**

হস্তিনাপুর সেদিন প্রায় কাঁদছিল আনন্দে।ভীষ্ম পাণ্ডুকে দেখলেন — সুস্থ, দৃঢ়, বিজয়ী। বৃদ্ধের চোখে জল এল। যে মানুষ সারাজীবন আবেগ চেপে রেখেছেন, তিনি সেদিন আর পারলেন না।পাণ্ডু জয়ের সব সম্পদ নিয়ে এলেন সত্যবতী ও ভীষ্মের সামনে। সব তুলে দিলেন তাঁদের হাতে। নিজের জন্য কিছু রাখলেন না।এটাই ছিল পাণ্ডু। যুদ্ধে নিষ্ঠুর, কিন্তু ঘরে বিনয়ী। বিজেতা, কিন্তু অহঙ্কারহীন।

**আট**

এই সময়ে ভীষ্ম আরেকটি কাজ সারলেন।বিদুরের বিবাহের ব্যবস্থা করলেন। দেবকরাজের এক পরিচারিকার সুন্দরী কন্যার সঙ্গে বিদুরের বিয়ে হলো। দাসীপুত্র বিদুরের জন্য সাধারণ ঘরের মেয়ে — এই মিলনে কোনো আড়ম্বর ছিল না। কিন্তু একটা শান্তি ছিল।বিদুর সারাজীবন সত্যের পথে চলেছেন। তাঁর সংসারও সেই সত্যের মতোই নিরাড়ম্বর, কিন্তু মজবুত।কুরুবংশের সেই অধ্যায়টা তখন তুলনামূলক শান্ত ছিল। পাণ্ডু দিগ্বিজয়ী, ধৃতরাষ্ট্র রাজ্য সামলাচ্ছেন, বিদুর পরামর্শ দিচ্ছেন, ভীষ্ম পাহারায় আছেন।কিন্তু এই শান্তি বেশিদিন থাকবে না। মহাভারতে কোনো শান্তিই বেশিদিন থাকে না।পরের ঝড়ের জন্য তখনও অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ঝড় আসছে — এটা যেন বাতাসেই টের পাওয়া যাচ্ছিল।

Comments

Popular posts from this blog

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত।