প্রেমের জন্য যুদ্ধ — রুক্মিণীর সাহস ও কৃষ্ণের রথ
প্রেমের জন্য যুদ্ধ — রুক্মিণীর সাহস ও কৃষ্ণের রথ
বিদর্ভের রাজপ্রাসাদে একটি মেয়ে বড় হচ্ছিল। নাম রুক্মিণী। রাজকন্যা, তবু তার মনে কোনো অহংকার নেই — শুধু একটা নাম, বারবার ফিরে আসে। কৃষ্ণ। দ্বারকার সেই মানুষটার কথা সে শুনেছে, কতটুকু শুনেছে তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু যতটুকু শুনেছে, তাতেই মন দিয়ে বসেছে। এই হলো প্রেম — কোনো যুক্তি নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কিন্তু দাদা রুক্মী সব জানে, সব বোঝে — শুধু বোনের মনটা বোঝে না। সে ঠিক করে দিয়েছে, রুক্মিণীর বিয়ে হবে শিশুপালের সঙ্গে। চেদির রাজা। ক্ষমতাবান, প্রতাপশালী। কিন্তু রুক্মিণীর কাছে সে শুধুই একটা অপরিচিত মুখ — যাকে সে চায় না, কোনোদিন চায়নি।মেয়েরা সেকালে কাঁদত, মেনে নিত। রুক্মিণী সেই দলে নয়।
সে বসে পড়ল, ভাবল। তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিল — এমন সিদ্ধান্ত, যা নিতে বুকের পাটা লাগে।একজন বিশ্বস্ত ব্রাহ্মণকে ডাকল। হাতে তুলে দিল একটি পত্র। বলল — এটি পৌঁছে দাও দ্বারকায়, কৃষ্ণের হাতে।
সেই চিঠিতে কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো আবেগের বাড়াবাড়ি নেই। সরাসরি কথা — "হে কৃষ্ণ, আমি আপনাকেই আমার মনের স্বামী বলে বেছে নিয়েছি। আপনি ছাড়া আর কাউকে আমি গ্রহণ করব না। বিবাহের আগের দিন আমি দেবী গৌরীর মন্দিরে পূজা দিতে যাব। সেই সময় আপনি এসে আমাকে হরণ করে নিয়ে যান। নইলে আমি প্রাণ বিসর্জন দেব।"
একটি মেয়ে, একটি চিঠি, একটি জীবনের বাজি।
কৃষ্ণ চিঠি পড়ল। সে বহু কথা জানে, বহু মানুষ চেনে — কিন্তু এই চিঠির ভাষায় এমন কিছু ছিল, যা তাকে এক মুহূর্তও বসে থাকতে দিল না। রথ তৈরি হলো। দ্বারকা থেকে বিদর্ভের পথে ধুলো উড়ল বিবাহের আগের দিন। রুক্মিণী দেবী গৌরীর মন্দিরে গেল পূজা দিতে। পরিচারিকারা সঙ্গে, রাজকীয় আয়োজন। কিন্তু মন্দির থেকে বেরিয়ে সে যখন পথে পা দিল, দেখল — একটি রথ দাঁড়িয়ে আছে। আর রথের উপর সেই মানুষ, যার জন্য সে এতদিন অপেক্ষা করেছিল।
কোনো কথা নয়, কোনো নাটক নয়। রুক্মিণী রথে উঠল। কৃষ্ণ ঘোড়া ছোটাল।
পেছনে শিশুপালের সৈন্য, রুক্মীর ক্রোধ, রাজকীয় অহংকারের ধুলো। কিন্তু বলরাম ছিলেন, যাদব বাহিনী ছিল। যুদ্ধ হলো। রুক্মী পরাজিত হলো — কিন্তু কৃষ্ণ তাকে মারল না। শত্রুকেও ক্ষমা করতে পারে, এই মানুষটা একটু অন্যরকম।
দ্বারকায় ফিরে বৈদিক রীতিতে বিবাহ হলো। অগ্নিসাক্ষী, সপ্তপদী। রুক্মিণী হলেন কৃষ্ণের পটরানি।কিন্তু এই গল্পের আসল নায়িকা রুক্মিণী নিজে। সে ভাগ্যের জন্য বসে থাকেনি — ভাগ্য নিজের হাতে লিখে নিয়েছিল। একটি চিঠিতে, একটি সাহসী সিদ্ধান্তে।প্রেম মানে শুধু অনুভব করা নয় — প্রেম মানে ঝুঁকি নেওয়া।রুক্মিণী সেটা জানত।


Comments
Post a Comment