২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান
২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান
লোমশ মুনি তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে পুনরায় বলতে শুরু করলেন:
"হে যুধিষ্ঠির, রাজা ভগীরথ কীভাবে তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্ধারের জন্য গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন, সেই পুণ্যকথা তো শুনলে। এবার তোমাদের নিয়ে যাব অন্য দুটি পবিত্র নদীর তীরে— নন্দা আর অপরনন্দা। এই নদী দুটির জল পাপ আর ভয়, দুই-ই নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।"
তপোবৃদ্ধ মুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, "মহারাজ, এই নন্দা নদীতে একবার স্নান করলে মানুষ সবচেয়ে কঠিন অভিশাপ থেকেও মুক্তি পায়। তুমি তোমার অনুজদের নিয়ে এখানে স্নান সম্পন্ন করো।"
পাণ্ডবেরা মুনির নির্দেশ পালন করলেন। নন্দার শীতল জলে পা রাখতেই তাঁদের চিত্ত এক অদ্ভুত লঘুতা ও শান্তিতে ভরে উঠল।
সেখান থেকে তাঁরা এগিয়ে চললেন কৌশিকী নদীর অভিমুখে। নদীটি যেমন পবিত্র, তেমনই তার চারপাশের প্রকৃতি মনোরম। লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "রাজন, চেয়ে দেখো, এই সেই পুণ্যতোয়া কৌশিকী। এর তীরেই একদা শোভা পেত বিশ্বামিত্রের তপোবন। আর কাছেই রয়েছে মহর্ষি কাশ্যপের আশ্রম, যা ‘পুণ্যাশ্রয়’ নামে খ্যাত। এখানেই কাশ্যপ-পুত্র বিভাণ্ডক তাঁর কুটির বেঁধেছিলেন। আর এই বিভাণ্ডকেরই পুত্র হলেন ঋষ্যশৃঙ্গ— যাঁর তপোবল ও সংযম এই আর্যাবর্তে একসময় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল। অনাবৃষ্টিতে পুড়ে খাক হতে যাওয়া এক রাজ্যকে তিনি কেবল নিজের পবিত্রতার জোরে প্লাবিত করেছিলেন মেঘের জলে। আর আশ্চর্য কী জানো রাজন, এই পরম তেজস্বী মুনির জন্ম হয়েছিল এক হরিণীর গর্ভে!"
যুধিষ্ঠির বিস্মিত ও সংশয়াকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কিন্তু মহর্ষি, শাস্ত্রে তো পশুর সঙ্গে মানুষের মিলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে একজন ব্রহ্মর্ষির ঔরসে আর হরিণীর গর্ভে কীভাবে এমন এক মহাত্মার জন্ম সম্ভব হলো?"
লোমশ মুনি মৃদু হাসলেন। যুধিষ্ঠিরের এই জিজ্ঞাসার গভীরে যে চিরন্তন মানব-কৌতূহল লুকিয়ে আছে, তা তিনি বুঝলেন। তারপর অতি ধীর, গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন সেই বিচিত্র কাহিনী।
অলৌকিক জন্ম ও এক শিং-এর রহস্য
"তোমার সংশয় স্বাভাবিক, ধর্মরাজ। শাস্ত্রের নিয়ম অলঙ্ঘনীয়। তবে ঋষ্যশৃঙ্গের জন্ম কোনো সাধারণ পশুবৃত্তির পরিণাম ছিল না। মন দিয়ে শোনো, তবেই এর রহস্য বুঝতে পারবে।
মহর্ষি বিভাণ্ডক ছিলেন কঠোর তপস্বী। ইন্দ্রিয়দের তিনি এমনভাবে বশ করেছিলেন যে বাহ্যিক জগতের কোনো স্পন্দন তাঁর মনকে চঞ্চল করতে পারত না। অহোরাত্র তিনি ডুবে থাকতেন ব্রহ্মচিন্তায়।
একদিন তিনি নদীতে স্নান করতে নেমেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে জলের ওপর খেলা করতে দেখিলেন এক পরমাসুন্দরী দেবকন্ঠাকে— এক অপ্সরাকে। বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত তপোবলও সেই অতর্কিত মুহূর্তে অবাধ্য কামনার এক ঝলকানিকে রুখতে পারল না। মুনির অজান্তেই তাঁর তেজ স্খলিত হয়ে মিশে গেল নদীর জলের সঙ্গে।
দৈবক্রমে, ঠিক তখনই একটি হরিণী তৃষ্ণা মেটাতে সেই ঘাটে জল খেতে আসে। জলের সঙ্গেই সে গ্রহণ করে বসল মুনির সেই মহিমান্বিত বীর্য। এক মহাসাধকের স্খলিত তেজ সাধারণ ধাতুতে গড়া ছিল না; তার মধ্যে ছিল সৃষ্টির আদিম ও প্রচণ্ড শক্তি। হরিণীটি গর্ভবতী হলো।
সময় পূর্ণ হলে হরিণী কোনো পশুপক্বী প্রসব করল না, জন্ম নিল এক মানবশিশু। সর্বাংশে সে মানুষ, কেবল তার কপালে গজিয়ে উঠেছে একটি ছোট্ট হরিণের শিং। এই কারণেই বিভাণ্ডক তাঁর পুত্রের নাম রাখলেন ‘ঋষ্যশৃঙ্গ’।
তুমি ভাবছ, পশু আর মানুষের মিলনে এটা কীভাবে সম্ভব? আসলে হরিণীটি কেবল এক আধার বা পাত্র মাত্র ছিল। যেমন উর্বর মাটিতে বীজ পড়লে মাটি নয়, বীজের চরিত্রই নির্ধারণ করে কী গাছ জন্মাবে— এখানেও তেমনই ঘটেছিল। বিভাণ্ডকের তেজের কাছে হরিণীর পশুত্ব হেরে গিয়েছিল। অনেকে অবশ্য বলেন, ওই হরিণী আসলে কোনো সামান্য পশু ছিল না, অভিশপ্ত এক অপ্সরা। সন্তান প্রসবের পর সে শাপমুক্ত হয়ে স্বর্গে ফিরে যায়। যাই হোক না কেন, ঋষ্যশৃঙ্গ মনে-প্রাণে, মননে ও আত্মায় ছিলেন খাঁটি মানুষ, শুধু কপালের ওই শিংটি রয়ে গিয়েছিল তাঁর অলৌকিক জন্মের স্মারক হিসেবে।
বিভাণ্ডক সেই সদ্যোজাত শিশুকে বনের মধ্যে কুড়িয়ে পান এবং গভীর অরণ্যের নির্জনতায় তাকে একাকী মানুষ করতে থাকেন। পিতা ছাড়া অন্য কোনো মানুষের মুখ— পুরুষ বা নারী— ঋষ্যশৃঙ্গ চোখ মেলে দেখেননি। এই অপার একাকীত্বের মধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে তরুণ ঋষ্যশৃঙ্গ লাভ করলেন এক অদ্ভুত, নিষ্কলঙ্ক পবিত্রতা। তাঁর তপোবল এতটাই প্রখর হয়ে উঠল যে স্বর্গের দেবতারাও তাঁকে সমীহ করতে লাগলেন।"
অঙ্গদেশের হাহাকার ও অপ্সরা-রূপী মায়া
"এই পবিত্রতাই কিন্তু পরে তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল, যুধিষ্ঠির। সেই সময় অঙ্গদেশে নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ অভিশাপ। সেখানকার রাজা লোমপাদ একদা ব্রাহ্মণদের দেওয়া এক প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেননি। ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণদের অভিশাপে অঙ্গরাজ্যে মেঘের আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো তীব্র খরা। মাটি ফেটে চৌচির, অন্নাভাবে মানুষ মরতে লাগল। রাজা লোমপাদ যজ্ঞ করলেন, প্রায়শ্চিত্ত করলেন, কিন্তু আকাশের মন গলল না। অবশেষে রাজজ্যোতিষী ও মন্ত্রীবর্গ জানালেন— যদি কোনোভাবে বিভাণ্ডক-পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে এই রাজ্যে আনা যায়, তবে তাঁর অস্পৃশ্য পবিত্রতার স্পর্শে আবার বৃষ্টি নামবে।
কিন্তু কাজটা ছিল অসম্ভব বললেই চলে। ঋষ্যশৃঙ্গ পৃথিবী চেনেন না, মানুষ চেনেন না। আর বিভাণ্ডক তাঁর পুত্রকে আগলে রাখেন এক হিংস্র মমতায়। বলপ্রয়োগের কথা চিন্তাও করা যায় না, কারণ বিভাণ্ডকের ক্রোধে গোটা রাজ্য ভস্ম হয়ে যেতে পারত।
তখন এক চতুর ফন্দি আঁটলেন অমাত্যেরা। রাজদরবারের সবচেয়ে রূপসী, চতুর ও কলাবতী নারীদের পাঠানো হলো অরণ্যে। তাদের ছদ্মবেশ পরানো হলো তপস্বিনীদের। উদ্দেশ্য— বলপ্রয়োগ নয়, স্নেহের মায়াজালে, ছলাকলায় ওই তরুণ ঋষিকে ভুলিয়ে অঙ্গদেশে নিয়ে আসা। ঋষ্যশৃঙ্গ তো নারী কী জিনিস জানেনই না, তাই নারী ও পুরুষের ভেদ বোঝার সাধ্য তাঁর ছিল না।
একদিন বিভাণ্ডক যখন ফলমূল সংগ্রহ করতে বনের গভীরে গেছেন, তখন সেই নারীদের প্রধানা এসে হাজির হলেন ঋষ্যশৃঙ্গের কুটিরে। তরুণের সামনে দাঁড়াল এক অপরূপ ‘তপস্বী’। তার কণ্ঠের মধুর তান, গলায় সুগন্ধী ফুলের মালা, আর ডাগর চোখের চাউনি ঋষ্যশৃঙ্গকে স্তব্ধ করে দিল। সরল ঋষিপুত্র তাকে নিজের মতোই এক বনের সাধক ভেবে ফল আর জল দিয়ে অতিথি সৎকার করলেন। কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর এক অচেনা আলোড়ন শুরু হলো।
সেই নারী বেশি ক্ষণ থাকল না। ঋষির মনে সংশয় দানা বাঁধার আগেই সে বিদায় নিল, তবে যাওয়ার আগে বলে গেল আবার আসবে। সে চলে যেতেই ঋষ্যশৃঙ্গ এক অদ্ভুত শূন্যতা আর চঞ্চলতা অনুভব করলেন— এক অবর্ণনীয় আকুলতা, যা তিনি আগে কখনো টের পাননি।
বিভাণ্ডক আশ্রমে ফিরে পুত্রের মুখে এই নতুন ‘অতিথি’র বিবরণ শুনেই প্রমাদ গুনলেন। তিনি গর্জে উঠে বললেন, ‘ওরা কোনো সাধক নয় রে বোকা, ওরা রাক্ষস! ঋষিদের তপোভঙ্গ করতে আসে। খবরদার, ওদের আর কখনো আশ্রমে ঢুকতে দিবি না!’ কিন্তু ততক্ষণে যুবকের হৃদয়ে সেই মায়াবী অনুভূতির বীজ রোপিত হয়ে গেছে।
পিতার অনুপস্থিতিতে সেই নারী আবার এল। এবার সে ঋষ্যশৃঙ্গকে প্রলোভন দেখাল নদীর ওপারে তার নিজের আশ্রমের। বলল, সে আশ্রম আরও সুন্দর, আরও বৈভবে ভরা। সরল, কৌতূহলী ও অনুরাগী ঋষিপুত্র আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সেই নারীর সঙ্গে যেতে রাজি হলেন।
নৌকায় করে নদী পার করে ঋষ্যশৃঙ্গকে নিয়ে আসা হলো অঙ্গদেশের মাটিতে। আর অলৌকিক কাণ্ড ঘটল ঠিক তখনই! যে মুহূর্তে সেই নিষ্কলঙ্ক তরুণ ঋষির পা পড়ল অঙ্গদেশের শুষ্ক ধুলোয়, অমনি তৃষ্ণার্ত আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি। কালো মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ, ডাকল বজ্র। দীর্ঘদিনের হাহাকার ধুয়ে দিয়ে প্রকৃতির বুকে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা। অঙ্গদেশের মানুষ উল্লাসে মেতে উঠল।
রাজা লোমপাদ নিজে এসে ঋষ্যশৃঙ্গকে দেবতাতুল্য সম্মানে বরণ করে নিলেন। কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ তিনি তাঁর নিজের কন্যা শান্তাকে ঋষ্যশৃঙ্গের হাতে সম্প্রদান করলেন। ঋষ্যশৃঙ্গও এতদিনে বুঝতে পারলেন সংসারী জীবনের মানে। শান্তার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও যত্নে তিনি প্রাসাদেই গৃহস্থ ধর্ম পালন করতে লাগলেন।
এদিকে আশ্রমে ফিরে পুত্রকে না পেয়ে ক্রোধে অন্ধ হয়ে বিভাণ্ডক মুনি ছুটে এলেন অঙ্গদেশে। তাঁর অভিশাপে লোমপাদের রাজ্য ধ্বংস হতে পারত। কিন্তু রাজা এত বিনয়, এত নম্রতা আর রাজকীয় সম্মানের সাথে বৃদ্ধ মুনিকে অভ্যর্থনা জানালেন যে মুনির রাগ জল হয়ে গেল। উপরন্তু, নিজের পুত্রকে রাজকন্যার পাশে সুখী ও সম্মানিত অবস্থায় দেখে এবং দেশের প্রজাদের মুখে হাসি দেখে বিভাণ্ডক শেষ পর্যন্ত শান্তা ও ঋষ্যশৃঙ্গকে হৃদয় উজাড় করে আশীর্বাদ করলেন।"
তপোবনের প্রত্যাবর্তন
"তবে বিদায় নেওয়ার আগে বিভাণ্ডক তাঁর পুত্রকে একটি পরম উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সংসার ধর্ম পালন করো পুত্র, কিন্তু মনে রেখো তোমার আসল পরিচয় অরণ্যে। যেদিন তোমার একটি সন্তান হবে, সেদিন রাজার অনুমতি নিয়ে আবার ফিরে এসো এই শান্ত তপোবনে।’
ঋষ্যশৃঙ্গ পিতার সেই কথা ভোলেননি। যথাসময়ে শান্তা ও ঋষ্যশৃঙ্গের কোল আলো করে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হলো। এরপর রাজপ্রাসাদের সমস্ত বিলাসিতা, দাসদাসী আর রাজকীয় ঐশ্বর্য এক পলকে ত্যাগ করে, রাজা লোমপাদের সশ্রদ্ধ বিদায় নিয়ে এই দম্পতি ফিরে এলেন সেই আদিম বনের কুটিরে।
সেখানেই বাকি জীবন পরম সুখে, একে অপরের প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও প্রেমে অতিবাহিত করলেন তাঁরা। আর্যাবর্তের ইতিহাসে নল-দময়ন্তী, বশিষ্ঠ-অরুন্ধতী কিংবা অগস্ত্য-লোপামুদ্রার মতোই ঋষ্যশৃঙ্গ ও শান্তার দাম্পত্য এক পবিত্র উপমা হয়ে রয়ে গেল।
হে যুধিষ্ঠির, এই হলো সেই ঋষির কাহিনী, যিনি হরিণীর গর্ভে জন্মেও নিজের আত্মার পবিত্রতা দিয়ে খরাগ্রস্ত পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন। এই গল্প আমাদের শেখায় যে, জন্মের পরিচয় যাই হোক না কেন, আত্মার শুদ্ধতা যদি অটুট থাকে, তবে তা পৃথিবীর যেকোনো কঠিন ক্ষতকেও নিরাময় করতে পারে।"
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ২৪তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ২৩তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Wow
ReplyDelete