রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত
রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত
অরণ্যবাসের সেই ধূসর দিনগুলো
সে এক অদ্ভুত দিন ছিল। ঘন অরণ্যের গভীরে শিকারের নেশায় মত্ত পাণ্ডু তখন জানতেন না, নিয়তি তাঁর জন্য কী ভয়ানক এক ফাঁদ পেতে রেখেছে। সঙ্গে দুই স্ত্রী—কুন্তী আর মাদ্রী। হঠাৎ পাণ্ডুর চোখে পড়ল এক জোড়া হরিণ আর হরিণী। কামাতুর সেই যুগল যখন মিলনে মগ্ন, ঠিক তখনই পাণ্ডুর ধনুক থেকে পাঁচটি তীক্ষ্ণ শর তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে বিঁধল তাদের শরীরে।
রক্তাক্ত হরিণটি যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ে মানুষের গলায় বলে উঠল, "মহারাজ, আপনি কি মানুষ? কামার্ত, ক্রূর আর মূর্খও তো এমন নৃশংস কাজ করে না! আমি কোনো সাধারণ পশূ নই, আমি ঋষি কিংদম। মানুষের শরীরে মিলনে লজ্জিত বোধ করেছিলাম বলে এই মৃগরূপ ধারণ করা। আপনি আমাকে ব্রহ্মহত্যার পাপে ফেলব না ঠিকই, কারণ আপনি জানতেন না আমার পরিচয়; কিন্তু মিলনের মুহূর্তে এই যে ব্যাঘাত ঘটালেন—তার অভিশাপ আপনাকে বইতে হবে। আজ থেকে আপনিও যখনই স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন, সেই মুহূর্তেই আপনার মৃত্যু ঘটবে।"
কথা কটি বলেই ঋষি কিংদম প্রাণত্যাগ করলেন। পাণ্ডুর চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিঝুম হয়ে গেল। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নিজের ভেতরে এক গভীর ঘৃণা অনুভব করলেন তিনি। মনে পড়ল বিচিত্রবীর্যের কথা, যিনি কামের নেশায় অকালে প্রাণ হারিয়েছিলেন। পাণ্ডু ভাবলেন, "আমি শান্তনুর পৌত্র হয়েও নিজের ইন্দ্রিয় দমন করতে পারলাম না? এই রাজৈশ্বর্য, এই ভোগ—সবই তো তুচ্ছ।"
তিনি স্থির করলেন, সব মায়া কাটিয়ে এবার তিনি আলোকপ্রাপ্তির পথে হাঁটবেন। তাঁর জন্মদাতা পিতা মহর্ষি বেদব্যাসের মতোই তিনি কঠোর তপস্যায় মগ্ন হবেন। কুন্তী আর মাদ্রীকে ডেকে পাণ্ডু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তোমরা হস্তিনাপুরে ফিরে যাও। মা অম্বালিকা, ভাই বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র আর পিতামহ ভীষ্মকে বলো—পাণ্ডু আজ থেকে সন্ন্যাসী। সে এখন বনের গাছের নিচে রাত কাটাবে, মৌনব্রত পালন করবে, আর সকলের কল্যাণে নিজেকে সঁপে দেবে।"
কিন্তু কুন্তী আর মাদ্রী সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী ছিলেন না। তাঁদের চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। তাঁরা বললেন, "স্বামী, আমাদের একা ফেলে যাবেন না। আমরাও আপনার সঙ্গে বানপ্রস্থ গ্রহণ করব। বিলাসের অন্ন নয়, বনের ফলমূল খেয়ে আমরা আপনার পাশে থাকব। আপনি চলে গেলে আমরাও প্রাণ বিসর্জন দেব।"
স্ত্রীদের এই অনড় সংকল্প দেখে পাণ্ডু বিচলিত হলেন। তিনি সন্ন্যাস না নিয়ে স্থির করলেন তাঁরা একত্রে 'বানপ্রস্থ' অবলম্বন করবেন। নিজের বহুমূল্য পোশাক আর অলঙ্কার সমস্তই ব্রাহ্মণদের দান করে দিলেন তিনি। সেই শূন্য হাতে, চীরবাস পরে, জটাধারী হয়ে পাণ্ডু দুই স্ত্রীকে নিয়ে অরণ্যের গভীরে হারিয়ে গেলেন। হস্তিনাপুরে যখন এই সংবাদ পৌঁছাল, তখন অন্ধ তত্ত্বাবধায়ক রাজা ধৃতরাষ্ট্রের বুক বিদীর্ণ করে কেবল হাহাকার বেরিয়ে এল।
গান্ধমাদন থেকে শতশৃঙ্গ: এক আধ্যাত্মিক যাত্রা
পাণ্ডু তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে ভ্রমণ করতে করতে পৌঁছালেন গন্ধমাদন পর্বতমালায়। বর্তমানে এই অঞ্চলটি ওড়িশার বরগড় ও বলাঙ্গীর জেলার সীমান্তে অবস্থিত। আধুনিক যুগে একে বলা হয় ওড়িশার 'আয়ুর্বেদিক বাগান'। এখানেই এককালে পবনপুত্র হনুমান বিশল্যকরণী খুঁজতে এসেছিলেন, আর দ্বাপর যুগে গদাধারী ভীম হনুমানের লেজ সরাতে না পেরে নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়েছিলেন। সেই পবিত্র পাহাড়ে কুন্তী আর মাদ্রীকে নিয়ে মাটিতে শুয়ে দিন কাটাতে লাগলেন পাণ্ডু। বনের ঋষিরা পরম মমতায় আগলে রাখতেন এই রাজকীয় দম্পতিকে।
এরপর তাঁরা এগিয়ে চললেন আরও দুর্গম পথে। ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবর পার হয়ে, হংসকূট শিখর অতিক্রম করে তাঁরা পৌঁছালেন শতশৃঙ্গ পর্বতে। আজকের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার সেই সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, যার চারপাশ ঘিরে রয়েছে বরফে ঢাকা হিমালয়। সেই শতশৃঙ্গের নির্জনতায় নিজেকে বিলীন করে দিলেন পাণ্ডু। চারপাশের হিমশীতল হাওয়া আর তুষারপাতের মধ্যেও তিনি অটল রইলেন নিজের তপস্যায়। রাজকীয় আভিজাত্য তখন ধুলোয় মিশে গেছে, রয়ে গেছে কেবল পরমাত্মার সঙ্গে এক হওয়ার তীব্র বাসনা।


অতি সুন্দর লেখার বুনন- প্রিয়া
ReplyDelete