Posts

২৬তম বনপর্ব-প্রভাস তীর্থে যুধিষ্ঠির এবং চ্যবনের অক্ষি-উন্মোচন

Image
২৬তম বনপর্ব-প্রভাস তীর্থে যুধিষ্ঠির এবং চ্যবনের অক্ষি-উন্মোচন মহেন্দ্র পর্বতের বুক চিরে তখন হিমেল হাওয়া বইছে। পাণ্ডবরা বনবাসের দিনগুলো এক এক করে কাটচ্ছেন, সঙ্গে দ্রৌপদী। ঠিক এই সময়েই এক চতুর্দশীর পুণ্যলগ্নে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন স্বয়ং মহাবীর ও পরশুরাম। পাণ্ডব ভ্রাতারা এবং দ্রৌপদী পরম শ্রদ্ধায় সেই তেজস্বী ঋষির চরণে প্রণত হলেন। অর্ঘ্য ও শ্রদ্ধায় তুষ্ট হয়ে পরশুরাম তাঁদের বললেন, "তোমাদের এই তীর্থযাত্রা সার্থক হোক। তোমরা এবার দক্ষিণাপথের দিকে এগিয়ে যাও।" পরশুরামের সেই নির্দেশ মাথায় নিয়ে পাণ্ডবরা সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। যেখানেই পুণ্যতোয়া নদী বা সাগরসঙ্গম দেখেন, সেখানেই থমকে দাঁড়ান, স্নান সেরে ঈশ্বরের আরাধনায় লীন হন। এইভাবেই একদিন তাঁরা পৌঁছলেন গোদাবরীর তীরে। মহর্ষি অগস্ত্যের স্মৃতিধন্য সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তাঁরা শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন নারী তীর্থের চরণে। এরপর সমুদ্র পেরিয়ে পাণ্ডবরা প্রবেশ করলেন এক নিবিড়, শান্ত অরণ্যে। সেখানে যুগের পর যুগ ধরে তপস্বীরা ধ্যানমগ্ন। সেই অরণ্যের শান্ত ছায়ায় বসু, ইন্দ্র, বিষ্ণু, শিব, চন্দ্র, সূর্য, বরুণ, কুবের ও সরস্বতীর দেবালয়গুলিতে পরম ভক...

২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময়

Image
২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময় কৌশিকী নদীর পুণ্যসলিলে অবগাহন সেরে পাণ্ডবেরা যখন অন্য তীর্থের অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন তাঁদের সাথে রয়েছেন লোমশ মুনি। লোমশ মুনি তাঁদের নিয়ে চললেন যেখানে গঙ্গা সাগরের সাথে মিতালী করেছে, সেই মহাসঙ্গমে। সমুদ্রের তীরবর্তী সেই সংকীর্ণ বালুকাপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁরা এসে পৌঁছলেন কলিঙ্গ দেশে। চারিদিকে গম্ভীর সমুদ্রের গর্জন। মহর্ষি লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "যুধিষ্ঠির, ওই দ্যাখ— ওটাই বৈতরণী নদী।" পাণ্ডবেরা এবং দ্রৌপদী সেই বৈতরণীর পবিত্র জলে দাঁড়িয়ে তাঁদের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পরম শ্রদ্ধায় তর্পণ করলেন। জল আর বাতাসের সেই যুগলবন্দীর পর তাঁরা এগিয়ে চললেন মহেন্দ্র পর্বতের দিকে। সেই রাতেই তাঁরা পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিলেন। সেখানে ভৃগু, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠের মতো কশ্যপ বংশের প্রথিতযশা ঋষিরা তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। লোমশ মুনি পাণ্ডবদের সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিতেই যুধিষ্ঠির ভক্তিভরে তাঁদের চরণে প্রণাম জানালেন। ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন পরশুরামের পরম শিষ্য অকৃতব্রণ। যুধিষ্ঠির কৌতূহলী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহাত...

২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান

Image
২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান লোমশ মুনি তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে পুনরায় বলতে শুরু করলেন: "হে যুধিষ্ঠির, রাজা ভগীরথ কীভাবে তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্ধারের জন্য গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন, সেই পুণ্যকথা তো শুনলে। এবার তোমাদের নিয়ে যাব অন্য দুটি পবিত্র নদীর তীরে— নন্দা আর অপরনন্দা। এই নদী দুটির জল পাপ আর ভয়, দুই-ই নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।" তপোবৃদ্ধ মুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, "মহারাজ, এই নন্দা নদীতে একবার স্নান করলে মানুষ সবচেয়ে কঠিন অভিশাপ থেকেও মুক্তি পায়। তুমি তোমার অনুজদের নিয়ে এখানে স্নান সম্পন্ন করো।" পাণ্ডবেরা মুনির নির্দেশ পালন করলেন। নন্দার শীতল জলে পা রাখতেই তাঁদের চিত্ত এক অদ্ভুত লঘুতা ও শান্তিতে ভরে উঠল। সেখান থেকে তাঁরা এগিয়ে চললেন কৌশিকী নদীর অভিমুখে। নদীটি যেমন পবিত্র, তেমনই তার চারপাশের প্রকৃতি মনোরম। লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "রাজন, চেয়ে দেখো, এই সেই পুণ্যতোয়া কৌশিকী। এর তীরেই একদা শোভা পেত বিশ্বামিত্রের তপোবন। আর কাছেই রয়েছে মহর্ষি কাশ্যপের আশ্রম, যা ‘পুণ্যাশ্রয়’ নামে খ্যাত। এখানেই কাশ্যপ-পুত্র বিভাণ্ডক তাঁর কুটির বেঁধেছি...

২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা

Image
  ২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা অগস্ত্যের সমুদ্র শোষণের কাহিনী শুনতে শুনতে যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে এক আশ্চর্য কৌতুহল দানা বেঁধেছিল। তিনি লোমশ মুনির দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে শুধালেন, "হে মহর্ষি, একজন ঋষি যদি দেবতাদের হিতার্থে এক চুমুকে অতলান্ত মহাসমুদ্রকে শূন্য করে দিতে পারেন, এখন  নৃপতির উপাখ্যান শোনান , যিনি এর ঠিক বিপরীত কাজটি করেছিলেন? যিনি মৃত আর জীবিতের মধ্যবর্তী লোকে আটকে থাকা পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতির জন্য সেই শুষ্ক সমুদ্রে আবার জলধারা ফিরিয়ে এনেছিলেন?" লোমশ মুনি মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠল এক সুদূর অতীতের ছবি। তিনি বলতে শুরু করলেন ইক্ষ্বাকু বংশের সেই পরম কীর্তিমান রাজা ভগীরথের কাহিনী। এক লাউয়ের ষাট হাজার সন্তান: সগরের অদ্ভুত বংশলতিকা ভগীরথের জন্মের বহু কাল আগের কথা। সূর্যবংশে সগর নামে এক পরম ধার্মিক ও প্রতাপশালী রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর ঐশ্বর্যের খামতি ছিল না, কিন্তু মনের কোণে ছিল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। বহু বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি স্বয়ং দেবাদিদেব শংকরের বর লাভ করলেন। শিব জানালেন, সগরের এক রানীর গর্ভে জন্ম...

২২তম বনপর্ব- আকাশছোঁয়া অহংকার এবং এক ঋষির সামান্য চাতুরী: বিন্ধ্যের দর্পচূর্ণ

Image
২২তম বনপর্ব- আকাশছোঁয়া অহংকার এবং এক ঋষির সামান্য চাতুরী: বিন্ধ্যের দর্পচূর্ণ লোমশ মুনি যখন তাঁর জটাজাল নেড়ে আদিমকালের এক একটি আখ্যান শোনাচ্ছিলেন, পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির তখন চিবুকে হাত দিয়ে গভীর মগ্নতায় শুনছিলেন সেই কথা। কিন্তু একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধে ছিল। তিনি শুনেছিলেন, কোনো এক সুদূর অতীতে বিন্ধ্য পর্বত নাকি এমন ভয়ঙ্কর এক অভিমানে ফেটে পড়েছিল যে, ক্রমশ নিজের শরীরটাকে বাড়িয়ে সে ছুঁয়ে ফেলেছিল আকাশ। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সূর্যের রথের চাকা, আর এক জমাট অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল সমগ্র দাক্ষিণাত্য। আলোহীন সেই দেশে মানুষ রোগে, শোকে অকালে মরতে বসেছিল। যুধিষ্ঠির আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহামতি লোমশ, বিন্ধ্যের এই সংহারী ক্রোধের কারণ কী ছিল? আর কিসের জোরেই বা শান্ত হলো সেই পর্বত?" লোমশ মুনির ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন। তখন পৃথিবীর বয়স অনেক কম। পাহাড়-নদীর বুকেও তখন মানুষের মতোই রক্তমাংসের অভিমান খেলা করত। এই ধরিত্রীর বুকে বিন্ধ্য ছিল এক ঐশ্বর্যময়, সুবিশাল পর্বতমালা—তার অরণ্যে চন্দনের গন্ধ, গর্ভে মণিমাণিক্যের ...

২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান

Image
২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান। যুধিষ্ঠির করজোড়ে বসলেন। চারধারে বনের স্তব্ধতা। রোমশ মুনির চোখের কোণে এক অদ্ভুত দ্যুতি। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, সত্যযুগের সেই ভয়ঙ্কর কালকেয় অসুরদের কথা। দেবতারা যখন বৃত্রাসুরের অত্যাচারে স্বর্গছাড়া, তখন ব্রহ্মা তাঁদের পথ দেখালেন। বললেন, দধীচি মুনির কাছে যাও। তাঁর অস্থি ছাড়া এই অসুরবধ অসম্ভব।" দেবতারা মর্ত্যে এলেন। সরস্বতী নদীর তীরে বসে তপস্যারত দধীচি কোনো দ্বিধা না করে নিজের দেহ বিসর্জন দিলেন। এক মহান ত্যাগের কঙ্কাল থেকে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা গড়ে তুললেন এক অমোঘ অস্ত্র—ছয় দাঁতবিশিষ্ট বজ্র। ইন্দ্রের সেই বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বৃত্রাসুর। বজ্রের আলো, মনের অন্ধকার বৃত্রাসুরের বিশাল শরীরটা যখন দধীচি মুনির হাড় দিয়ে তৈরি বজ্রের আঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল, তখন স্বর্গলোকে জয়ধ্বনি উঠেছিল। দেবতারা ফুল ছড়ালেন, গন্ধর্বরা গান গাইলেন। কিন্তু সেই মহোল্লাসের মাঝেও যিনি বিজয়ী, সেই দেবরাজ ইন্দ্রের বুকের ভেতরটা আচমকা ফাঁকা হয়ে গেল। বিজয়ীর আনন্দ নয়, এক তীব্র, হিমশীতল অপরাধবোধ গ্রাস করল তাঁকে। বৃত্রাসুর কেবল দেবতাদের ...

২০তম বনপর্ব- পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস

Image
  ২০তম বনপর্ব-পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস অগস্ত্য আশ্রমের সেই পুণ্যতোয়া জলে স্নান সমাপন করতেই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। যুধিষ্ঠিরের আজন্মদীপ্ত অবয়ব থেকে যেন ঠিকরে বেরোতে লাগল এক নতুন, প্রখর জ্যোতি। শত্রুদমনের এক অদ্ভুত সংকল্প জেগে উঠল তাঁর অন্তরে। কৌতূহল চাপতে না পেরে তিনি মহর্ষি লোমশের দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে সুধালেন, "প্রভু, আমি শুনেছি মহাতেজস্বী পরশুরাম নাকি একদা সমস্ত বীর্য ও মহিমা হারিয়ে শ্রীহীন, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিলেন? কেমন করে তা সম্ভব হয়েছিল? আর কীভাবেই বা তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর সেই পূর্বের দিব্য রূপ? দয়া করে আমাদের সেই কাহিনী শোনান।" লোমশ মৃদু হাসলেন। তারপর পাণ্ডবদের সবাইকে কাছে ডেকে গভীর মমতায় বলতে শুরু করলেন সেই আশ্চর্য উপাখ্যান। তখন অযোধ্যায় উৎসবের আলো। মিথিলারাজ জনকের রাজসভায় হরধনু ভঙ্গ করে রূপসী সীতার পাণিগ্রহণ করেছেন অযোধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজকুমার রামচন্দ্র। যে ধনুকে জ্যা-রোপণ করা তো দূর, ত্রিভুবনের কোনো বীর হাত দেওয়ার সাহসটুকুও পায়নি, রামচন্দ্র তা হেলায় তুলে দুই টুকরো করে দিয়েছেন। এমন অলৌকিক কীর্তির পর আনন্দ-কোলাহলে সীতাকে পাশে নিয়ে অযোধ্যার ...