গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়- ১ম থেকে ৩য় শ্লোক
গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়- ১ম থেকে ৩য় শ্লোক
দুর্যোধন উভয় পক্ষের মহান যোদ্ধাদের নাম উল্লেখ করলেও দ্রোণাচার্য কোনো উত্তর দিলেন না, ফলে দুর্যোধন বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। তাঁকে উৎসাহ দিতে ভীষ্ম উচ্চস্বরে শঙ্খ বাজালেন। সেই ধ্বনি শুনে কৌরব ও পাণ্ডব উভয় পক্ষের শঙ্খ, দামামা, শিঙা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে বেজে উঠল। এরপর (বিংশ শ্লোক থেকে) শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথন শুরু হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: দ্বিতীয় অধ্যায় (শ্লোক ২.২)
শ্রীভগবানুবাচ कुतस्त्वा कश्मलमिदं विषमे समুপस्थितम्। अनार्यजुष्टमस्वर्ग्यमकीर्तिकरमर्जुन ॥ ২.২ ॥
অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবান বললেন, "হে অর্জুন! জীবনের এই সংকটময় মুহূর্তে তোমার মধ্যে এমন অপ্রকৃতিস্থ মোহ কোথা থেকে এল? এ আচরণ কোনো মহৎ বা আর্য ব্যক্তির নয়; এটি তোমার জন্য স্বর্গ বা যশ—কোনোটিই বয়ে আনবে না।"
শ্লোকের গভীর তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ
এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাপুরুষতা ও মোহ দেখে তীব্র বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা:
- 'অর্জুন' নামকরণের তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ এখানে তাঁকে 'অর্জুন' বা 'বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী' বলে সম্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তোমার মতো নির্মল চরিত্রের বীরের মুখে এমন ভীরুতা অত্যন্ত বেমানান।
- বিস্ময়ের অন্তর্নিহিত অর্থ: "কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং"—শ্রীকৃষ্ণ যেন বিস্ময়ে হতবাক! বীরত্ব ও উদ্দীপনার জায়গায় আজ কেন এই মোহ? 'কুতঃ' বা 'কোথা থেকে' শব্দটির মাধ্যমে ভগবান বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, এই ভীরুতা অর্জুনের আসল স্বভাব নয়; এটি একটি সাময়িক দুর্বলতা মাত্র, যা সহজেই দূর করা সম্ভব।
- কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ: "সমুপস্থিতম্" শব্দটি প্রমাণ করে, অর্জুনের এই ভীরুতা কেবল মনে বা কথায় সীমাবদ্ধ নেই; তা তাঁর আচরণেও প্রকাশ পেয়েছে—তিনি অস্ত্র ত্যাগ করে রথের আসনে ভেঙে পড়েছেন।
কাপুরুষতার তিনটি বড় পরিণতি
শ্রীকৃষ্ণ তিনটি বিশেষণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন এই মোহ বা কাপুরুষতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়:
১. অনার্যজুষ্টম্ (সজ্জনবিরুদ্ধ আচরণ): এটি কোনো মহৎ বা গুণী ব্যক্তির আচরণ নয়। যাঁরা জীবনের পরম লক্ষ্য বা মোক্ষ লাভ করতে চান, তাঁরা কখনো নিজ কর্তব্যবিমুখ হন না। ২. অস্বর্গ্যম্ (স্বর্গলাভের অন্তরায়): মোক্ষের কথা বাদ দিলেও, জাগতিক দৃষ্টিতে পুণ্যকর্মের ফল স্বর্গলাভ। কিন্তু এই কাপুরুষতা অর্জুনকে সেই স্বর্গসুখ থেকেও বঞ্চিত করবে। ৩. অকীর্তিকরম্ (অযশ ও কলঙ্ক): পরকালের চিন্তা বাদ দিলেও, একজন বীরের কাছে তাঁর সুনাম ও খ্যাতি সবচেয়ে দামি। অথচ এই ভীরুতা অর্জুনের জীবনে কেবল দুর্নাম ও কলঙ্কই ডেকে আনবে।
উপসংহার
শাস্ত্রমতে, জ্ঞান ও বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিরাই প্রকৃত 'আর্য'। ভগবান এখানে মূলত তিন শ্রেণির মানুষের উল্লেখ করেছেন—
- কল্যাণকামী: যাঁরা পরমার্থ বা মুক্তি চান।
- পুণ্যবান: যাঁরা সৎকর্মে স্বর্গলাভ করতে চান।
- সাধারণ মানুষ: যাঁরা পৃথিবীতে নাম ও যশ অর্জন করতে চান।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে চূড়ান্ত সতর্কবাণী দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, এই মোহ তাঁকে আধ্যাত্মিক কল্যাণ, স্বর্গ বা খ্যাতি—কোনোটিই দেবে না; বরং তাঁর জীবনকে অধঃপতন ও কলঙ্কের দিকে ঠেলে দেবে। তাই মোহ কাটিয়ে নিজ কর্তব্যে অবিচল হওয়াটাই অর্জুনের একমাত্র পথ।
স্বধর্ম ও আত্মজাগরণের বার্তা: গীতার ক্লৈব্য বর্জনের আহ্বান
ভূমিকা
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় কেবল অর্জুনের মোহগ্রস্ততার কাহিনী নয়, এটি মানবজীবনের সংকটময় মুহূর্তে সঠিক দিকনির্দেশনার এক চিরন্তন আলেখ্য। বিষাদগ্রস্ত অর্জুন যখন কর্তব্যকর্মে বিমুখ হয়ে রথের ওপর ভেঙে পড়েছিলেন, তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে তীব্র ভাষায় জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। প্রথম দুটি শ্লোকে অর্জুনের আচরণের অনুচিত দিক তুলে ধরার পর, তৃতীয় শ্লোকে ভগবান তাঁকে সরাসরি কাপুরুষতা ত্যাগ করে নিজ কর্তব্যে উঠে দাঁড়ানোর সুস্পষ্ট নির্দেশ দেন।
মূল শ্লোক: क्लैब्यं मा स्म गमः पार्थ नैतत्त्वय्युपपद्यते । क्षुद्रं हृदयदौर्बल्यं त्यक्त्वोत्तिष्ठ परन्तप ॥ ৩ ॥
অনুবাদ: "হে পার্থ! তুমি ক্লৈব্য বা কাপুরুষতার বশবর্তী হয়ো না। এটি তোমার পক্ষে মোটেও শোভন নয়। হে শত্রুতাপন! হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা ত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও।"
সম্বোধনের গূঢ় অর্থ ও বীরত্ববোধের জাগরণ
এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নামে সম্বোধন করেছেন—'পার্থ' এবং 'পরন্তপ'।
১. 'পার্থ' সম্বোধনের গভীরতা: পৃথা অর্থাৎ মাতা কুন্তীর সন্তান হিসেবে অর্জুনকে 'পার্থ' বলা হয়েছে। গীতার সমগ্র কুরুক্ষেত্র প্রাঙ্গণে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সবচেয়ে বেশি—মোট ৩৮ বার—'পার্থ' বলে সম্বোধন করেছেন। এই সম্বোধনটি কেবল তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক ও গভীর সখ্যতাকেই প্রকাশ করে না, বরং মাতা কুন্তীর সেই ঐতিহাসিক বার্তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। কুন্তী দেবী বার্তা পাঠিয়েছিলেন: "একজন ক্ষত্রিয় জননী যে শুভ ক্ষণের প্রত্যাশায় বীর সন্তানদের জন্ম দেন, সেই সময় আজ সমাগত।" 'পার্থ' সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, এক বীরপ্রসূতা মায়ের সন্তান হয়ে কাপুরুষতা প্রদর্শন করা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত অনুচিত।
২. 'পরন্তপ' শব্দের তেজ: 'পরন্তপ' শব্দের অর্থ যিনি শত্রুদের দহন করেন বা দমন করেন। একজন বিজয়ী বীর, যাঁর ভয়ে শত্রুরা কম্পমান থাকে, তিনি নিজেই যদি আজ অহিংসা ও দয়ার ছদ্মবেশে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান, তবে তা শত্রুদের কাছে আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর ভেতরের লুকায়িত শক্তি ও ত্যাজস্বী রূপটি স্মরণ করিয়ে দেন।
'ক্লৈব্য' ও ছদ্ম-ধর্মের স্বরূপ উন্মোচন
অর্জুন নিজের স্বজনপ্রীতি ও মানসিক দুর্বলতাকে 'ধর্ম' বা 'অহিংসা' বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, স্বজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করাটাই হয়তো পরম ধর্ম। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই যুক্তিকে একমুহূর্তেই নস্যাৎ করে দিয়ে একে 'ক্লৈব্য' (নপুংসকতা বা ভীরুতা) বলে অভিহিত করেন।
ভগবানের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে যুদ্ধ ত্যাগ করাটা ধর্ম নয়, বরং অধর্ম ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। অর্জুনের এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানটি মূলত শত্রুর সামনে পিছু হটার এক অজুহাত মাত্র। তাই শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, "নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে"—অর্থাৎ এই ধরণের ক্লৈব্য অর্জুনের মতো মহান যোদ্ধার চরিত্রে একেবারেই মানায় না।
হৃদয়ের ক্ষুদ্র দুর্বলতা বর্জন
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের বর্তমান অবস্থাকে "ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং" বা 'হৃদয়ের অতি তুচ্ছ দুর্বলতা' বলে আখ্যা দিয়েছেন। এখানে 'ক্ষুদ্র' শব্দটি দুটি গভীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:
- হীনতার সূচক: এই কাপুরুষতা অর্জুনকে এক অতি হীন ও তুচ্ছ সত্তায় পরিণত করবে। এটি তাঁকে জীবনে স্বর্গ, পরমার্থ কিংবা যশ—কোনোটিই এনে দেবে না, বরং জগতসংসারে তাঁকে অপযশের ভাগী করবে।
- সহজে ত্যাজ্য: দুর্বলতাটি অত্যন্ত তুচ্ছ ও সাময়িক। অর্জুনের মতো পরম বীরের পক্ষে এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে চূর্ণ করে উঠে দাঁড়ানো একেবারেই কঠিন কিছু নয়।
শ্রীকৃষ্ণ বুঝেছিলেন, অর্জুনের দেওয়া অজুহাতগুলো কোনো জ্ঞানলব্ধ সত্য নয়, বরং তা সাময়িক মোহের ফসল। তাই অর্জুনের অনর্থক তর্কে কান না দিয়ে ভগবান তাঁকে একবাক্যে নির্দেশ দেন—হৃদয়ের এই তুচ্ছ দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে এবং নিজের নির্ধারিত দায়িত্ব বা স্বধর্ম পালন করতে।
উপসংহার
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী কেবল দ্বাপর যুগের অর্জুনের জন্য নয়; এটি সর্বকালের সব মানুষের জন্য এক চিরন্তন মহামন্ত্র। জীবনে যখনই কোনো সংকটের মুহূর্তে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি জাগে, কিংবা যখন আমরা মনের দুর্বলতাকে 'ধর্ম' বা 'নীতি'-র দোহাই দিয়ে আড়াল করতে চাই—তখনই গীতার এই শ্লোকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কর্মবিমুখতা কোনো সততা নয়, তা হৃদয়ের দুর্বলতা মাত্র। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হলে হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা ত্যাগ করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠে দাঁড়ানোই মানবজীবনের আসল উদ্দেশ্য।
: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে বিরাট পর্ব ১১ ভাগে উদ্যোগপর্ব ৪৬ ভাগে এবং ভীষ্মপর্ব দ্বিতীয় ভাগেসম্পন্ন করেছে।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায়ের -অর্জুনবিষাদযোগের আলোচনা শেষ হয়েছে
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: দ্বিতীয় অধ্যায়ের শ্লোক
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদযোগ) ৪৫তম থেকে ৪৭তম শ্লোক পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আমাদের গল্পগুলো নিয়মিত সবার আগে বিনামূল্যে পেতে এখনই নিচে সাবস্ক্রাইব করুন।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments
Post a Comment